হরমুজ প্রণালি ঘিরে ইরানের সঙ্গে কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সামরিক সংঘাত চলতে পারে। এমন সম্ভাবনা মাথায় রেখে প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউস। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, এই সংঘাত কতদিন চলবে এবং কতটা তীব্র হবে, তা পুরোপুরি নির্ভর করছে ইরানের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দুর্বল করা এবং তাদের অবশিষ্ট পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করাই ছিল অভিযানের লক্ষ্য। তবে এখন সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, বর্তমান উত্তেজনা এক-দুই দিন, এক সপ্তাহ কিংবা এক মাসও স্থায়ী হতে পারে। সবকিছু নির্ভর করবে ইরান বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা অব্যাহত রাখে কিনা তার ওপর। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা বলেন, আমরা তাদের এমনভাবে জবাব দেব, যাতে তারা বুঝতে পারে আমরা বিষয়টি নিয়ে কোনো ধরনের ছাড় দিচ্ছি না।
কূটনীতি স্থগিত, আবারও সামরিক কৌশলে ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার বলেন, সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) উল্লেখ থাকা ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যত শেষ হয়ে গেছে। তার অভিযোগ, বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলার পর নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। এরপর যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি দ্বিতীয় দফা হামলা চালায়। কয়েক মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো ইরানের অভ্যন্তরে অবকাঠামোগত লক্ষ্যবস্তুতেও হামলা হয়। টানা তিন দিন ধরে দেশ দুইটির মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে।
এর জবাবে ইরানও কুয়েত ও বাহরাইন, জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে তেহরান জানায়, হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণের দাবি থেকে তারা সরে আসবে না।
ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি
ইরানের শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও চাপ প্রয়োগের অভিযোগ তুলে বলেন, হরমুজ প্রণালি কেবল ইরানের শর্তেই পুনরায় পুরোপুরি উন্মুক্ত হবে। এক্সে (সাবেক টুইটার) দেয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, আপনি হামলা করলে পাল্টা জবাব পাবেন। হরমুজ প্রণালি মার্কিন হুমকিতে নয়, ইরানের ব্যবস্থাপনায় খুলবে।
হরমুজ প্রণালি এখন সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল করাই এখন ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। অন্যদিকে, যুদ্ধের অবসান ঘটাতে যেকোনো সমঝোতায় হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চায় ইরান।
সমঝোতা স্মারকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা। তবে ইরানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ওমান উপকূলের দক্ষিণ দিকের রুট ব্যবহার করে তেহরানের অনুমতি ছাড়াই জাহাজ চলাচল করিয়ে ওই সমঝোতা লঙ্ঘন করেছে।
হোয়াইট হাউসের হিসাব
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে শত শত তেলবাহী জাহাজ সফলভাবে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করায় হোয়াইট হাউস মনে করছে, প্রয়োজনে সামরিক চাপ আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তাদের ধারণা, নতুন করে সংঘাত শুরু হলেও তাৎক্ষণিকভাবে বৈশ্বিক তেলের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা নাও দেখা দিতে পারে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের ইঙ্গিত
একজন মার্কিন কর্মকর্তার দাবি, ইরানের নেতৃত্বের একটি কট্টরপন্থী অংশ মনে করছে, বর্তমান সমঝোতা থেকে তেহরান কোনো বাস্তব সুবিধা পায়নি। নিষেধাজ্ঞায় কিছু শিথিলতা এলেও ব্যাংকগুলো লেনদেন অনুমোদন দিচ্ছে না এবং অনেক দেশ অস্থায়ী ছাড়ের ওপর নির্ভর করে ইরানের তেল কিনতে অনাগ্রহী।
এছাড়া চুক্তি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পারমাণবিক পদক্ষেপ না নেয়ায় ইরানের জব্দ করা অর্থও এখনো মুক্ত করা হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, হরমুজ প্রণালি অবশ্যই আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত থাকতে হবে।
তার ভাষায়, ইরান যদি হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার চেষ্টা করে, তাহলে মার্কিন সামরিক বাহিনী তার জবাব দেবে। তারা হয় প্রণালি খুলে দেবে, নয়তো গত রাতের মতোই ধারাবাহিক সামরিক জবাবের মুখোমুখি হবে। বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত এই অভিযান চলতেই থাকবে।
