ভারতের সঙ্গে ঐতিহাসিক ইউরেনিয়াম চুক্তি অস্ট্রেলিয়ার

দীর্ঘ অচলাবস্থার অবসান

ভারতের সঙ্গে ঐতিহাসিক ইউরেনিয়াম চুক্তি অস্ট্রেলিয়ার

ফন্ট সাইজ:

দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকা ইউরেনিয়াম রপ্তানি চুক্তি অবশেষে বাস্তবায়নের পথে। ভারতের কাছে অবশেষে ইউরেনিয়াম বিক্রিতে সম্মত হয়েছে অস্ট্রেলিয়া। বৃহস্পতিবার (৮ জুলাই) মেলবোর্নে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে এ-সংক্রান্ত একটি প্রশাসনিক চুক্তি সই হয়েছে। খবর এপির।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এনিয়ে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যৌথভাবে ঘোষণা দিয়েছেন। যদিও কত পরিমাণ ইউরেনিয়াম বিক্রি করা হবে কিংবা কবে থেকে রপ্তানি শুরু হবে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য জানানো হয়নি।

২০১৪ সালে অস্ট্রেলিয়া ভারতের কাছে ইউরেনিয়াম রপ্তানির নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলেও, সেই চুক্তি এতদিন কার্যকর হয়নি। মূল কারণ ছিল- ভারত ইউরেনিয়ামকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করতে পারে- এমন আশঙ্কা।

বিশ্বের সর্ববৃহৎ পরিচিত ইউরেনিয়াম মজুদের দেশ অস্ট্রেলিয়া। দেশটি নিজে পারমাণবিক বিদ্যুৎ বা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করে না; উৎপাদিত সব ইউরেনিয়ামই রপ্তানি করা হয়।
অন্যদিকে, ১৪০ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার ভারত ২০৪৭ সালের মধ্যে ১০০ গিগাওয়াট পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই পরিমাণ বিদ্যুৎ দিয়ে বছরে প্রায় ছয় কোটি ভারতীয় পরিবারের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গত এক দশকে ভারত তার পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দ্বিগুণ করেছে। তবে এখনও দেশটির মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্র ৩ শতাংশ আসে পারমাণবিক শক্তি থেকে।
ভারত পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি)-এর সদস্য নয়। এই চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও রাশিয়াকে স্বীকৃত পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়া এনপিটির সদস্য হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে চুক্তিতে স্বাক্ষর না করা দেশগুলোর কাছে ইউরেনিয়াম বিক্রিতে আপত্তি জানিয়ে এসেছে।
ভারতের দাবি, এনপিটি বৈষম্যমূলক, কারণ এটি শুধু ১৯৬৭ সালের আগে পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালানো দেশগুলোকে বৈধ পারমাণবিক শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ফলে ভারত স্থায়ীভাবে সেই স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হয়।
১৯৯৮ সালে পারমাণবিক পরীক্ষা চালানোর পর ভারত আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিগত নিষেধাজ্ঞা এবং ইউরেনিয়াম আমদানিতে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ে।

তবে ২০০৮ সালে নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপ (এনএসজি) ভারতের জন্য বিশেষ ছাড় অনুমোদন করে। এরপর থেকে ভারত বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ইউরেনিয়াম সরবরাহ চুক্তি করে আসছে। চলতি বছরের মার্চে কানাডার সঙ্গেও এ ধরনের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে নয়াদিল্লি।

অস্ট্রেলিয়া ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) নিরাপত্তা তদারকি এবং ভারতের বেসামরিক ও সামরিক পারমাণবিক কর্মসূচিকে পৃথক রাখার শর্তে ইউরেনিয়াম রপ্তানিতে সম্মতি দেয়।

বৃহস্পতিবার স্বাক্ষরিত প্রশাসনিক চুক্তির মাধ্যমে সেই পুরোনো চুক্তি বাস্তবায়নের পথে থাকা অবশিষ্ট বাধাগুলো দূর হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইন্দো-প্যাসিফিকে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের অঙ্গীকার
বার্ষিক শীর্ষ বৈঠকে অংশ নিতে বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া সফর করছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বৈঠকের পর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে দুই নেতা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও গভীর করার অঙ্গীকার করেছেন।

যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, দুই দেশের সম্পর্কের গভীরতা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষায় এটি একটি “গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের” প্রতিফলন।
এই ঘোষণা এমন সময় এলো, যখন সম্প্রতি চীনের একটি পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন থেকে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার সমালোচনা করেছিল অস্ট্রেলিয়া।
তবে সংবাদ সম্মেলনে আলবানিজ ও মোদি কেউই সরাসরি চীনের নাম উল্লেখ করেননি এবং সাংবাদিকদের প্রশ্নও নেননি।

বাণিজ্যিক সম্পর্কও সম্প্রসারণের পথে
অস্ট্রেলিয়ার সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দুই দেশের মধ্যে পণ্য ও সেবা বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৫৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার (প্রায় ৩৭ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)। বর্তমানে ভারত অস্ট্রেলিয়ার পঞ্চম বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার।
অস্ট্রেলিয়া সফরের আগে প্রধানমন্ত্রী মোদি ইন্দোনেশিয়া সফর করেন। শুক্রবার তার নিউজিল্যান্ড সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে। এটি হবে দেশটিতে তার প্রথম সরকারি সফর। চলতি বছরের এপ্রিলে ভারত ও নিউজিল্যান্ড একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষর করেছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন