কমলা-রঙের বৌদ্ধ ভিক্ষুর পোশাক পরা এক সন্ন্যাসী সারিবদ্ধভাবে বসে থাকা তরুণ-তরুণীদের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, তাদের এখানে আসার একটি বিশেষ মিশন রয়েছে। তাহলো দেশকে বাঁচানো। আর সেই কাজের শুরু হবে একজন জীবনসঙ্গী খুঁজে পাওয়া এবং ভবিষ্যতে সন্তান নেয়ার মাধ্যমে। কথাটি শুনে অংশগ্রহণকারীরা নার্ভাস। তবে হাসিতে ফেটে পড়েন। কেউ কেউ লাজুক চোখে সম্ভাব্য সঙ্গীর দিকে তাকান। এটি কোনো নতুন রিয়েলিটি শোর দৃশ্য নয়। এটি দক্ষিণ কোরিয়ার পালগংসান পর্বতের সবুজে ঘেরা অষ্টম শতাব্দীর ডংহওয়াসা বৌদ্ধ মন্দিরে আয়োজিত বাস্তব একটি ডেটিং রিট্রিট। ৩০ ঘণ্টার এই আয়োজনে একের পর এক কার্যক্রম, অস্বস্তিকর মুহূর্ত আর বরফ গলানোর নানা প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে অংশগ্রহণকারীদের প্রেমের মানুষ খুঁজে নেয়ার সুযোগ দেয়া হয়। এ খবর দিয়ে অনলাইন বিবিসি বিস্তারিত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
আয়োজক ইউ চেওল-জু বলেন, দেশ যখনই সংকটে পড়েছে, তখন বৌদ্ধরাই সবার আগে এগিয়ে এসেছেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ১৫০০-এর দশকে জাপানি আগ্রাসনের সময় ডংহওয়াসা মন্দির বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের প্রতিরোধ বাহিনীর ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। তবে এবার সংকট বাইরের কোনো শত্রুর নয়। তার ভাষায়, কম জন্মহার এখন জাতীয় সংকট। তাই আমাদের কিছু একটা করতেই হয়েছে।
বিশ্বের অন্যান্য উন্নত দেশের মতো দক্ষিণ কোরিয়াতেও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে জন্মহার দ্রুত কমেছে। ২০২৩ সালে দেশটিতে একজন নারীর গড় সন্তানসংখ্যা নেমে আসে মাত্র ০.৭২-এ, যেখানে জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজন অন্তত ২.১। অনেকে এর জন্য গৃহায়ণে উচ্চমূল্য ও শিশু লালন-পালনে পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তার অভাবকে দায়ী করেন। আবার কেউ বলেন, অনেক নারী এখন ক্যারিয়ারকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন অথবা সন্তান না নেয়ার সিদ্ধান্ত নিজেই নিচ্ছেন। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণ কোরিয়ার তরুণ-তরুণীরা আগের তুলনায় কম মেলামেশা করছেন এবং কম ডেট করছেন। ফলে অনেকেই বিয়ে করতে চাইলেও উপযুক্ত সঙ্গী খুঁজে পাচ্ছেন না।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার দীর্ঘ মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন ছুটি, নবজাতকের জন্য নগদ প্রণোদনা এবং নবদম্পতিদের জন্য ভর্তুকিযুক্ত আবাসনের ব্যবস্থা করেছে। এর পাশাপাশি স্থানীয় সরকার ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন রাষ্ট্রের সহায়তায় এমন ম্যাচমেকিং বা পাত্র-পাত্রী পরিচয় অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করছে।
কঠিন বাছাই পেরিয়ে মন্দিরে
২৮ বছর বয়সী কিম আহ-কিয়ং, যার বৌদ্ধ নাম সুনহিয়েজি, সবার আগে এসে পৌঁছান। তিনি জানান, সিউল ছেড়ে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে চাকরি নেয়ার পর উপযুক্ত সঙ্গী খুঁজে পাওয়া তার জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বলেন, পুরুষদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার কোনো সুযোগই নেই। তার ভাষায়, আমি শুধু অফিস আর বাসার মধ্যে যাতায়াত করি। কোনো শখ নেই। নতুন কিছু শুরু করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সবই একা করার মতো কাজ ছিল।
অন্যদিকে ৩০ বছর বয়সী কওন সেউং-ওহ, যার বৌদ্ধ নাম এনিও, তিনি জানান তিনি কখনো অনলাইনে অচেনা কারও সঙ্গে পরিচিত হতে স্বস্তি বোধ করেননি। বন্ধুরা তাকে প্রায় ১০ বার ব্লাইন্ড ডেটে পাঠিয়েছিল, কিন্তু কোনো সম্পর্কই এগোয়নি। তিনি যে দুগ্ধজাত পণ্য তৈরির কারখানায় কাজ করেন, সেখানে ৯৭ শতাংশ কর্মীই পুরুষ। তাই শেষ পর্যন্ত তিনিও এই রিট্রিটে যোগ দেন।
প্রেমের শুরু ছোট ছোট আচরণে
নারীরা মন্দিরে পৌঁছাতেই সম্ভাব্য পুরুষ সঙ্গীরা এগিয়ে এসে তাদের লাগেজ বহনে সাহায্য করেন। প্রথম পরিচয়পর্বে এনিও নিজের হাতে বানানো ফরাসি পেস্ট্রি সবার মধ্যে বিতরণ করেন, যা উপস্থিতদের মুগ্ধ করে। এরপর শুরু হয় প্রথম ডেট। সুনহিয়েজির সঙ্গী হন ৩২ বছর বয়সী শান্ত স্বভাবের সরকারি কর্মকর্তা মিনহো। দু’জন মন্দিরঘেরা বনপথে হাঁটতে হাঁটতে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলেন। পরে মধ্যাহ্নভোজের সঙ্গী বেছে নিতে পুরুষদের হাতে একটি করে প্লাস্টিকের গোলাপ দেয়া হয়। মিনহো গোলাপটি দেন ২৮ বছর বয়সী ডিজাইনার রুবিকে। খাবার টেবিলে সবাই নিজেদের শখ, পেশা এবং প্রিয় অনুষ্ঠান নিয়ে গল্প করেন। খাওয়া শেষে একসঙ্গে থালা-বাসন ধোয়ার সময় দেখা যায়, শুরুতে যে দূরত্ব ছিল, তা অনেকটাই কমে এসেছে।
সবচেয়ে বিব্রতকর পর্ব: প্রতিভা প্রদর্শন
দিনের সবচেয়ে অস্বস্তিকর মুহূর্ত আসে ট্যালেন্ট শোতে। মিনহো জনপ্রিয় কে-পপ ব্যান্ড টুপিএম-এর ভাইরাল গান মাই হাউস-এর নাচ পরিবেশন করেন। সুনহিয়েজি নাচেন নতুন পপ গান ক্যাচ ক্যাচ-এর তালে। এনিও গেয়ে শোনান একটি ব্যালাড। রুবি স্প্যানিশ ভাষায় নিজের পরিচয় দিয়ে মিনহোকে মুগ্ধ করেন। আরেক নারী বাঁশিতে বাজান জনপ্রিয় কে-পপ ডেমন হান্টার্স-এর একটি গান।
রাতভর গল্প, শেষ পর্যন্ত আট জুটি
সারাদিনের ব্যস্ততার পরও রাতে ছিল আরেক দফা পরিচয়ের সুযোগ। যদিও নির্ধারিত শোয়ার সময় ছিল রাত ১০টা, আয়োজক ইউ বলেন, এটা শুধু পরামর্শ। রাত এখনও অনেক চমক নিয়ে আসতে পারে। পরদিন সকালে সবাই এসএমএসে নিজেদের চূড়ান্ত পছন্দ জানায়। শেষ পর্যন্ত ২৪ জন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে ৮টি জুটি গড়ে ওঠে। এর মধ্যে দুটি জুটি ছিল অনুষ্ঠান-সংশ্লিষ্ট কর্মী ও অংশগ্রহণকারীর মধ্যে। এনিও কোনো সঙ্গী পাননি। তবুও তিনি হতাশ হয়ে থেমে যেতে রাজি নন। তিনি বলেন, সুযোগ দিলে আমি অবশ্যই আবার আসব। অন্যদিকে সুনহিয়েজি বলেন, তিনি রাত ৩টা পর্যন্ত অন্য নারীদের সঙ্গে গল্প করেছেন। হেসে বলেন, আমি অনেক নতুন বন্ধু পেয়েছি। আমরা ইতিমধ্যেই একসঙ্গে ব্রাঞ্চ করার পরিকল্পনা করেছি। তার কাছে পুরো অভিজ্ঞতাটি ছিল কিশোর বয়সের মতো আনন্দময় এক স্লিপওভার- যেখানে নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয়, সাহসী সিদ্ধান্ত আর স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ ছিল সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
সবাই জীবনসঙ্গী নিয়ে বাড়ি ফেরেননি। তবে প্রায় সবাই ফিরে গেছেন এমন কিছু নিয়ে, যা আগে তাদের ছিল না- নতুন বন্ধু এবং নতুন আত্মবিশ্বাস।
