নাটকীয় রাত। দুই গোলে পিছিয়ে পড়ে আর্জেন্টিনার দারুণ কামব্যাক। ৭২ বছরের অপেক্ষা শেষে সুইজারল্যান্ডের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে আসা। ৭ই জুলাই বিশ্বকাপের মঞ্চে রচিত হলো একের পর এক ইতিহাস।
মেসির রেকর্ডের মহাকাব্য
মিশরের বিপক্ষে শেষ ষোলোর লড়াইয়ে মেসি এক রেকর্ড গড়েছেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে টানা ৬ নকআউট ম্যাচে গোল করেন মেসি। ২০২২ বিশ্বকাপে ৪ এবং এবার ২ গোল মিলে মোট ৬ বার জাল কাঁপান আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে মেসির গোলসংখ্যা এখন ৭। এই তালিকায় ব্রাজিলের পেলে, ভাভা এবং চেকোস্লোভাকিয়ার ওল্ডরিখ নেয়েদলির সমকক্ষ হলেন তিনি। মিশরের বিপক্ষে গোলটি ছিল এই বিশ্বকাপে মেসির অষ্টম গোল। এতে এমবাপ্পে ও হালান্দকে (দু’জনেরই ৭ গোল) পেছনে ফেলে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে শীর্ষে উঠে গেছেন তিনি। একইসঙ্গে ১৯৩০ সালে গুইলেরমো স্তাবিলের করা আর্জেন্টিনার এক বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডও স্পর্শ করেছেন। একটি দলের পাঁচ ম্যাচের মধ্যে কোনো খেলোয়াড়ের এই গোলসংখ্যা ১৯৭০ সালে গার্ড মুলারের পর (১০ গোল) সর্বোচ্চ। মেসির বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারে অ্যাসিস্টের সংখ্যা এখন ৯। যা ১৯৬৬ সাল থেকে রেকর্ড রাখা শুরুর পর বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। মিশরের বিপক্ষে এই অ্যাসিস্টের আগ পর্যন্ত ম্যারাডোনার সঙ্গে যৌথভাবে রেকর্ডে ছিলেন তিনি। এবার সেই রেকর্ড ভেঙে একাই শীর্ষে উঠে গেলেন আর্জেন্টাইন এই কিংবদন্তি। বিশ্বকাপে টানা গোল করার নিজের রেকর্ড আরও বাড়ালেন মেসি। মিশরের বিপক্ষে গোল করে এখন টানা ৯ বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার কীর্তি গড়লেন তিনি। যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ৭টি গোল ও ৭টি অ্যাসিস্ট মিলিয়ে মেসির মোট গোল সম্পৃক্ততা এখন ১৪। গত ৬০ বছরে এটি যেকোনো খেলোয়াড়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই কীর্তিতে এতদিন ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে যৌথভাবে শীর্ষে ছিলেন মেসি। মিশরের বিপক্ষে গোল করার পাশাপাশি মেসি ৫টির বেশি ড্রিবল সম্পন্ন করেন। চান্স তৈরি করেন ৫টির বেশি। এর আগে ১৯৮৬ বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের বিপক্ষে এই কীর্তি গড়েন দিয়েগো ম্যারাডোনা। মেসি এই ম্যাচে তৈরি করেন ৬টি চান্স। এটি তার বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। সর্বোচ্চ ৯টি চান্স তিনি তৈরি করেছিলেন সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ২০১৪ সালে। কোয়ার্টার ফাইনালে সেই সুইজারল্যান্ডের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা।
আর্জেন্টিনার দলগত রেকর্ড
শুধু মেসি নন, দল হিসেবেও রেকর্ড গড়েছে আর্জেন্টিনা। দুই গোলে পিছিয়ে থেকে শেষ ১৫ মিনিটে জয়। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটি প্রথম। এমনকি কোনো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন দলের জন্যও এটি প্রথম। এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ৭৬ মিনিটের পর গোলের সংখ্যা ৮। যা ১৯৫৪ সালে পশ্চিম জার্মানির সমান এবং যেকোনো এক বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ। বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা এখন টানা ১১ ম্যাচ ধরে অপরাজিত। এটি আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ইতিহাসে রেকর্ড। টানা ১১টি ম্যাচে একাধিক গোল করার রেকর্ড গড়লো আলবিসেলেস্তরা। যা ১৯৩০-৫৪ পর্যন্ত উরুগুয়ের সমান। ইনজুরি টাইমে এনজো ফার্নান্দেজের জয়সূচক হেড ছিল এই বিশ্বকাপে ৯০ মিনিট বা তারপর করা দশম জয়সূচক গোল। যা যেকোনো বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ।
৭২ বছর পর কোয়ার্টার ফাইনালে সুইসরা
অতিরিক্ত সময়েও গোলশূন্য থাকার পর পেনাল্টি শুটআউটে কলম্বিয়াকে ৪-৩ ব্যবধানে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে সুইজারল্যান্ড। তারা সর্বশেষ কোয়ার্টার ফাইনালে খেলেছিল ১৯৫৪ সালে। দীর্ঘ ৭২ বছরের অপেক্ষার পর আবার কোয়ার্টার ফাইনালে ফিরলো সুইসরা। এটি বিশ্বকাপের ইতিহাসে দু’টি কোয়ার্টার ফাইনালের মধ্যে কোনো দলের দীর্ঘতম বিরতি। সুইস গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেল এবারের টুর্নামেন্টে মোট ৩.০ এক্সপেক্টেড গোল ঠেকিয়েছেন। যা যেকোনো গোলরক্ষকের মধ্যে সর্বোচ্চ। সুইজারল্যান্ড-কলম্বিয়া ম্যাচের নির্ধারিত সময় শেষ হয় গোলশূন্য ড্র’য়ে। এটি এই বিশ্বকাপে অষ্টম গোলশূন্য ড্র। যেটি যেকোনো বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ। এ ম্যাচে মোট শট ছিল ১৩টি, চান্স মাত্র ৬টি। এটি এবারের বিশ্বকাপে যেকোনো ম্যাচে সবচেয়ে কম।
কলম্বিয়ার বিদায়ে জেমস রদ্রিগেজের মাইলফলক
কলম্বিয়ার বিদায় বেদনাদায়ক হলেও জেমস রদ্রিগেজ এই ম্যাচে ব্যক্তিগত এক মাইলফলক গড়েন। কলম্বিয়ার হয়ে ১৩১তম ম্যাচ খেলে দাভিদ অসপিনার রেকর্ড স্পর্শ করেন তিনি। একইসঙ্গে কলম্বিয়ার হয়ে বিশ্বকাপে ১১টি ম্যাচ খেলার রেকর্ডও রদ্রিগেজের। যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তবে কলম্বিয়া পেনাল্টিতে আবারো ব্যর্থ। শেষ পাঁচ পেনাল্টি শুটআউটের চারটিতেই হেরেছে তারা। বিশ্বকাপে দু’টি শুটআউটেই হারলো কলম্বিয়া। ২০১৮ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এবং এবার সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে।
কোয়ার্টার ফাইনালে ইউরোপের আধিপত্য
এই বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইউরোপের ছয়টি দল জায়গা করে নিয়েছে। ১৯৩৪, ১৯৫৮ ও ১৯৯৪ সালের পর এমনটা ঘটেছে।
