ইউরোপকে সুরক্ষিত রাখতে আগামী দশ বছরে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির পেছনে বৃটেনসহ ১২টি দেশ ৫০০০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ ব্যয়ে একটি পরিকল্পনা নিতে পারে। ‘ডিপ প্রিসিশন স্ট্রাইক’ নামের এই নতুন প্রকল্পটির কথা ডাউনিং স্ট্রিট থেকে উন্মোচন করা হয়েছে, যা আজ বুধবার তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় চলমান ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে আলোচনা করা হবে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজের শেষ ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিতে আঙ্কারায় অবস্থান করছেন বৃটেনের স্যার কিয়ের স্টারমার। গত বছর প্রায় সব ন্যাটো সদস্য ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা খাতে জিডিপির ৩.৫ শতাংশ ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রায় সম্মত হলেও, স্টারমার এখনো তার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা পেশ না করায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে তিনি কিছুটা সমালোচনার মুখে পড়তে পারেন। তবে আজ বুধবার স্টারমার নতুন এই ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার জন্য প্রায় এক ডজন ন্যাটো নেতার সাথে বৈঠকে বসবেন। ন্যাটোর সবচেয়ে অত্যাধুনিক অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত এই ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রায় ২০০ মাইল (৩০০ কিলোমিটার) দূরের লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম, যার সীমা ভবিষ্যতে ১,২৫০ মাইল পর্যন্ত বর্ধিত করা হতে পারে। স্টারমার বলেন, বৃটেনের নেতৃত্বাধীন এই উদ্যোগ ন্যাটোকে দীর্ঘ সময় নিরাপদ রাখতে ইউরোপীয় মিত্রদের একসাথে কাজ করতে সাহায্য করবে। তবে অন্যান্য অনেক সামরিক প্রকল্পের মতো এই ডিপ স্ট্রাইক ক্ষেপণাস্ত্রটিও ২০৩০ এর দশকের আগে পুরোপুরি প্রস্তুত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। গত জুনে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইউরোপে মার্কিন বাহিনীর উপস্থিতির বিষয়ে একটি ছয় মাসের পর্যালোচনার ঘোষণা দিয়েছিলেন। ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই স্পষ্ট করে বলে আসছেন যে, ইউরোপের প্রতিরক্ষায় ন্যাটো সদস্যদের নিজেদের খরচ আরও বাড়াতে হবে।
এমনকি গত বছরের সম্মেলনে ন্যাটো সদস্যরা ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রায় একমত হয়েছিল। স্টারমার বৃটেনের প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ পরিকল্পনায় ২০৩০ সালের মধ্যে ইতিমধ্যেই ৩০০ বিলিয়ন পাউন্ডের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আঙ্কারার এই সম্মেলনে তিনি ন্যাটো ও বৃটেনের জন্য রাশিয়ার হুমকির বিষয়টি বিশেষভাবে জোর দিয়ে তুলে ধরবেন। বৃটিশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, মিত্র দেশের আকাশসীমার কাছাকাছি চলে আসা রুশ যুদ্ধবিমানকে বাধা দিতে ন্যাটো এ পর্যন্ত ৭০০ বারেরও বেশি নিজেদের ফাইটার জেট পাঠিয়েছে এবং বৃটিশ জলসীমার চারপাশে রুশ সামরিক তৎপরতা প্রায় ৩০ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। বৃটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেত কুপার বলেন, এই গভীর নিখুঁত আঘাত হানার ক্ষমতার মাধ্যমে বৃটেন ও আমাদের মিত্ররা যেকোনো আগ্রাসী পক্ষকে প্রতিহত করতে এবং পারস্পরিক নিরাপত্তা জোরদার করতে উচ্চ-মূল্যের সামরিক লক্ষ্যবস্তু ও সেনাবাহিনীর রসদ সরবরাহের ইঞ্জিনে আঘাত হানতে সক্ষম হবে। তিনি আরও যোগ করেন, আঙ্কারা থেকে তারা রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছেন যে, ন্যাটো এখন আরও শক্তিশালী, আরও বেশি ইউরোপীয় এবং রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি হুমকির বিরুদ্ধে নিজেদের নাগরিকদের রক্ষা করতে পুরোপুরি প্রস্তুত।
এদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি মঙ্গলবারের ভাষণে ক্রমবর্ধমান রুশ হামলা থেকে বাঁচতে জরুরি ভিত্তিতে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের জন্য ন্যাটো মিত্রদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। ইউক্রেন ইতিমধ্যেই রাশিয়ার ভেতরে তেল শোধনাগার এবং সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোতে নিজস্ব দূরপাল্লার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা জোরদার করেছে, যার ফলে সেখানে তীব্র জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুৎ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। ডাউনিং স্ট্রিট থেকে বলা হয়েছে, ইউক্রেনীয় বাহিনী প্রমাণ করেছে যে দূরপাল্লার ব্যবস্থার কার্যকর ব্যবহার রণক্ষেত্রে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
তবে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ মঙ্গলবার জানিয়েছেন, রাশিয়া আঙ্কারার এই শীর্ষ সম্মেলন খুব ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ন্যাটো থেকে কিয়েভ যত নতুন অস্ত্রই পাক না কেন, লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান চালানো থেকে বিরত রাখতে পারবে না। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, সম্মেলনে রাশিয়ার বিষয়ে যেসব বক্তব্য শোনা যাচ্ছে তা কোনো গঠনমূলক আলোচনা বা সংলাপের অংশ নয়, বরং সম্পূর্ণ সংঘাতমূলক। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উপায়ে এই সংঘাতের সমাধান করাই রাশিয়ার কাছে এখনো বেশি গ্রহণযোগ্য বলে পেসকভ উল্লেখ করেন।
