এসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (আটাব)-এর ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের দ্বিবার্ষিক নির্বাচনকে ঘিরে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচনে নিজের পছন্দের প্যানেলকে জয়ী করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে উড়োজাহাজের টিকিট সিন্ডিকেট চক্র। এজন্য তারা নির্বাচন পরিচালনায় জড়িতদের সঙ্গে একাধিক গোপন বৈঠক করেছেন। এ ছাড়া ভোটার তালিকায় ব্যাপক কারচুপি করা হয়েছে। সর্বশেষ প্রকাশিত তালিকায় মৃত ব্যক্তিকে ভোটার হিসাবে রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ভোটার তালিকায় থাকার যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও নিয়মবর্হিভূতভাবে অযোগ্যদের তালিকায় রাখার অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়াও নির্বাচনে হেভিওয়েট প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। এ নিয়েও চলছে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা। সবমিলিয়ে আটাব নির্বাচনে বেশকিছু অনিয়ম সামনে এনে এফবিসিসিআই ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করেছেন এক সাধারণ ভোটার।
আটাবের সাধারণ সদস্যরা বলছেন, এয়ার টিকিট সিন্ডিকেটকারী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় কর্তৃক লাইসেন্স বাতিলকৃত ট্রাভেল এজেন্সি এবং একটি প্রভাবশালী জিএসএ কোম্পানি আটাবকে সম্পূর্ণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার জন্য জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছে। তারা বেলায়েত হোসেন ভূঁইয়া নামের মৃত এক ব্যবসায়ীকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। তিনি আফরো ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের মালিক। অভিযোগ উঠেছে, এই সিন্ডিকেট চক্র তাদের মনোনীত প্যানেলকে যেকোনো মূল্যে বিজয়ী করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিয়োজিত প্রশাসক এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্মকর্তাদের অনৈতিকভাবে প্রভাবিত করেছে। এই প্রভাব খাটিয়েই আইনবহির্ভূতভাবে চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় ব্যাপক রদবদল ও জালিয়াতি করা হয়েছে।
সূত্রগুলো বলছে, নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মচারীদের নিয়ে গঠিত ‘সহায়ক-সহযোগী কমিটি’র বিরুদ্ধে। এই সহায়ক কমিটির সদস্যরা সিন্ডিকেটপন্থি এজেন্সিপক্ষের প্রার্থীদের বাসায় নিয়মিত যাতায়াত করছেন। তাদের মধ্যে ব্যক্তিগত মোবাইল কল ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বজায় রাখার প্রমাণ মিলেছে। এই গোপন যোগাযোগের মাধ্যমে নির্বাচনের অত্যন্ত স্পর্শকাতর নথিপত্র ও অভ্যন্তরীণ গোপন তথ্যাদি সিন্ডিকেট প্রার্থীদের কাছে আদান-প্রদান করা হচ্ছে। যা একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিপন্থি। এই সামগ্রিক অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার প্রতিকার চেয়ে ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) বিজ্ঞ আরবিট্রেশন ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দিয়েছেন আটাবের একজন বৈধ সদস্য। তার নাম- মাহমুদুল আলম সিদ্দিকী। তিনি আয়ানা ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী। ভোটার নং-১১০৮।
মামলার অভিযোগে তিনি বলেছেন, মেয়াদোত্তীর্ণ প্রশাসকের ‘অবৈধ’ বোর্ড বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিযুক্ত প্রশাসক ড. সাইফ উদ্দিন আহম্মেদের মেয়াদ গত ২৫শে ফেব্রুয়ারি শেষ হলেও, তিনি পদে না থাকা অবস্থায় গত ৮ই মার্চ সম্পূর্ণ এখতিয়ার বহির্ভূতভাবে নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যান পরিবর্তন করে সুফিয়া আক্তার রুমিকে দায়িত্ব দেন। তার দাবি, এই বোর্ড সম্পূর্ণ বেআইনি। মেগা ইন্টারন্যাশনাল এয়ার সার্ভিস, হাসেম এয়ার ইন্টারন্যাশনাল, কাজী এয়ার ইন্টারন্যাশনালসহ মোট ৮টি ট্রাভেল এজেন্সির লাইসেন্স সরকার বাতিল করার পর তাদের আটাব সদস্যপদ বাতিল করা হলেও তাদের ভোটার তালিকায় রাখা হয়েছে। এ ছাড়াও কিছু এজেন্সির লাইসেন্স নবায়ন হয়নি তাদেরকে ভোটার ও প্রার্থী করা হয়েছে। ‘ইউসুফ অ্যান্ড ইউনুস ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল’-এর কর্মচারীর ছবি ব্যবহার করে ভিন্ন ব্যক্তির নামে ভোটার করা হয়েছে। এ ছাড়া ‘এস মির্জা গাজী ট্রাভেলস’-এর বিপরীতে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে দু’টি পৃথক ভোটার নম্বর (২১ ও ৪০৬) বরাদ্দ করা হয়েছে। বৈধদের বাদ দিয়ে নতুনদের অন্তর্ভুক্তি বিধি লঙ্ঘন করে নির্বাচনের ১২০ দিন আগের নিয়ম অমান্য করে অবৈধভাবে প্রশাসক ও নির্বাচন বোর্ড প্রভাবিত হয়ে নতুন ৯ জন সদস্যকে ভোটার করা হয়েছে। এ ছাড়া অসংখ্য ট্রাভেল এজেন্সিকে বৈধ সদস্যকে তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে।
একদিকে ভোটার তালিকার এই নজিরবিহীন কারচুপির অন্যদিকে গত ২৫শে জুন নির্বাচনী বোর্ডের এক অফিস আদেশে ৪ জন শীর্ষ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। তারা হলেন- সভাপতি পদপ্রার্থী আবদুস সালাম আরেফ ও আফসিয়া জান্নাত সালেহ, চট্টগ্রাম অঞ্চলের সহ-সভাপতি পদপ্রার্থী আলহাজ মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়া এবং সিলেট অঞ্চলের সহ-সভাপতি পদপ্রার্থী মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান খান রেজওয়ান। বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা ২০২৫-এর ‘টানা দুই মেয়াদ’ সংক্রান্ত বিধির মনগড়া স্বার্থান্বেষী ব্যাখ্যা দিয়ে এই হেভিওয়েট প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র অন্যায়ভাবে বাতিল করা হয়েছে বলে ভুক্তভোগীরা বলছেন। অভিযোগ উঠেছে এই প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিলের পেছনে অনৈতিক আশ্রয়া নেয়া হয়েছে। নির্বাচনী আপিল বোর্ড ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে যৌথভাবে আপিল করেছেন প্রার্থীরা। তাদের আইনজীবী ব্যারিস্টার মো. রুহুল আমিন জানিয়েছেন, সরকারি আদেশে আগের কমিটির মেয়াদের মাঝপথেই ভেঙে দিয়ে প্রশাসক নিয়োগ করায় প্রার্থীরা পূর্ণ মেয়াদ সম্পন্ন করতে পারেননি। বাণিজ্য সংগঠন ২০২৫ বিধিমালায় একটি কমিটির মেয়াদ ২৪ মাস নির্ধারণ করা আছে, তাদের কারও মেয়াদ ২৪ মাস হয়নি বা তাদের কমিটির মেয়াদ শেষ হয় নাই। তাই এই নিষেধাজ্ঞা তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
আটাবের সাধারণ সদস্যদের মতে, মৃত ব্যক্তিকে ভোটার বানানো, লাইসেন্স বাতিল হওয়া সিন্ডিকেট চক্রের হস্তক্ষেপ এবং সরকারি কর্মচারীদের সঙ্গে গোপন আঁতাত ও তথ্য ফাঁসের ঘটনা ভোটার তালিকা থেকে অর্ধেকেরও বেশি ভোটারকে বাদ দেয়া ও অবৈধ ভোটারের অন্তর্ভুক্তি সংগঠনের ৫০ বছরের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তাই এভিয়েশন ও পর্যটন খাতের এই ঐতিহ্যবাহী সংগঠনের ভাবমূর্তি রক্ষায় এফবিসিসিআই ট্রাইব্যুনাল ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জরুরি ও কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন সাধারণ ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসায়ীরা। রিকাব ইন্টারন্যাশনালের গোলাম আজম আটাব নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যানের বরাবর প্রার্থীদের তথ্য ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করার কথা উল্লেখ করে চিঠিতে লিখেছেন, অনেক প্রার্থীদের পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট ভেরিফাইড নয়।
আয়ানা ইন্টারন্যাশনালের মাহমুদুল আলম সিদ্দকী নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যানকে দেয়া চিঠিতে বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা, ২০২৫ এর বিধি ৩ লঙ্ঘন করায় ২৬ জন অযোগ্য অবৈধ ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দেয়ার আবেদন করেছেন। ওই ২৬ জনের ভোটার নং- (১৩৫৩, ১৩৫৫, ১৩৫৬, ১৩৫৭, ১৩৫৮, ১৩৭৩, ১৩৭৪, ১৩৭৫, ১৩৭৬, ১৩৭৭, ১৩৬৫, ১৩৬৭, ১৩৬৮, ১৩৬৯, ১৩৭০, ১৩৫৯, ১৩৬০, ১৩৬১, ১৩৬২, ১৩৬৩, ১৩৬৪, ১৩৪৭, ১৩৪৮, ১৩৪৯, ১৩৫০, ১৩৫১) এই ভোটাররা আটাবের সদস্যপদ গ্রহণ করেছেন নির্বাচনের তারিখের ১৮০ দিনের মধ্যে। বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা, ২০২৫ এর বিধি ৩ এ উল্লেখ রয়েছে যে “এই বিধিমালা কার্যকর হওয়ার পর প্রথম নির্বাচনের ক্ষেত্রে, নির্বাচনের তারিখের পূর্ববর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে যারা নতুন সদস্য হয়েছেন অথবা নির্বাচনের তারিখের পূর্ববর্তী ১২০ (একশত বিশ) তম দিন পর্যন্ত সংগঠনের প্রাপ্য চাঁদা বকেয়া রয়েছে, তারা কোনোভাবেই উক্ত নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রাপ্ত হবেন না। এ ধারা মতে উপরোক্ত ভোটারবৃন্দের চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্তি সঠিক বা বৈধ নয়। কিন্তু সিন্ডিকেট চক্র তাদেরকে চূড়ান্ত তালিকায় রেখেছে। এ ছাড়াও আরও অনেক ভোটারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে তালিকা থেকে বাদ দেয়ার আবেদন করেছেন সাধারণ ভোটাররা।
আটাব প্রশাসক ড. সাইফ উদ্দিন আহম্মদ মানবজমিনকে বলেন, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করার জন্য আমরা নির্বাচন বোর্ড ও আপিল বোর্ড করে দিয়েছি। এখানে অস্বচ্ছ কোনো কার্যক্রম হওয়ার সুযোগ নাই। অভিযোগ যে কেউ যেকোনো বিষয়ে অভিযোগ দিতে পারে। কিন্তু সত্যতা থাকতে হবে। এফবিসিসিআই ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দেয়া হয়েছে। সেখান থেকে কী রায় আসে সেটা দেখতে হবে। এমনকি তারা উচ্চ আদালতে যেতে পারবে।
