ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত ও নজিরবিহীন এক ঘটনার সাক্ষী হলো ২০২৬ বিশ্বকাপ। খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি হস্তক্ষেপে বাতিল হয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র দলের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ড ও এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা! ফিফার এই নজিরবিহীন ‘ইউ-টার্ন’ এবং বেলজিয়ামের করা আপিলকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে উড়িয়ে দেয়ার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা। ফুটবল বিশেষজ্ঞ ও সাবেক কর্তাদের মতে, ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থাকে সম্পূর্ণ ‘রাজনৈতিকীকরণ’ ও ‘আমেরিকানীকরণ’ করার মাধ্যমে এক বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো ফিফা।
ঘটনার সূত্রপাত শেষ ৩২-এর ম্যাচে। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার তারিক মুহারেমোভিচের গোড়ালিতে মারাত্মক ফাউল করায় স্ট্রাইকার বালোগানকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান ব্রাজিলের অভিজ্ঞ রেফারি রাফায়েল ক্লস। নিয়ম অনুযায়ী, বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ ১৬-র বাঁচা-মরার ম্যাচে তার নিষিদ্ধ থাকার কথা ছিল।
কিন্তু ট্রাম্পের এক ফোন কলেই বদলে যায় দৃশ্যপট। ৪-১ গোলে হেরে যাওয়া ম্যাচের ঠিক আগের রাতে নাটকীয়ভাবে বালোগানের লাল কার্ড স্থগিত করে ফিফা। ফলে বেলজিয়ামের বিপক্ষে মরিসিও পচেত্তিনোর শুরুর একাদশেই মাঠে নামেন এই ফরোয়ার্ড।
এই ঘটনাকে ট্রাম্পের রাজনৈতিক এজেন্ডার নগ্ন বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন ক্রীড়া বিশ্লেষকেরা। এমলিওন বিজনেস স্কুলের স্পোর্টস প্রফেসর সাইমন চ্যাডউইক আল জাজিরাকে বলেন, “ট্রাম্পের ‘মাগা’(মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন) এজেন্ডা এখন পুরো বিশ্বের সামনে প্রদর্শিত হচ্ছে, আর তার সঙ্গে উন্মোচিত হয়েছে ইনফান্তিনো ও ফিফার রাজস্বের লোভ। টুর্নামেন্টের মাঝপথে কোনো আলোচনা ছাড়াই একজন বিশৃঙ্খলাপ্রিয় রাজনীতিকের প্রভাবে নিয়ম বদলে ফেলা অত্যন্ত বিপজ্জনক নজির সৃষ্টি করলো।”
চাপের মুখে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো সোমবার এক বিবৃতিতে দাবি করেন যে, তাদের জুডিশিয়াল কমিটি সম্পূর্ণ স্বাধীন। তবে ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপের কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আমাকে ফোন করেছিলেন। আমি তাকে বুঝিয়েছি যে, ফিফার একটি স্বাধীন আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে। আমি সবসময় সেই প্রক্রিয়ার স্বায়ত্তশাসনকে শ্রদ্ধা করি।’
অথচ ট্রাম্প খোদ রেফারি রাফায়েল ক্লসের অতীত নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাকে ‘সন্দেহজনক’ বলে মন্তব্য করেন। যদিও ফিফা ও রেফারি প্রধান পিয়েরলুইজি কলিনা রেফারি ক্লসের পাশে দাঁড়িয়ে তাকে বিশ্বসেরা ও সৎ ম্যাচ অফিশিয়াল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
ফিফার এই মেরুদণ্ডহীন সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন খোদ সংস্থার সাবেক বিতর্কিত সভাপতি সেপ ব্ল্যাটার। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ তিনি লিখেছেন, ‘রাজনৈতিক ফোন কলে কখনো লাল কার্ড বাতিল হয় না। এটি হয় নিয়ম, প্রমাণ এবং স্বাধীন সংস্থার মাধ্যমে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট হস্তক্ষেপ করলেন আর নক-আউট ম্যাচের আগে একজন খেলোয়াড় ছাড় পেয়ে গেলেন! ফুটবলকে কখনোই রাজনৈতিক ক্ষমতার খেলার মাঠ বানানো যাবে না।’
এই সিদ্ধান্তের পর অন্যান্য দেশের কোচদের মাঝেও ক্ষোভ ও উপহাসের ঝড় বয়ে যাচ্ছে। মেক্সিকোর বিপক্ষে ম্যাচে ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডার জ্যারেড কোয়ানসাহ লাল কার্ড দেখার পর ইংলিশ কোচ থমাস টুখেল ক্ষোভ প্রকাশ করে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘এখন কে এই সিদ্ধান্ত বাতিল করবে, কখন করবে আর কোন ভিত্তিতে করবে? এটা কতদূর পর্যন্ত যাবে? পুরো বিষয়টা আমার কাছে ভীষণ অদ্ভুত লাগছে।’ মাঠের ফুটবল ছাপিয়ে ট্রাম্পের এই ‘পলিটিক্যাল মাইন্ড গেম’ এখন ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় কালো দাগ হয়ে রইলো।
