টানা বর্ষণের কারণে চট্টগ্রামের কয়েকটি উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাঁশখালী ও সাতকানিয়া উপজেলা, যেখানে প্রায় আট লাখ মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। টানা কয়েকদিন ধরে বসতঘরে পানি জমে থাকায় অনেক এলাকায় দেখা দিয়েছে খাদ্য ও নিরাপদ পানির তীব্র সংকট। তবে শহরের কোথাও রোববার সকালে জলাবদ্ধতার খবর পাওয়া যায়নি।
বাঁশখালীর বিভিন্ন এলাকায় বাড়িঘর প্লাবিত হওয়ায় অসংখ্য পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রয়োজনের তুলনায় ত্রাণ ও বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ এখনো অপ্রতুল। ফলে অনেকেই দূর-দূরান্ত থেকে নিরাপদ পানি সংগ্রহ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এদিকে, বন্যাকবলিত সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর বিস্তীর্ণ এলাকায় গত দুইদিন ধরে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। অনেক স্থানে মোবাইল নেটওয়ার্কও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের সমন্বিত উদ্ধার অভিযানে বাঁশখালী থেকে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশুসহ ১৩ জনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। সাতকানিয়ায় বন্যার পানিতে ডুবে দুই বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বিভাগে ১ হাজার ৫৭টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১২ হাজারের বেশি মানুষ অবস্থান করছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় বাঁশখালীতে ৪৪ টন চাল এবং প্রায় আড়াই হাজার পরিবারের মধ্যে শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, রাঙ্গুনিয়ায় পাহাড়ি ঢলে একটি সেতু ভেঙে যাওয়ায় বান্দরবানের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। চন্দনাইশ, আনোয়ারা, হাটহাজারী, ফটিকছড়ি ও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন এলাকাতেও বন্যার পানি বাড়তে থাকায় হাজারো মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন। এসব এলাকায়ও খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।
জানা যায়, বন্যায় চট্টগ্রাম জেলার মৎস্য খাতে ব্যাপক বিপর্যয় নেমে এসেছে। জেলার ১৫টি উপজেলার ১৫৩টি ইউনিয়নের কয়েক হাজার পুকুর ও শত শত মাছের ঘের প্লাবিত হয়ে বিপুল পরিমাণ মাছ ও চিংড়ি ভেসে গেছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বন্যায় মাছ ও অবকাঠামো মিলিয়ে জেলা জুড়ে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০৯ কোটি ২৩ লাখ টাকায়। জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, বন্যায় চট্টগ্রাম জেলার মোট ১২ হাজার ২৫১টি পুকুর ও দীঘি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া, ৩২০টি মাছের ঘের বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে।
এতে চাষ করা প্রায় ৪ হাজার ১০৬ দশমিক ৪৯ টন বিভিন্ন প্রজাতির মাছ এবং ৫৭০ দশমিক ৫০ টন চিংড়ি ভেসে গেছে। মৎস্য বিভাগ জানিয়েছে, কেবল মাছ ও চিংড়ি ভেসে যাওয়ার কারণেই আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১০৬ কোটি টাকার উপরে। এদিকে, টানা বৃষ্টিতে রেললাইন পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় পাঁচদিন বন্ধ থাকার পর রোববার থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল পুনরায় শুরু হয়েছে। শনিবার ক্ষতিগ্রস্ত রেলপথের নিচে পাথর প্রবেশ করিয়ে প্রায় ৩০০ মিটার রেললাইন ১৪ ইঞ্চি উঁচু করেছে রেলওয়ে প্রকৌশল বিভাগ।
প্রয়োজনীয় প্রকৌশলগত কাজ শেষ করে রোববার নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ট্রেন চলাচল শুরু হয়। রেলওয়ের প্রকৌশল ও পরিবহন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, টানা ভারী বৃষ্টির কারণে মঙ্গলবার থেকে ষোলশহর দোহাজারী সেকশনের জান আলী হাট স্টেশনের ১ কিলোমিটার পূর্বে শমসের পাড়া এলাকার প্রায় ৫০০ মিটার রেলপথ পানিতে তলিয়ে যায়। রেলপথ থেকে পানি সর্বোচ্চ ২১ ইঞ্চি পর্যন্ত উঠে গেলে রেলওয়ে এই রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ ঘোষণা করে। রেলওয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, রোববার এই রুটে ট্রেন চলাচল পুনরায় শুরু হয়। দুপুর ১টায় পর্যটক একপ্রেস যাত্রা করে চট্টগ্রাম থেকে। এরপর বাকি ট্রেনগুলো আসা-যাওয়া করবে।
