বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে আটলান্টা স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হয় বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও আন্ডারডগ মিশর। দুই গোলের ব্যবধানে পিছিয়ে পড়েও, শেষ মুহূর্তের জাদুতে ৩-২ ব্যবধানে ম্যাচ জিতে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করে আলবিসেলেস্তেরা। তবে মাঠের সেই অনবদ্য প্রত্যাবর্তন ছাপিয়ে এখন টালমাটাল বিশ্বমঞ্চ। ম্যাচ শেষে ফিফা ও রেফারির বিরুদ্ধে ‘ম্যাচ পাতানো’, ‘প্রতারণা’ এবং লিওনেল মেসিকে টুর্নামেন্টে টিকিয়ে রাখার চেষ্টার বিস্ফোরক অভিযোগ এনেছে মিশর শিবির।
ম্যাচের শুরুতেই ইয়াসের ইব্রাহিমের হেডে এগিয়ে যায় মিশর। এরপর আর্জেন্টিনা পেনাল্টি পেলেও, লিওনেল মেসির শট দারুণভাবে ঠেকিয়ে দেন মিশরীয় কিপার মোস্তফা সোবের। প্রথমার্ধে ১-০-তে এগিয়ে থাকা মিশর দ্বিতীয়ার্ধে মোস্তফা জিকোর গোলে ব্যবধান দ্বিগুণ করে। কিন্তু এই ২-০ ব্যবধানের আগেই জিকোর আরও একটি গোল ভিএআর পরীক্ষার পর বাতিল করেন ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লাতেজিয়ার। রেফারির দাবি ছিল, গোল হওয়ার প্রায় ২০ সেকেন্ড আগে মাঠের অন্য প্রান্তে লিসান্দ্রো মার্তিনেজকে ফাউল করা হয়েছিল। পরের ঘটনাটা ম্যাচের ইনজুরি টাইমের। এনজো ফার্নান্দেজের করা জয়সূচক গোলের ঠিক আগে অ্যালেক্সিস ম্যাক
আলিস্টার হামদি ফাথিকে ডি-বক্সে টেনে ফেলে দেন। তবে সেটি ভিএআরে চেক না করায় ক্ষোভে ফেটে পড়েন মিশরীয় কোচ হোসাম হাসান। ম্যাচ শেষে রেফারিকে মাঠেই ধুয়ে দেয়ার পর সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো সম্মান বা ফেয়ার প্লে দেখিনি। আমাদের একটি নিশ্চিত পেনাল্টি দেয়া হয়নি, ভিএআর চেক পর্যন্ত করা হয়নি। উল্টো আমাদের দ্বিতীয় গোলটি অবিশ্বাস্যভাবে বাতিল করা হলো। আমি সুন্দর ভাষায় ‘হার্ড লাক’ বলতে পারতাম, কিন্তু আমাদের সঙ্গে আজ অন্যায় করা হয়েছে। আমরা চিটিংয়ের শিকার হয়েছি।’ ফিফা ও মেসিকে কাঠগড়ায়
দাঁড় করিয়ে হোসাম হাসান আরও বলেন, ‘আমরা বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের চেয়ে সবদিক থেকে ভালো খেলেছি। কিন্তু ম্যাচের ফল মাঠের ভেতরের এবং বাইরের কিছু ‘বাহ্যিক প্রভাব’ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। হয়তো তারা চেয়েছিল বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা টুর্নামেন্টে টিকে থাকুক। হয়তো তারা চেয়েছিল মেসি যেন রেস থেকে ছিটকে না যায়। বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা সব পর্যায় থেকে আজ সমর্থন পেয়েছে।’
এমনকি ম্যাচের সময় নিয়েও ক্ষোভ ঝাড়েন মিশরীয় কোচ। স্থানীয় সময় দুপুর ১২টার কিক-অফ নিয়ে তিনি বলেন, ‘যে এই সূচি বানিয়েছে সে জীবনে ফুটবল খেলেনি। দুপুরে মানুষ হাঁটতে বের হয় বা ব্রাঞ্চ (ব্রেকফাস্ট এবং লাঞ্চের মিশ্রণ) করতে যায়, ফুটবল খেলতে নয়!’ আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচের শেষ ১০ মিনিটে ডিফেন্সের কিছু ভুলে ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, লিওনেল মেসি এবং শেষ মুহূর্তে এনজো ফার্নান্দেজের গোলে হৃদয়ভঙ্গ হয় ফারাওদের। তবে ম্যাচ শেষে ড্রেসিংরুমে দলের সবাইকে শান্ত করেন অধিনায়ক মোহাম্মদ সালাহ। রিজার্ভ কিপার মোহাম্মদ আলা জানান, ‘অধিনায়ক সালাহ লকার রুমে এসে সবাইকে জড়ো করে বলেছেন- ‘হার্ড লাক, যা হওয়ার হয়ে গেছে।
এটাই আল্লাহ্র ইচ্ছা ছিল। এই পারফরম্যান্সকে ভিত্তি করে আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে।’ ‘দিনের আলোর মতো পরিষ্কার, এটি একটি পাতানো ম্যাচ’। ম্যাচ শেষে মাঠেই কান্নায় ভেঙে পড়েন মিশরের ফরোয়ার্ড ও গোলদাতা মোস্তফা জিকো। মিক্সড জোনে এসে রেফারির পক্ষপাতিত্ব নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়ে সরাসরি ম্যাচ পাতানোর বোমা ফাটান তিনি। ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি জিকোর নামে নাম রাখা এই ফুটবলার বলেন, ‘রেফারি মোটেও ভালো ছিলেন না, তিনি পুরোপুরি অন্যায় করেছেন। তার এই অবিচার সবার সামনে পরিষ্কার ছিল। ম্যাচের শুরু থেকেই তিনি আমাদের নিপীড়ন করছিলেন। তিনি চাননি আমরা জিতি।’ আবেগ ধরে রাখতে না পেরে বিস্ফোরক কণ্ঠে এই ফরোয়ার্ড আরও বলেন, ‘এটি একটি পাতানো ম্যাচ ছিল। এতে আমাদের কোনো ভুল ছিল না। মনে হচ্ছে এই ম্যাচটি আগে থেকেই পাতানো ছিল। আমরা ২-০-তে জিতছিলাম, আর তিনি অনবরত
আমাদের ওপর চড়াও হচ্ছিলেন। মনে হচ্ছে, আরেকটা বিশ্বকাপের জন্য আর্জেন্টিনাকে আগেভাগেই অভিনন্দন জানিয়ে দেয়া উচিত।’ মাঠের পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষুব্ধ জিকো বলেন, ‘আমরা বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিরুদ্ধে দুর্দান্ত খেলেছি। দ্বিতীয়ার্ধে কী যে হলো- আমি জানি না। মাঠে এমন কিছু অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে, যা সবাই দেখেছে। এটা দুপুরের খাঁ খাঁ রোদের মতো, দিনের আলোর মতো পরিষ্কার ছিল।’
