তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, দেশের রাজনীতিকে যদি অর্থনীতি-বান্ধব কাঠামোর মধ্যে আনা না যায়, তবে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও বাণিজ্যের উন্নয়ন সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ আলোচনা শেষ পর্যন্ত কেবল তাত্ত্বিক তর্কে সীমাবদ্ধ থাকবে। যেকোনো তাত্ত্বিক আলোচনাকে জনগণের কল্যাণে রূপান্তর করতে হলে একটি রাজনৈতিক শক্তির কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজন। তবে অবশ্যই রপ্তানিকে অগ্রাধিকার দিয়ে অর্থনীতিকে সাজাতে হবে।
সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট’ (র্যাপিড) আয়োজিত ‘এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন অ্যান্ড ট্রেড কমপিটিটিভনেস’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, জাতিসংঘের সিডিপি এলডিসি উত্তরণ পেছানোর সুপারিশ করেছে। এখন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এটা আবার অনুমোদন করতে হবে। যেহেতু এখন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি বাংলাদেশ থাকবে, অতএব ধরে নিতে পারি যে এই শর্তটা তেমন একটা বাধা হবে না।
জহির উদ্দিন স্বপন আরও বলেন, ‘আমরা ধরে নিতে পারি যে আমাদের চাহিদা অনুযায়ী আমরা তিন বছর একটা বর্ধিত সময় পাব। কিন্তু এই তিন বছরকে আমরা কী কাজে লাগাব এবং কোথায় কোথায় কাজে লাগানো উচিত, কোথায় কোথায় কাজে লাগালে প্রকৃত অর্থেই আমাদের রপ্তানির ক্ষমতা, সক্ষমতা বাড়বে সেই বিষয়গুলো এখন আমাদের গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।’
তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এলডিসি উত্তরণের পর দেশের সামনে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যে চ্যালেঞ্জগুলো আসবে, তা কমবে না; বরং বাড়বে। সরকার ইতিমধ্যেই জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট কমিটির কাছে এই উত্তরণের সময়সীমা ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত পিছিয়ে নেয়ার যে অনুরোধ জানিয়েছে, যার মূল লক্ষ্যই হলো এই বর্ধিত সময়কে নিজেদের প্রস্তুতি ও সক্ষমতা বাড়ানোর কাজে ব্যবহার করা।’
তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার অর্থনীতি-বান্ধব রাজনীতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। যুক্তরাজ্য বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে আমাদের বাণিজ্য চ্যালেঞ্জ হয়তো কম, কিন্তু অন্যান্য রফতানি গন্তব্যে আমাদের বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এই বর্ধিত তিন বছরের মধ্যে আমাদের নীতি সংস্কার, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন এবং রফতানি প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি করতে একটি সমন্বিত রোডম্যাপ বা পথনকশা তৈরি করতে হবে।’
জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, জাতিসংঘের পক্ষ থেকে প্রস্তুতকৃত স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি’র ১৫৭টি পদক্ষেপের মধ্যে আমাদের অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপটে কতটুকু বাস্তবায়ন করা সম্ভব এবং রফতানি সক্ষমতা বাড়াতে দেশের মানবসম্পদকে কীভাবে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে দক্ষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো যায়, তা নিয়ে কাজ করতে হবে।
জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত গণতান্ত্রিক পরিবেশের কথা স্মরণ করে মন্ত্রী বলেন, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত এই সরকারের মূল লক্ষ্যই হলো জনগণের কল্যাণে রাজনীতির অবকাঠামোগত সংস্কার ও মেরামত করা। র্যাপিডের এই কর্মশালার গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ ও মতামতসমূহ সরকারের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাস দেন তথ্যমন্ত্রী।
র্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. এম এ রাজ্জাকের সভাপতিত্বে কর্মশালায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সভাপতি দৌলত আক্তার মালা এবং র্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এম আবু ইউসুফ। কর্মশালায় বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিক ও অর্থনীতি বিশ্লেষকরা অংশগ্রহণ করেন।
র্যাপিড চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক বলেন, দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধরনের ভাটা অর্থাৎ নেতিবাচক প্রবণতা তৈরি হয়েছে। গত চার বছরে দেশের রপ্তানি আয় কোনোভাবেই বাড়েনি, বরং আগের তুলনায় কমেছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের গতি ও প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ রপ্তানিতে অনেক পিছিয়ে পড়ছে।
এম এ রাজ্জাক বলেন, ‘বাংলাদেশের রপ্তানি খাত এখন একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে এবং আমরা কতগুলো গভীর চ্যালেঞ্জ দেখতে পাচ্ছি। এর একটি বড় উদাহরণ হলো, গত চার বছরে আমাদের রপ্তানি একই জায়গায় আটকে আছে। অথচ আমাদের প্রতিযোগী দেশ কম্বোডিয়াসহ অন্যান্য দেশ এই সময়ে তাদের রপ্তানি যথেষ্ট পরিমাণে বাড়াতে পেরেছে।’
র্যাপিড চেয়ারম্যান বলেন, বাংলাদেশের প্রধান বাজার—ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাষ্ট্রে খুব দ্রুত আইনকানুন পরিবর্তন হচ্ছে। বিশেষ করে ইউরোপের বাজারে প্রতিযোগী দেশগুলো মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) সুবিধা নিচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ মারাত্মক প্রতিযোগিতার সক্ষমতার চাপের মধ্যে পড়েছে।
এম এ রাজ্জাক বলেন, এলডিসি উত্তরণের আগেই রপ্তানি সক্ষমতার ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। উত্তরণ হলে এই চাপ আরও বাড়তে পারে। ফলে ভবিষ্যতে রপ্তানি আরও দ্রুতগতিতে বাড়াতে হবে এবং রপ্তানি সক্ষমতাকে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি (এসটিএস) করেছিল। কিন্তু সেখানে যেসব সংস্কার ও কাজের কথা বলা হয়েছিল, সেগুলোতে গতি আনা সম্ভব হয়নি বলে জানান এম এ রাজ্জাক। তিনি বলেন, জাতিসংঘের সিডিপি (কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি) বাংলাদেশকে এলডিসি উত্তরণে অতিরিক্ত সময় দেওয়ার কথা বললেও শর্ত দিয়েছে যে এই সময়টা নির্ভর করবে বাংলাদেশ সংস্কার করতে পারছে কি না তার ওপর। এসটিএসের কার্যকর বাস্তবায়ন না হলে অতিরিক্ত সময় পাওয়া যাবে না।
নতুন রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে এম এ রাজ্জাক বলেন, ‘বিদেশি বিনিয়োগ এনে রপ্তানি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করতে পারলে সবচেয়ে ভালো হবে। যারা এখন রপ্তানিমুখী বিনিয়োগে আগ্রহী, তাদের অগ্রাধিকার দিয়ে ক্ষেত্র তৈরি করে দিতে হবে।’
বাজারের প্রবেশাধিকার প্রসঙ্গে এম এ রাজ্জাক বলেন, এলডিসি উত্তরণ মানেই শুল্কমুক্ত সুবিধা বা বাণিজ্য সুবিধা শেষ হয়ে যাওয়া নয়। উত্তরণের পরেও মুক্ত বাণিজ্যের মাধ্যমে বা অন্য দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় দেনদরবার করে সুবিধা নেয়া সম্ভব।
ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার বলেন, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বলেন যে বাইরে থেকে বাংলাদেশে করের হার কম মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তাদের অনেক বেশি কর দিতে হয়, যা কার্যকর করহার। হয়তো কাগজে-কলমে করের হার ২৫ বা ২৭ শতাংশ, কিন্তু সব মিলিয়ে কার্যকর করের হার গিয়ে দাঁড়ায় ৫৫ শতাংশে। এই জায়গায় কাজ করতে হবে।
