বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে বাংলাদেশে ‘সবুজ বসতি’ গড়ে তুলতে সকলের সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই ভাবে সবুজ বসতি গড়ে তুলতে সন্তান জন্মের সঙ্গে সঙ্গে একটি করে গাছ লাগানোর আহ্বানও জানান। গতকাল বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বিশ্ব পরিবেশ দিবস, পরিবেশ মেলা, জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান এবং বৃক্ষমেলা-২০২৬ উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। এ বছর জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলার প্রতিপাদ্য বিষয়- ‘বৃক্ষরোপণে সাজাই দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’। অনুষ্ঠানে বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার-২০২৫ এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে জাতীয় পুরস্কার-২০২৬ এবং বনায়ন অংশীজনের মধ্যে লভ্যাংশের চেক বিতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। বক্তৃতা শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের পূর্ব পাশে দু’টি গাছের চারা রোপণ করেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর পাশে পুরাতন বাণিজ্যমেলার মাঠে বৃক্ষমেলা-২০২৬ এর উদ্বোধন করেন। প্রধানমন্ত্রী বৃক্ষমেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই পরিবেশ মেলা কিংবা বৃক্ষমেলার যে আয়োজন, এটা যেমন বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুন্দর এবং সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য একটা নিরাপদ বিনিয়োগ বলে আমি মনে করি। এই আয়োজনটা কেবলমাত্র একটা বাৎসরিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই যদি সীমাবদ্ধ থাকে সেটা বোধহয় থাকা উচিত হবে না। বৃক্ষরোপণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণের মতো এই যে বিষয়টা, এটা আমাদের একটা নৈমিত্তিক অভ্যাসে যদি আমরা পরিণত করতে পারি তাহলে আমরা সকলের বক্তব্যে যে কথাগুলো বলি যে, একটা স্বাস্থ্যকর বসতি গড়ে তোলা দরকার, আমাদের গড়ে তোলা উচিত এই সবগুলো তাহলে ধীরে ধীরে আসলেই বাস্তবে রূপ নিতে পারবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে যারা এখানে পরিবেশকর্মীসহ বৃক্ষরোপণ বা বাগান তৈরি বা এই কাজগুলোতে জড়িত আছেন, যারা উপস্থিত হয়েছেন-বাংলাদেশের বিভিন্ন কর্নার থেকে, আপনাদের মতো মানুষগুলো বা প্রতিশ্রুতিশীল তারুণ্য যদি থাকেন দেশে, এটার সংখ্যা যদি বৃদ্ধি পায় নিশ্চয়ই আমরা একটা সবুজ বসতি গড়ে তুলতে সক্ষম হবো। আমি যেই কথাটি মনে করি, সেই কথাটি আপনাদের সামনে বলতে চাইছি সেটা হলো, দেশ হোক সকল প্রাণী এবং প্রাণের নিরাপদ আবাসস্থল।
সবুজায়নে সরকারের নেয়া উদ্যোগ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবুজের সামাজিক আন্দোলনের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণে সরকারিভাবে আমরা অনেকগুলো উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। আমরা সরকার গঠন করার পরে প্রতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গ্রিন ভলান্টিয়ারিজম চালু করার একটা পদক্ষেপ নিয়েছি। কিছুদিন আগে আপনারা দেখেছেন, পত্রপত্রিকায় নিউজ এসেছে। স্কুলের একটা প্রোগ্রাম ছিল, একসঙ্গে প্রায় ৯০ হাজারের মতো গাছ বিভিন্ন স্কুলে সেদিন রোপণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ক্লাইমেট ইয়ুথ ফেলোশিপ চালু এবং এনভায়রনমেন্ট স্টার্টআপ ফান্ডসহ বেশ কিছু উদ্যোগ আমরা গ্রহণ করেছি। সরকারের এই উদ্যোগগুলো যদি আমরা সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারি তাহলে অবশ্যই বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ স্বাস্থ্যকর এবং সবুজ বাংলাদেশ গঠন করতে সক্ষম হবো।
তিনি বলেন, আমাদের বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোতে ছিল যে, আমরা ৫ বছরে নতুন করে ২৫ কোটি গাছ রোপণের কর্মসূচি নিয়েছি। ইচ্ছামত যদি আমরা গাছ রোপণ করি তাহলে কিন্তু এই লক্ষ্যটা সফল হবে না। আমি ব্যক্তিগতভাবে যেটা বিশ্বাস করি যে, কোন কোন পরিবেশে, কোন মাটিতে কী ধরনের আবহাওয়ায় কোন প্রজাতির গাছ রোপণ করা প্রয়োজন, এটি সম্পর্কেও কমবেশি আমাদের একটি ধারণা থাকতে হবে এবং সেই বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েই গাছগুলোকে আমাদের রোপণ করতে হবে।
সরকারপ্রধান বলেন, পরিবেশ রক্ষার সঙ্গে বন উজাড়, পাহাড় কাটা, ম্যানগ্রোভ ধ্বংস এবং বন্যপ্রাণী নির্ধারণের বিরুদ্ধেও আমরা চেষ্টা করছি, যতটা ম্যাক্সিমাম পসিবল কঠোর অবস্থান নেয়া যায়। এর ভেতরে আমরা বেশ কিছু কাজ করার চেষ্টা করেছি।
তিনি বলেন, আমরা যদি আমাদের নদীগুলোকে বাঁচাতে না পারি, এটা একটা ভয়াবহ অবস্থা। আমরা নদীমাতৃক বাংলাদেশ বলতাম, আপনারা নদীগুলোর পাশে যান, খাল- বিলের পাশে যান। মনে হচ্ছে যে, এই নদীগুলো খাল-বিলের মধ্যে দিয়ে এগুলো পানি যাবার জন্য নয়। এগুলো মানুষের পড়ে থাকা যে বর্জ্য বা মানুষের ব্যবহারের যে বর্জ্য- সেগুলোকে নিয়ে যাওয়ার জন্য মনে হচ্ছে। এই রাস্তাগুলো বা নদী- খালগুলোকে তৈরি করা হয়েছে। আমরা যদি আমাদের নদীগুলোকে বাঁচাতে না পারি তাহলে অবশ্যই কিন্তু কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং পানি নিরাপত্তার কোনোটাই নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। এ কারণে ইকোসিস্টেম রক্ষা করাটা অত্যন্ত জরুরি। উন্নয়ন ও পরিবেশকে একে অপরের প্রতি প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে বরং প্রকৃতির সঙ্গে সমপ্রীতি বজায় রেখে উন্নয়ন এবং সমৃদ্ধি গড়ে উঠুক, এটি বর্তমান সরকারের প্রত্যাশা।
তিনি আরও বলেন, এই বাস্তবতায় বর্তমান সরকার পরিবেশকে কোনো আলাদা খাত হিসেবে নয় বরং জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করছে। বর্তমান সরকারের লক্ষ্য একটা সবুজ, পরিচ্ছন্ন জলবায়ু সহনশীল টেকসই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা।
সরকারপ্রধান বলেন, বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি বর্তমান সরকার সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন এবং পুনঃখননের যে কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করেছে- সেটি শুধুমাত্র কৃষকদের জন্য বছর জুড়ে কৃষি সেচ সুবিধায় নিশ্চিত করবে না। বরং আমরা যেটা আশা করছি, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলার ক্ষেত্রেও কার্যকর ভূমিকা রাখবে। তবে পরিবেশের উন্নয়ন শুধুমাত্র বৃক্ষরোপণ কিংবা খাল খননের উপরেই নির্ভর করে না, এটি কিছুটা সাপ্লিমেন্ট করে। রাজধানীসহ বিশেষ করে সারা দেশের সকল নগর, বন্দর এবং শহরতলীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেই কিন্তু আমূল পরিবর্তন আনার কোনোই বিকল্প নেই। এ ব্যাপারে আপনাদের সকলে যারা আছেন, বিশেষ করে পরিবেশ নিয়ে যারা কাজ করছেন, আপনাদের অসম্ভব সহযোগিতা আমার প্রয়োজন, সরকারের প্রয়োজন।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী সাইমুম পারভেজ, ভারপ্রাপ্ত সচিব ফাহমিদা খানম প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানে ব্যতিক্রম চিত্র
বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বিশ্ব পরিবেশ দিবস ও পরিবেশ মেলা এবং জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বর্ণাঢ্য এই অনুষ্ঠানে ছিল ব্যানার ও ফেস্টুন। শুধু ছিল না প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছবি। অনুষ্ঠানে অতিথিদের অনেকের দৃষ্টি কেড়েছে বিষয়টি। সাভার থেকে আসা পরিবেশকর্মী সুলায়মান নিলয় বলেন, এটা খুবই দৃষ্টি আকর্ষণ হওয়ার মতো ঘটনা, আজকের অনুষ্ঠানে ব্যানারে প্রধানমন্ত্রীর কোনো ছবি নেই। দু’দিন আগেই পত্রিকায় একটি নিউজ দেখেছিলাম যে, প্রধানমন্ত্রী নিজেই নির্দেশ দিয়েছেন যে, সরকারি অনুষ্ঠানে তার ছবি যেন ব্যবহার না করা হয়। তার নির্দেশের প্রতিফলন আজকের (বৃহস্পতিবার) অনুষ্ঠানে দেখছি। আগে দেখা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর একটি ছবি থাকতো বড় করে।
গত ৫ই জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সংক্রান্ত নির্দেশে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ পরিপত্র জারি করে। পরিপত্রে বলা হয়েছে যে, সরকারি কোনো অনুষ্ঠান উপলক্ষে প্রস্তুতকৃত ব্যানার, ফেস্টুন, বিলবোর্ডে প্রধানমন্ত্রীর ছবি (থ্রি ডি বা অন্য কোনো আঙ্গিকে ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হলো। সরকারি অনুষ্ঠানে ব্যানার, ফেস্টুন ও বিলবোর্ড প্রস্তুতের ক্ষেত্রে অনুষ্ঠানের বিষয়বস্তুকে প্রাধান্য দিয়ে প্রয়োজনীয় ও সামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করতে হবে। ব্যানার, ফেস্টুন ও বিলবোর্ডের নকশা এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যাতে অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য ও বার্তা এবং বিষয়বস্তু সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।
বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বিশ্ব পরিবেশ দিবস ও পরিবেশ মেলা এবং জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা-২০২৬ উপলক্ষে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এই আয়োজক। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অনুষ্ঠানে বৃহৎ সম্মেলন কেন্দ্রের মূল মঞ্চে এবং চার পাশে দেয়ালে টানানো হয় পরিবেশ সংক্রান্ত নানা স্লোগান সংবলিত ২০টি ব্যানার ও ফেস্টুন।
এই ব্যানার ও ফেস্টুনে কীভাবে পরিবেশ রক্ষা করা হবে, কীভাবে প্রাণীকুলসহ জীব বৈচিত্র্য ঠিক রাখা যাবে, কীভাবে গাছ রোপণ করা হবে, কীভাবে গাছের পরিচর্চা করতে হবে- ছিল সেই সংক্রান্ত কথামালা। অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য, কূটনীতিক, সরকারি ও বেসরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও পেশাজীবীরা উপস্থিত ছিলেন।
