বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে যাচ্ছে। বহুল প্রতীক্ষিত নারী বিপিএল বা উইমেন্স ক্রিকেট লীগের চূড়ান্ত সময়সূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। আগামী ৩রা এপ্রিল থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত এই টুর্নামেন্ট চলবে। ৪ঠা এপ্রিল চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে জমকালো উদ্বোধনী ম্যাচের মধ্য দিয়ে টুর্নামেন্টের পর্দা উঠবে। জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর বন্দরনগরীতে হবে গ্রুপ পর্বের খেলাগুলো। এরপর টুর্নামেন্টের সমাপনী ও ফাইনাল ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে রাজধানী ঢাকায়। বিশেষত ১৪ই এপ্রিল পহেলা বৈশাখের এই ফাইনাল আয়োজনের মাধ্যমে উৎসবে নতুন মাত্রা যোগ করতে চায় বিসিবি। টুর্নামেন্টে মোট তিনটি ফ্র্যাঞ্চাইজি দল অংশগ্রহণ করবে। প্রতিটি দলে দেশি প্রতিভার পাশাপাশি ৩ থেকে ৪ জন বিদেশি ক্রিকেটার খেলার সুযোগ পাবেন। টুর্নামেন্টের সার্বিক প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে গভর্নিং কাউন্সিল ও ওয়ার্কিং কমিটি। এই আয়োজনের লক্ষ্য কেবল একটি টুর্নামেন্ট আয়োজন নয়, বরং নারী ক্রিকেটারদের জন্য একটি শক্তিশালী পেশাদার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা। এই উদ্যোগ সম্পর্কে বিসিবি পরিচালক ও নারী বিভাগের চেয়ারম্যান রুবাবা দৌলা বলেন, ‘আমাদের মেয়েরা এখন বিশ্বমঞ্চে দারুণ খেলছে এবং প্রতিনয়ত সাফল্য নিয়ে আসছে, তাই তাদের উৎসাহিত করতে এবং ক্যারিয়ারের সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ।’ নারী লীগের দল মালিকানা ও আর্থিক স্বচ্ছতা বজায় রাখা বিসিবি’র জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। রুবাবা দৌলা জানান, তিনটি ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকের সঙ্গে এরই মধ্যে আলোচনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। পুরুষ লীগের আর্থিক লেনদেনের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার বিসিবি মালিকদের আর্থিক সক্ষমতা ও নির্ভরযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা হচ্ছে। সময়মতো খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক পরিশোধ নিশ্চিত করাই বোর্ডের প্রধান লক্ষ্য। টুর্নামেন্টে মোট ছয়টি গ্রুপ ম্যাচ ও একটি ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে। ড্রাফট পদ্ধতির মাধ্যমে খেলোয়াড় নির্বাচন করা হবে, যেখানে দেশি ক্রিকেটারদের পাশাপাশি বিশ্বমানের বিদেশি খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণও নিশ্চিত করা হচ্ছে। খেলোয়াড়দের বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করে তাদের সঠিক পারিশ্রমিক ও মান নিশ্চিত করা হবে। চট্টগ্রাম ও ঢাকার ভেন্যুগুলোতে এই টুর্নামেন্ট নারী ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা আরও বৃদ্ধি করবে বলে বোর্ড আশাবাদী। এটি তাদের খেলার মান অনেক উঁচুতে নিয়ে যাবে; এটি সময়ের বড় দাবি।
নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিসিবি’র জিরো টলারেন্স
সাক্ষাৎকারে ক্রিকেটার জাহানারা আলমের আনা অভিযোগের প্রেক্ষিতে গঠিত তদন্ত কমিটির কার্যক্রম নিয়েও কথা বলেছেন রুবাবা দৌলা. তিনি জানান, বিচারপতি তারিকুল হাকিমের নেতৃত্বে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি অত্যন্ত গোপনীয়তা ও পেশাদারিত্বের সাথে এই স্পর্শকাতর বিষয়টি তদন্ত করেছে। তদন্ত কমিটিতে রুবাবা দৌলা নিজেও একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তদন্তের ফলাফল ও কঠোর পদক্ষেপ সম্পর্কে রুবাবা দৌলা বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের নীতিমালা অনুযায়ী যৌন হয়রানির যে সংজ্ঞা রয়েছে, তার ভিত্তিতে প্রাথমিক প্রমাণ (চৎরসধ ঋধপরব ঊারফবহপব) পাওয়ায় আমরা অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ক্রিকেট অপারেশনস থেকে বহিষ্কার বা ব্যান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ রুবাবা দৌলার মতে, করপোরেট জগতের শৃঙ্খলার আলোকে বিসিবি যেকোনো ধরনের হ্য বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিসিবির পরিকল্পনা বেশ দীর্ঘমেয়াদী এবং আশাব্যঞ্জক। রুবাবা দৌলা জানান, মেয়েরা সমপ্রতি বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়ে তাদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে। সামনে তাদের ইংল্যান্ডে বিশ্বকাপ মিশন রয়েছে। এর ঠিক আগে এই নারী বিপিএল বা লীগ তাদের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। বিশ্বকাপের বড় প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিসিবি দেশের মাটিতে একটি হোম সিরিজ এবং পরবর্তীতে স্কটল্যান্ডে একটি ত্রিদেশীয় সিরিজ আয়োজনের পরিকল্পনা করছে। তৃণমূল থেকে নতুন নতুন প্রতিভা অন্বেষণ করে নারী ক্রিকেটের পাইপলাইন শক্তিশালী করতে চায় ক্রিকেট বোর্ড। বিসিবি মনে করে, সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা, পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা এবং ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার সুযোগ পেলে বাংলাদেশের মেয়েরা অচিরেই বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে। বোর্ড নারীদের উন্নয়নে সব সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে যাতে সাফল্যের এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই এখন বিসিবি’র মূল লক্ষ্য। হ্যারাসমেন্টের বিরুদ্ধে একটি দৃষ্টান্তমূলক কঠোর অবস্থান নিয়েছে যা দেশের ক্রীড়াঙ্গনে বড় বার্তা দেবে। ক্রিকেটকে কলুষমুক্ত রাখতেই বোর্ড এসব ব্যবস্থা গ্রহণে বিন্দুমাত্র পিছপা হবে না। তারা সব সময়ই স্বচ্ছ।
