ভ্যাঙ্কুভারের বিসি প্লেস স্টেডিয়ামে টাইব্রেকারের স্নায়ুক্ষয়ী রোমাঞ্চ দেখলো ফুটবল বিশ্ব। সেখানে কলম্বিয়াকে ৪-৩ ব্যবধানে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে সুইজারল্যান্ড। এই জয়ের মাধ্যমে দীর্ঘ ৭২ বছরের নকআউট জুজু এবং নিজেদের পুরনো টাইব্রেকার ‘অভিশাপ’ ভাঙলো সুইসরা। নির্ধারিত ৯০ মিনিট এবং অতিরিক্ত ৩০ মিনিটের ম্যাচ গোলশূন্য থাকার পর ম্যাচ গড়ায় ভাগ্যনির্ধারণী পেনাল্টি শুটআউটে। সেখানে কলম্বিয়ার ডাভিনসন সানচেজ বল মারেন ক্রসবারে এবং কুচো হার্নান্দেজের শট দুর্দান্তভাবে ঠেকিয়ে দেন সুইস গোলকিপার গ্রেগর কোবেল। সুইজারল্যান্ডের ম্যানুয়েল আকাঞ্জি নিজের পেনাল্টি মিস করলেও, শেষ শটে রুবেন ভারগাস কোনো ভুল করেননি। বল জালে জড়াতেই গ্যালারির এক প্রান্তের লাল-সাদা সমর্থকদের মাঝে নেমে আসে বাঁধভাঙা উল্লাস, আর মাঠের ওপর কান্নায় ভেঙে পড়েন কলম্বিয়ান ফুটবলাররা।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এর আগে মাত্র একবারই টাইব্রেকারের মুখোমুখি হয় সুইজারল্যান্ড। ২০০৬ বিশ্বকাপেও ইউক্রেনের কাছে হেরে বিদায় নিতে হয় তাদের। সব ধরনের বড় টুর্নামেন্ট মিলিয়ে শেষ ছয়টি টাইব্রেকারের পাঁচটিতেই হেরে যাওয়া সুইসদের জন্য এই জয় ছিল এক মহা স্বস্তির। ম্যাচ শেষে সুইস ব্রডকাস্টার এসআরএফ-কে আবেগ আপ্লুত কোচ মুরাত ইয়াকিন বলেন, ‘আমরা যেন এক ঘোরের মধ্যে আছি। ঠিক কী ঘটে গেল, এখনো পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারছি না। অবিশ্বাস্য একটা লড়াই করতে হয়েছে আমাদের। ধৈর্য আর বুদ্ধিমত্তার চরম পরীক্ষা ছিল আজ। অবশেষে টাইব্রেকারে আমরা অভিশাপ ভাঙতে পেরেছি। খেলোয়াড়, স্টাফ এবং দেশের সব সমর্থকের জন্য আমি ভীষণ আনন্দিত।’
পেনাল্টি মিস করে খলনায়ক হতে যাওয়া ডিফেন্ডার ম্যানুয়েল আকাঞ্জি বলেন, ‘আমি কোচকে ম্যাচ শেষেই বলে দিয়েছি, এটাই আমার জীবনের শেষ পেনাল্টি শট ছিল। একদম বিপর্যয়কর শট মেরেছিলাম। শেষ মুহূর্তে মন পরিবর্তন করায় বল গোলপোস্টের চার মিটার উপর দিয়ে চলে যায়। তবে দল যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, তাতে আমি গর্বিত।’ ম্যাচের আগের দিন অনুশীলনে হাঁটুতে চোট পেয়ে ছিটকে যান সুইজারল্যান্ডের এই বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা জোহান মানজাম্বি (৪ ম্যাচে ৩ গোল)। তার অনুপস্থিতি সুইসদের আক্রমণভাগের ধার অনেকটাই কমিয়ে দেয়। পুরো ম্যাচটি মূলত রূপ নেয় দুই কোচের ট্যাকটিক্যাল দাবার বোর্ডে। মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ কখনো কলম্বিয়া, আবার কখনো সুইজারল্যান্ডের পায়ে যায়। পুরো স্টেডিয়াম জুড়ে উপস্থিত প্রায় ৫২ হাজার দর্শকের সিংহভাগই ছিল কলম্বিয়ার হলদে জার্সিতে মোড়ানো। গ্যালারির সেই চিৎকার মাঠেও জ্বালানি জোগায় কলম্বিয়ানদের।
ম্যাচের ২১ মিনিটে জেফারসন লেরমার পাস থেকে গুস্তাভো পুয়ের্তার বাঁকানো শট দারুণভাবে রুখে দেন কোবেল। এর কিছুক্ষণ পর সুইজারল্যান্ডের ড্যান এনদয়ের শট ঠেকিয়ে দেন কলম্বিয়া কিপার কামিলো ভারগাস। অতিরিক্ত সময়ে কলম্বিয়াই বেশি সুযোগ তৈরি করে। ৯৮ মিনিটে হুয়ান কুয়েনতেরোর কর্নার থেকে জন লুকুমি’র হেড সুইসদের ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে।
ম্যাচের ১১৬ মিনিটে কলম্বিয়াকে জেতানোর সুবর্ণ সুযোগ নষ্ট করেন হামিন্টন ক্যাম্পাজ। ১০ গজ দূর থেকে তার নেয়া শট গোলবারের অনেক উপর দিয়ে চলে যায়। পেনাল্টি শুটআউটের নায়ক গোলকিপার কোবেলের প্রশংসায় পঞ্চমুখ কোচ ইয়াকিন বলেন, ‘কোবেল একটা পাওয়ারহাউজ। ও বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলকিপার। আজ ও যেভাবে আমাদের বাঁচালো, তা অসাধারণ।’ আগামী রোববার সকালে কানসাস সিটির অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে সেমিফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হবে সুইজারল্যান্ড। সেখানে তাদের সামলাতে হবে লিওনেল মেসিকে। লড়াইটা যে কঠিন, তা ভালো করেই জানেন সুইস অধিনায়ক গ্রানিত জাকা। তবে প্রত্যয়ী জাকা বলেন, ‘কোয়ার্টারে ওঠা আমাদের প্রথম লক্ষ্য ছিল, সেটা পূরণ হয়েছে। তবে আপনি যখন শেষ আটে পৌঁছাবেন, তখন খিদে আরও বেড়ে যায়। এবার ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে আমাদের আসল চ্যালেঞ্জ।’
অন্যদিকে, এত সুযোগ নষ্ট করে ম্যাচ হারায় হতাশ কলম্বিয়ান কোচ নেস্টর লরেঞ্জো কোনো অজুহাত দিতে চাননি। তিনি বলেন, ‘আমার খেলোয়াড়রা দারুণ খেলেছে, তাদের দোষ দেয়ার কিছু নেই। ফুটবলাররা তো মানুষ, রোবট নয়। কখনো গোল হবে, কখনো হবে না- এটাই ফুটবল।’
