পাকিস্তান-শাসিত জম্মু ও কাশ্মীরে (পিওকে) রাজনৈতিক উত্তেজনা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। জম্মু-কাশ্মীর জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি (জেএএসি) পাক সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছে। তারা সতর্ক করে বলেছে, তাদের ৩৮ দফা দাবি পূরণ না হলে ‘চূড়ান্ত ও সর্ববৃহৎ’ আন্দোলন শুরু হবে।
আগামী ২৭ জুলাই অনুষ্ঠিতব্য আঞ্চলিক নির্বাচনকে ঘিরেই নতুন করে এই সংকট তৈরি হয়েছে। ৯ জুন থেকে মনোনয়নপত্র জমা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও জেএএসি মুজাফফরাবাদের দিকে বিশাল বিক্ষোভ মিছিলের ঘোষণা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম বড় রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
বিতর্কের কেন্দ্রে ‘শরণার্থী আসন’
অঞ্চলটিতে বর্তমান আন্দোলনের প্রধান ইস্যু হলো পাকিস্তানে বসবাসরত কাশ্মীরি শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত আইনসভার ১২টি আসন বাতিলের দাবি।
জেএএসির অভিযোগ, এই সংরক্ষিত আসনের মাধ্যমে ইসলামাবাদ পিওকের রাজনীতিতে অতিরিক্ত প্রভাব বজায় রাখছে।
সাংবাদিক লভ পুরির তথ্য অনুযায়ী, এই ১২টি আসনে নিবন্ধিত ভোটার প্রায় ৪ লাখ ৩৬ হাজার। অন্যদিকে, পিওকের বাসিন্দাদের জন্য সরাসরি নির্বাচিত ৩৩টি আসনে ভোটার সংখ্যা প্রায় ৩৩ লাখ।
সমালোচকদের মতে, এতে শরণার্থী আসনগুলোর ভোটের মূল্য স্থানীয় বাসিন্দাদের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে দাঁড়ায়।
তবে গত ৭ জুন পিওকের সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে, সংরক্ষিত ১২টি আসন সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত। তাই নির্বাহী আদেশে এগুলো বাতিল করা যাবে না; এর জন্য সাংবিধানিক সংশোধন প্রয়োজন।
৩৮ দফা দাবিতে অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিফলন
সংরক্ষিত আসন বাতিলের দাবির পাশাপাশি জেএএসি তাদের ৩৮ দফা দাবিতে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর চুক্তি পুনর্বিবেচনা, আটাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে বেশি ভর্তুকি এবং বিদ্যুতের দাম কমানোর দাবি জানিয়েছে।
সংগঠনটির দাবি, যে অঞ্চলে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়, সেখানকার মানুষকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কিনতে বাধ্য করা অন্যায়।
তাদের অভিযোগ, রাজনৈতিকভাবে উপেক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক বৈষম্যেরও শিকার হচ্ছেন পিওকের বাসিন্দারা।
দ্রুত প্রভাবশালী হয়ে ওঠা জেএএসি
২০২৩ সালে গঠিত জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি অল্প সময়েই পিওকের অন্যতম শক্তিশালী নাগরিক অধিকারভিত্তিক সংগঠনে পরিণত হয়েছে।
২০২৪ সালের মে মাসে মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে এবং গিলগিট-বালতিস্তানের মতো ভর্তুকির দাবিতে সংগঠনটির নেতৃত্বে ব্যাপক আন্দোলন হয়। সেই সময় অবস্থান কর্মসূচি, হরতাল ও সড়ক অবরোধে পিওকের বড় অংশ কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল।
এরপর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরেও সংগঠনটি আরেকটি বড় আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়।
কতটা স্বায়ত্তশাসিত পিওকে?
পাকিস্তান অঞ্চলটিকে “আজাদ কাশ্মীর” বলে উল্লেখ করলেও এর সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে।
পাকিস্তানের সংবিধানের ১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, পিওকে দেশটির কোনো প্রদেশ নয়। ফলে অঞ্চলটির কোনো প্রতিনিধি পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে নেই।
কাগজে-কলমে পিওকের নিজস্ব রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, সুপ্রিম কোর্ট ও আইনসভা রয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষমতার বড় অংশই ইসলামাবাদ-নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হাতে, বিশেষ করে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন কাশ্মীর কাউন্সিলের মাধ্যমে।
এছাড়া পিওকের সংবিধান অনুযায়ী, পাকিস্তানের সঙ্গে একীভূত হওয়ার বিরোধিতা করে এমন ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিতে পারে না। প্রার্থী হতে হলে পাকিস্তানের সঙ্গে অন্তর্ভুক্তির পক্ষে অঙ্গীকারপত্রে স্বাক্ষর করতে হয়।
সম্পদে সমৃদ্ধ, উন্নয়নে পিছিয়ে
বনসম্পদ, গ্রাফাইট, মার্বেল, মূল্যবান রত্ন এবং বিপুল জলসম্পদে সমৃদ্ধ পিওকে পাকিস্তানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পাকিস্তানের পাঞ্জাব ও সিন্ধু অঞ্চলের কৃষিকাজে ব্যবহৃত প্রায় ৭০ শতাংশ সেচের পানি সিন্দু নদী ব্যবস্থার মাধ্যমে পিওকে থেকে আসে।
একই সঙ্গে এখানকার জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো পাকিস্তানের মোট বিদ্যুতের প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ উৎপাদন করে ।
তবুও স্থানীয়দের অভিযোগ, এই সম্পদ থেকে অর্জিত আয়ের বেশিরভাগই পাকিস্তানের মূল ভূখণ্ডে চলে যায়। অথচ পিওকের অবকাঠামো ও জনসেবামূলক খাত এখনো পিছিয়ে রয়েছে।
খাদ্য সংকট ও স্বাস্থ্যসেবার দুরবস্থা
২০২৫ সালে নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, পিওকের প্রায় ৬৬ শতাংশ মানুষ কৃষি ও পশুপালনের ওপর নির্ভরশীল হলেও ৫৭ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
এছাড়া প্রায় ২৯ শতাংশ মানুষ অপুষ্টিতে আক্রান্ত, যা পাকিস্তানের জাতীয় গড় ১৯ দশমিক ৯ শতাংশের তুলনায় অনেক বেশি। পাহাড়ি এলাকাগুলোতে প্রায় ৯০ শতাংশ পরিবার খাদ্য সংকটে রয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
পাকিস্তানের স্বেচ্ছা জাতীয় পর্যালোচনা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কম বয়সী ৩৯ শতাংশ শিশু খর্বাকৃতির এবং প্রতি এক লাখ জীবিত জন্মে ১০৪ জন মায়ের মৃত্যু হয়।
নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি
রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই নিরাপত্তা পরিস্থিতিরও অবনতি হয়েছে। রাজনৈতিক কর্মী আমজাদ মির্জার অভিযোগ, সাম্প্রতিক অভিযানে ৬০০ জনের বেশি আন্দোলনকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ১০০ জনেরও বেশি বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। তবে এসব দাবির স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অ্যাসাইলাম সংস্থার ২০২৬ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর এবং গিলগিট-বালতিস্তানে ৩৯টি নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনায় অন্তত ৫৬ জন নিহত হয়েছেন।
এদিকে পাকিস্তান ইনস্টিটিউট ফর কনফ্লিক্ট অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ (পিআইসিএসএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পাকিস্তানে ১ হাজার ৪৫টি সন্ত্রাসী হামলায় ১ হাজার ১৩৯ জন নিহত হন, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর বড় কারণ হিসেবে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) পুনরুত্থানকে দায়ী করা হয়েছে।
ভারতের অবস্থান
পিওকের বিষয়ে ভারতের অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই অপরিবর্তিত। ভারতের মতে, ১৯৪৭ সালের ২৬ অক্টোবর তৎকালীন জম্মু ও কাশ্মীরের শাসক মহারাজা হরি সিং ‘ইনস্ট্রুমেন্ট অব অ্যাকসেশন’-এ স্বাক্ষর করে রাজ্যটিকে আইনগতভাবে ভারতের সঙ্গে যুক্ত করেন। এটি সে সময় ভারতের অন্যান্য দেশীয় রাজ্যগুলোর অন্তর্ভুক্তির একই প্রক্রিয়া ছিল।
ভারতের দাবি, এরপর পাকিস্তান উপজাতীয় বাহিনী ও পরে নিয়মিত সেনা পাঠিয়ে ওই অঞ্চলে হামলা চালায়, যার ফলে প্রথম ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হয়।
১৯৯৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ভারতের সংসদের উভয় কক্ষ সর্বসম্মতিক্রমে একটি প্রস্তাব পাস করে, যেখানে তৎকালীন সমগ্র জম্মু ও কাশ্মীরকে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং পাকিস্তানের দখলে থাকা অঞ্চল ছেড়ে দেয়ার আহ্বান জানানো হয়।
জুলাইয়ের আঞ্চলিক নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে জেএএসির আন্দোলনের হুমকি নতুন মাত্রা পেয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, পিওকে আবারও বড় ধরনের রাজনৈতিক সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে।

MD NAHID HOSSAIN
২ ঘন্টা আগেপেছনে আছে ইন্ডিয়া