আর্জেন্টিনা-মিশর লড়াইয়ে রেফারির সিদ্ধান্তে উত্তাল ফুটবল বিশ্ব! নকআউটের হাই-ভোল্টেজ এই ম্যাচে প্রতিটি বাঁশি যেন ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করেছে। তবে সব বিতর্ককে একপাশে রেখে ফুটবলের নিয়মকে বড় করে দেখছেন বাংলাদেশের সাবেক ফিফা রেফারি মাহমুদ জামাল ফারুকী নাহিদ। এটিকে দেখছেন নিয়মের চূড়ান্ত প্রয়োগ হিসেবে। তিনি বলেন, ‘গোল বাতিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে ভিএআর নিখুঁত পরীক্ষা চালায়। ফাউল থেকে বলটি পাওয়ার পরেই কিন্তু সেটি গোলে রূপান্তর করা হয়েছে। এই কারণেই বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। অন-ফিল্ড রেফারির সিদ্ধান্তে খেলা হয়তো স্বাভাবিকভাবেই চলতে পারতো, কিন্তু যেহেতু গোল হয়ে গেছে, তাই ভিএআর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নোটিস করেছে। রেফারির এই গোল বাতিলের সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ নিয়মসম্মত এবং সঠিক ছিল। রেফারিংয়ে একটি প্রচলিত কথা আছে ‘লেট ডিসিশন ইজ অলওয়েজ রাইট ডিসিশন’।
একটি সঠিক সিদ্ধান্ত দেওয়ার জন্য ২০ সেকেন্ড বা তার বেশিও সময় লাগে তাতে কোনো ক্ষতি নেই। দেখতে হবে সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত সঠিক হয়েছে কি না।’ মাঠে উত্তেজনার পারদ চরমে উঠলেও নিয়ম মেনে চলাই হলো পেশাদার রেফারিদের মূল লক্ষ্য। প্রযুক্তি ও মানবিক বিচারবুদ্ধির সমন্বয়ে রেফারি যেভাবে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন, তা আধুনিক ফুটবলের জন্য এক নতুন মানদণ্ড তৈরি করেছে, যা ভবিষ্যতে আরও বেশি কার্যকর হবে বলে জানান দুই যুগের বেশি অভিজ্ঞ রেফারি নাহিদ। তার মতে, এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে যে, ফুটবলের নিয়মের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। বিশেষ করে মোহাম্মদ সালাহর পেনাল্টি চাওয়া এবং তা না পাওয়ার ঘটনাটি মঙ্গলবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। ফুটবলবোদ্ধারা একে দ্বৈত নীতি বললেও এর পেছনে ছিল সূক্ষ্ম বিচারবোধ। এ বিষয়ে নাহিদ বলেন, ‘ম্যাচ পরিচালনায় ছিলেন জার্মানির অন্যতম সেরা রেফারি ফেলিক্স জোয়ার।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বর্তমানে যে ক’জন উঁচু মানের রেফারি আছেন, তিনি তাদের একজন। সাধারণ সমর্থক হিসেবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হয়তো আবেগের জায়গা থেকে ভিন্ন হয়, তবে একজন রেফারি হিসেবে আমাদের তীক্ষ্ণ চোখ দিয়ে যা দেখেছি সালাহ পড়ে যাওয়ার ঠিক আগে ডিফেন্ডার কিন্তু বলটিকে স্পর্শ করেছিলেন, সালাহ?কে নয়। ডিফেন্ডার প্রথমে বল টাচ্ করার পর সালাহ্র সঙ্গে তার একটি সামান্য শারীরিক স্পর্শ (সিলি কন্টাক্ট) হয়, যা ফুটবল খেলায় সম্পূর্ণ অনিবার্য (আনঅ্যাভয়েডেবল কন্টাক্ট)। ফুটবল একটি বডি কন্টাক্ট গেম, এখানে শরীরের সঙ্গে শরীরের ধাক্কা লাগতেই পারে। রেফারিকে দেখতে হয় সেই ট্যাকলটি ইচ্ছাকৃত বা ক্ষতিকারক ছিল কি না।
নিয়মের মধ্যে ছিল, তাই রেফারি পেনাল্টি দেয়নি।’ ম্যাচ চলাকালীন খেলোয়াড়দের মেজাজ গরম হওয়া এবং কার্ডের ব্যবহার নিয়ে অনেক বিতর্ক শোনা গেছে। আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের কার্ড দেখানো এবং মিশরের খেলোয়াড়দের কঠোর ট্যাকল উপেক্ষা করা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সমর্থকরা। এই পরিস্থিতি সামলানোর কৌশলের ব্যাখ্যায় নাহিদ জানান, ‘নকআউট পর্বের ম্যাচে মেজাজ গরম হওয়া স্বাভাবিক। রেফারি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গিয়ে কিছু কার্ড ব্যবহার করেছেন, যা গেম ম্যানেজমেন্টের অংশ। নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে এটি একটি ফেয়ার ম্যাচ। রেফারিকে ঘিরে ষড়যন্ত্রের তকমা দেওয়া কেবলই
উত্তপ্ত মস্তিষ্কের বহিঃপ্রকাশ। মাঠের উত্তপ্ত মুহূর্তে খেলোয়াড়দের মন্তব্য দিয়ে তাদের বিচার করা উচিত নয়। আসলে চাপের মুখে মাথা ঠাণ্ডা রেখে ম্যাচ পরিচালনা করা একজন রেফারির জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ও সার্থকতা। রেফারির নিরপেক্ষতাই খেলায় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সাহায্য করে।’ চলতি ফিফা বিশ্বকাপে সামগ্রিক রেফারিং মান নিয়ে বিশ্বজুড়ে সন্তুষ্টির পাশাপাশি ক্ষোভও বিরাজ করছে। তবুও ফুটবলের নিয়ম মেনেই রেফারিরা তাদের দায়িত্ব পালন করেছেন। এই বিষয়ে নাহিদ বলেন, ‘এই বিশ্বকাপ রেফারিংয়ের দিক থেকে অত্যন্ত সফল।
কোনো বড় বিতর্কের অবকাশ নেই। আমরা ঘরোয়া লীগেও অনেক সময় রেফারির ওপর দোষ চাপাই। এটি আমাদের সহজাত অভ্যাস। কিন্তু আন্তর্জাতিক ফুটবলে ফিফার নিয়ম অত্যন্ত কঠোর। রেফারিরা দারুণ কাজ করছেন। আমাদের বুঝতে হবে ফুটবলে আবেগের চেয়ে নিয়ম বড়। ম্যাচ শেষে সালাহ্ বা অন্য খেলোয়াড়রা মাঠের চাপে যা বলেছেন, তা নিয়ে বেশি ভাবার প্রয়োজন নেই। এটি একটি অত্যন্ত ফেয়ার রেফারিংয়ের বিশ্বকাপ ছিল।’
