বিশ্বকাপ ফুটবল শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি মানুষের আবেগ, উন্মাদনা ও স্বপ্নের মিলনমেলা। প্রতি চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত এই আসরেই জন্ম নেয় নতুন কিংবদন্তি। জন্ম হয় তারকা মহাতারকার। বিশ্বকাপ ফুটবলের এই বৃহৎ মঞ্চে অসাধারণ পারফরম্যান্সের মাধ্যমে বহু ফুটবলার বিশ্ব জুড়ে তারকার মর্যাদা লাভ করেছেন। বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। ১৯২০ সালে গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের বাইরে আলাদা একটি টুর্নামেন্টের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা।
সেই ভাবনা থেকেই উরুগুয়েকে প্রথম বিশ্বকাপ আয়োজক দেশ হিসেবে নির্বাচন করে। ১৯৩০ সালে লাতিন আমেরিকার দেশ উরুগুয়েতে প্রথম ফিফা বিশ্বকাপ শুরু হয়। মাত্র ১৩টি দেশের অংশগ্রহণে প্রথম বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়। ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল দলগুলোকে নিয়ে শুরু হওয়া এই টুর্নামেন্টে প্রথম অফিশিয়াল বল নিয়ে ঝামেলা হওয়ায় ফাইনাল ম্যাচের প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার বল এবং দ্বিতীয়ার্ধে উরুগুয়ের তৈরি বল ব্যবহার করা হয়েছিল। প্রথম আসরে স্বাগতিক দেশ উরুগুয়ে আরেক দেশ আর্জেন্টিনাকে ৪-২ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম শিরোপা জেতে। তখন ফিফা সভাপতি ছিলেন জুল রিমে। তার উদ্যোগে শুরু হয় এই আয়োজন। কিন্তু মাঝে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ১৯৪২ ও ১৯৪৬ সালে বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজন ব্যাহত হয়। পরবর্তীতে ১৯৫০ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত হয় বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর। চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে বিশ্বকাপ ফুটবলের সবচেয়ে বড় আয়োজন। ১৯৫৪ সালে সুইজারল্যান্ড আসরেই প্রথম টেলিভিশনে বিশ্বকাপের সম্প্রচার শুরু হয়। ১৯৫৮ সালের সুইডেন বিশ্বকাপে মাত্র ১৭ বছর বয়সে ব্রাজিলের জার্সি গায়ে অভিষেক হয় কালো মানিক খ্যাত ফুটবলার ‘ফুটবল সম্রাট’ পেলের। তার ড্রিবলিং দুর্দান্ত গতির খেলায় তাক লাগিয়ে বিশ্ববাসীকে মুগ্ধ করেন। তার নেতৃত্বে ব্রাজিল বিশ্বকাপ জয় করে ১৯৫৮, ১৯৬২ এবং ১৯৭০ সালে এবং তিনি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম মহাতারকা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। ফুটবল ইতিহাসে যুগে যুগে আবির্ভাব ঘটেছে এমনই সব মহাতারকার।
১৯৭৮ সালে আর্জেন্টাইন তারকা মারিও আলবের্তো কেম্পেস তার অসাধারণ নৈপুণ্যে আর্জেন্টিনাকে প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ দেন। যদিও তিনি মহাতারকার খ্যাতি পাননি। ১৯৮৬ সালে আবির্ভাব ঘটে আর্জেন্টাইন ফুটবলার দিয়াগো ম্যারাডোনার। বিশ্বকাপে তার প্রায় একক নৈপুণ্যে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার করা “গোল অব দ্য সেঞ্চুরি” ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল হিসেবে বিবেচিত হয়। এভাবে আমরা ইতালির জিয়ানলুইজি বুফন, ফাবিও কান্নাভারো, পাওলো মালদিনি, লুইজি রিভা এবং জুসেপ্পে মেয়াৎসার মতো তারকাদের দেখলাম। তাদের নৈপুণ্যেই ইতালি বিশ্বকাপ জয় করেছে ১৯৩৪, ১৯৩৮, ১৯৮২ এবং ২০০৬ সালে। ইংল্যান্ডের তারকা খেলোয়াড় কেভিন কেগ্যান, এলান শিয়েরার, ডেভিড ব্যাকহাম, ওয়েন রুনি বর্তমানে হ্যারি কেইনের কথাও আমরা মনে রাখবো। তেমনি আমরা জার্মানির তারকা ফুটবলার ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারের কথা বলতে পারি তিনি ১৯৭৪ সালে জার্মানিকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন। লোথার ম্যাথাউস জার্মানির হয়ে রেকর্ড ১৫০টি ম্যাচ খেলেন এবং ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপ জয়ী দলের অধিনায়ক ছিলেন।
১৯৯৪ সালে ব্রাজিলের আরেক তারকার আবির্ভাব দেখতে পাই। তিনি রোমারিও। ১৯৯৪ সালে ডুঙ্গার নেতৃত্বে রোমারিও এবং বেবেতো জুটি ব্রাজিলকে শিরোপা উপহার দিয়েছিলেন। এরপর আমরা দেখলাম। ফ্রান্সের মহাতারকা জিনেদিন জিদান। ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে জিনেদিন জিদান বিশ্বকাপ শিরোপা জেতান ফ্রান্সকে। তিনি যেমন ভালো ফুটবল খেলতেন তেমনি আলোচিত একটি ফাউলে তিনি ভিলেন হিসেবেও পরিচিত হয়ে যান তবে তিনিও একজন তারকা ফুটবলার। একই সময়ে আমরা দেখতে পাই ব্রাজিলের রোনালদো নাজারিওকে। তিনি তার অসাধারণ নৈপুণ্য দিয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। যদিও তিনি পেলে ম্যারাডোনার মতো অতোটা আকর্ষণ তৈরি করতে পারেননি কিন্তু তার দেশকে উপহার দিতে পেরেছিলেন বিশ্বকাপ ট্রফি। ২০০২ সালে তিনি ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ ট্রফির স্বাদ দিয়েছিলেন। হয়েছিলেন বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা।
পরবর্তী সময়ে আমরা দেখেছি ব্রাজিলের আরেক তারকা রোনালদিনহোকে। তিনি আজকের লিওনেল মেসির গুরু। স্পেনের আরেক তারকার খোঁজ পেলাম আমরা তিনি আন্দ্রেস ইনিসতিয়া। এ ছাড়াও জাভি হার্নান্দেজ। তারা মিলে স্পেনকে শিরোপা এনে দিলেন ২০১০ সালে। আমরা দেখলাম পর্তুগালের তারকা খেলোয়াড় ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে। বিশ্ব ফুটবলে নিজের অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দেন। যদিও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো বিশ্বকাপ জিততে পারেননি তবুও তার ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তাকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ের মর্যাদা দিয়েছে। এরপর যে মহাতারকার আবির্ভাব বিশ্ব ফুটলপ্রেমীদের মুগ্ধ করেছে তিনি আর্জেন্টাইন তারকা ফুটবলার লিওনেল মেসি। ২০২২ সালের বিশ্বকাপে তার অসাধারণ নেতৃত্ব আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেন। এই সাফল্যের মাধ্যমে তিনি জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশে তো বটেই বিশ্ব ফুটবলে তিনি এখন মহাতারকা।
এ পর্যন্ত বিশ্বকাপে তিনি ২০ গোল করে বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। ফ্রান্সের ইতিহাসে আরেক তারকার আবির্ভাব ঘটে ২০১৮ সালে। তার নাম কিলিয়ান এমবাপ্পে। তার গতি ফুটবল বিশ্বকে মুগ্ধ করেছে। এ ছাড়াও ব্রাজিলের নেইমারও একজন তারকা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন। যদিও ইনজুরির কারণে তিনি অনেকদিন খেলার বাইরে ছিলেন। এবার বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালের আগেই ব্রাজিলের বিদায় অনেক ভক্তদের মনে আঘাত লেগেছে। খেলা আরও বাকি রয়েছে আমরা খেলা উপভোগ করতে থাকি দেখি এমবাপ্পে ফ্রান্সকে শিরোপা এনে দিতে পারেন কি না। যদিও ২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালে ট্রাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার কাছে তারা হেরে গিয়েছিল। এ বছর আমরা দেখলাম নবাগত কেপ ভার্দের গোলকিপার ভোজিনহোকে। তিনি এই ক্ষুদ্র দ্বীপ রাষ্ট্রটিকে বিশ্বকাপের এই আসরে পরিচিত করে তুললেন। কলম্বিয়ার ভালদেরামার কথা হয়তো অনেকের মনে থাকার কথা। নরওয়ের হল্যান্ডের কথা ভুললেও চলবে না। অংশগ্রহণকারী দলগুলোতে তৈরি হয় তারকা ফুটবলার। এদেরকে নিয়ে তৈরি হয় কতো গল্প। কতো কাহিনি লিখিত হয়। এদের তালিকা অনেক দীর্ঘ। অন্য আরেক লেখায় বিস্তারিত লিখবো আশা করি।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে ১৯৯৮ সালে ফ্রান্স বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা ১৬ থেকে বাড়িয়ে ৩২টি করা হয়। দীর্ঘ সময় এই ৩২ দলের ফরম্যাট চলার পর, ২০২৬ সালে কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপে দলের সংখ্যা ৪৮-এ উন্নীত করা হয়েছে।
বিশ্বকাপ ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় আয়োজন। প্রতি চার বছর পরপর আমরা আনন্দে মেতে উঠি। সারা বিশ্ব মেতে থাকে একটি মাস। কোটি কোটি মানুষের উন্মাদনা দেখে বিশ্ব। জমজমাট এই বিশ্বকাপে উত্থান ঘটে তারকাদের। হয়তো একদিন আমাদের বাংলাদেশেও মহাতারকা তৈরি হবে আমরা সেই দিনের প্রতীক্ষায় রইলাম।
