মৃত বিবেকের জন্য প্রার্থনা

মৃত বিবেকের জন্য প্রার্থনা

ফন্ট সাইজ:

নির্মম, নির্দয়, করুণ এক কাহিনী। যা আদিম যুগকেও হার মানায়। অথচ পৃথিবী এখন ডিজিটাল। অ্যানালগকে পেছনে ফেলেছে বহু আগে। কিন্তু কিছু কিছু মানুষ মনুষ্যত্ব নিয়ে বেড়ে ওঠেনি। ওদের কর্মকাণ্ড আদিম যুগকেও হার মানায়। সুস্থ মানুষ অসুস্থ হয়ে ওঠে ওদের কাজে। প্রশ্ন জাগে বিবেক কি জন্মের সময়ই মাটি চাপা দিয়েছে? একটি খবর মনকে অশান্ত করে রেখেছে। প্রশ্ন জাগে আমরা কি ধরনের অমানবিক এক সমাজে বাস করছি? কি ধরনের অসভ্য, বর্বর সমাজে বাস করছি? এখানে কি মানবিকতা বলে কিছু নেই? সবরকম মনুষ্যত্ববোধ কি লোপ পেয়ে গেছে? ৮ই আগস্ট সন্ধ্যায় খবর আসে নির্যাতনের শিকার ববি বেগম হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা গেছেন। নির্যাতনের শিকার এই মানুষটির মুখচ্ছবি যতই চোখে ভাসছে ততই হু হু করে উঠছে ভেতরটা। কতোটা কষ্ট আর যন্ত্রণা নিয়ে এই মানুষটিকে দুনিয়া ছাড়তে হয়েছে।

ঘটনাস্থল যে স্টেশন, মেথিকান্দা, আমার জন্মভিটা যাওয়ার পথেই। ঢাকা থেকে কুলিয়ারচর। নরসিংদীর পরে অনেকবারই যাত্রাবিরতিতে নেমেছি এই স্টেশনে। খারাপ লাগছে এই ভেবে, এই স্টেশনেই কতোটা যন্ত্রণা আর কষ্ট নিয়ে একজন ববি বেগমকে বরণ করে নিতে হয়েছে মর্মান্তিক মৃত্যু। ববি বেগম ছিলেন বাকপ্রতিবন্ধী। সাধারণত, গ্রাম্য ভাষায় বোবাদের ডাকা হয় বুবি বলে। তিনি হয়তো এভাবেই ববি হিসেবে মেথিকান্দা স্টেশনে সকলের কাছে পরিচিত ছিলেন। ঠিক দুই যুগ আগে এই মানুষটি পা রাখেন এখানে। যখন ভাবি, আচ্ছা তিনি কোন পরিবারের সন্তান ছিলেন, এই দুই যুগেও কেউ কি খবর নেয়ার প্রয়োজন বোধ করেন নি? যাদের সন্তান তারা কি কেউ তার খোঁজ নিয়েছে। কেন একজন বাকপ্রতিবন্ধী মানুষকে একাই কাটাতে হলো স্টেশনের অন্ধকার, অস্বাস্থ্যকর নিরাপত্তাহীন পরিবেশে যুগের পর যুগ? সময় বদলায়। রাষ্ট্র ক্ষমতার নেতৃত্বও বদলায়। নরসিংদী-মেথিকান্দায় জনপ্রতিনিধিরাও আসা-যাওয়ার মধ্যেই থাকে। আছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। কেউ কি একটিবার এই মানুষটির পাশে দাঁড়াবার প্রয়োজন বোধ করেছে।

খুব, জানতে ইচ্ছে করছে, এই স্টেশনের দায়িত্বরত কর্মকর্তারা কি তাদের কর্মব্যস্ততায় এই মানুষটির দুঃখ-কষ্টের কথা ভেবেছেন কখনো? এটা হলফ করে বলা যায়, না কারও সময় হয়নি তাকে নিয়ে ভাবার। সমাজ এতটাই স্বার্থপূর্ণ যে অসহায় কাউকে নিয়ে ভাবার সময় নেই কারও? স্টেশন কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ সামান্য আশ্রয়ের জায়গাটুকু দেয়ায়। তবে যদি ববি বেগম একা না থাকতেন, কারও আশ্রয়ে থাকতেন তাহলে হয়তো আজ বখাটেদের হাতে তার এমন করুন মৃত্যু হতো না। যে পাষণ্ড, নরপশুগুলো তিলে তিলে গড়ে তোলা ববি বেগমের সঞ্চিত অর্থের জন্য গায়ে হাত তুলেছে তাদের একবারও মনে হয়নি, মায়ের মতো একজন মানুষের সঙ্গে এই বর্বরতা কীভাবে করছে?

ববি বেগমের মৃত্যুর অল্পসময়ের মধ্যেই নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ইতিমধ্যেই র‌্যাব ১১ সন্দেহভাজন পাঁচ আসামীকে গ্রেপ্তার করেছে। ধন্যবাদ দিতে হয় তাদেরকে। কিন্তু কথায় আছে, জাস্টিস ডিলেইড, জাস্টিস ডিনাইড। এক্ষেত্রে যেন এমনটি না হয়। যারাই এই হত্যার বিচার প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকবেন সকলেই সোচ্চার এবং সজাগ থাকবেন কোনো ফাঁকফোকরে দোষীরা যেন শাস্তি না পেয়ে বেরিয়ে যায়। এদের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত হলে, পরপারে হলেও ববি বেগম এতটুকু প্রশান্তি পাবেন জেনে, যারা তার মতো একজন বাকশূন্য মানুষকে মেরেছে, মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে, তিনি একা নন রাষ্ট্র, সমাজ, আদালত তার পাশে আছে। জীবিত থাকার সময় না হলেও মৃত্যুর পরে তার প্রতি ন্যায় আচরণ নিশ্চিত হয়েছে।

নিকট অতীতে ঢাকার মিরপুরে রামিসা হত্যার ঘটনায় নড়ে বসে পুরো দেশ। সরকার ও বিচারালয় এ ঘটনার সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত ত্বরান্তিত করেছে। প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের সকল অঙ্গই এ নিয়ে সজাগ। আশা করি, ববি বেগমের ওপর যে নির্যাতন হয়েছে, হত্যাচেষ্টা হয়েছে এবং তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে তার যথাযথ বিচার নিশ্চিতে একইভাবে সকলেই এগিয়ে আসবে।
কমল কুমার মজুমদারের গল্প নিয়ে ভারতীয় চলচ্চিত্রকার বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত নির্মাণ করেছেন চাল চুরি নিয়ে বিখ্যাত চলচ্চিত্র। ছবিটির নাম ‘নিম অন্নপূর্ণা’। ছবির শেষ দৃশ্যে দেখা যায়, বুড়ো ভিখারিকে হত্যা করে তার ঝুলি থেকে চাল চুরি করে স্বামী-কন্যাদের ক্ষুধা মেটাতে পারলেও নিজে সেটা খেতে পারছে না। বমি করছে। ভিখারি মরে যাওয়ার পর অপরাধ বোধে আক্রান্ত হন মহিলা। মেথিকান্দার স্টেশনের এই ঘটনা যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে সেই চাল চুরির গল্পটির কথা।

বাকপ্রতিবন্ধী ববির কাছ থেকে যারা টাকা ছিনিয়ে তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে তাদের পরিণতি যেন এমনটিই হয়। বুকভরা কষ্ট নিয়ে বলতে চাই, মা, আমাদের দুর্ভাগ্য। আপনি, আমাদের ক্ষমা করবেন। আমরা আপনার পাশে সঠিক সময়ে দাঁড়াতে পারিনি। যারা আপনাকে কষ্ট দিয়েছে তাদের শাস্তি যেন নিশ্চিত হয়, এটাই চাওয়া। আর কোনো মাকে যেন এতটা নিরাপত্তাহীনতায় একাকী জীবন কাটাতে না হয়। যখনই এই স্টেশনটি দিয়ে যাতায়াত করবো তখনই আপনার এই যন্ত্রণাকাতর মুখটির কথা মনে হবে।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন