খেলার অনুমতি পেলেন লালকার্ডধারী ফোলারিন বালোগান

ট্রাম্পের হস্তক্ষেপে বিশ্বকাপে তুমুল বিতর্ক

খেলার অনুমতি পেলেন লালকার্ডধারী ফোলারিন বালোগান

ফন্ট সাইজ:

যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বকাপ অভিযান রোববার নাটকীয় মোড় নিয়েছে। এদিন ফিফা নজিরবিহীন এক সিদ্ধান্তে ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগানের স্বয়ংক্রিয় এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করে। তাকে আগামীকাল বাংলাদেশ সময় সকালে শেষ ষোলোর ম্যাচে বেলজিয়ামের বিপক্ষে খেলার অনুমতি দিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত আসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে ফিফা সভাপতি গিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানানোর পর। এ সিদ্ধান্তের ফলে ফিফার শৃঙ্খলাবিষয়ক প্রক্রিয়া বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। বেলজিয়াম তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে এবং টুর্নামেন্টের অন্যতম বড় বিতর্কে পরিণত হয় বিষয়টি। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে মাঠের কৌশল বা দল নির্বাচন নয়, বরং ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও রাজনৈতিক ক্ষমতার সম্পর্ক। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

সিদ্ধান্ত ঘোষণার কয়েক মিনিটের মধ্যেই এটি বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটিতে পরিণত হয়। বিভিন্ন ক্রীড়া সংবাদ, টকশো, বিশ্লেষক, ধারাভাষ্যকার ও সাবেক ফুটবলারদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়- ফিফা কি ন্যায়বিচার করেছে, নাকি নিজেদের নিয়মই দুর্বল করে দিয়েছে। সিদ্ধান্তটি কী পরিস্থিতিতে নেয়া হয়েছে এবং ট্রাম্প ও ইনফান্তিনোর মধ্যে হওয়া ফোনালাপের বিষয়ে রয়টার্স একাধিকবার মন্তব্য জানতে চাইলেও ফিফা কোনো জবাব দেয়নি।

বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ২-০ গোলের জয়ে বিশ্বকাপে নিজের তৃতীয় গোল করেন বালোগান। তবে দ্বিতীয়ার্ধে তারেক মুহারেমোভিচের গোড়ালিতে বুটের স্টাড লাগানোর কারণে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) পর্যালোচনার পর তাকে লাল কার্ড দেখানো হয়। ২৫ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকারকে মাঠ থেকে বহিষ্কার করা হলে যুক্তরাষ্ট্রের কোচ মাউরিসিও পোচেত্তিনো বলেন, এটি কখনোই লাল কার্ড পাওয়ার মতো অপরাধ ছিল না।
ফোনালাপ সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র জানিয়েছেন, ইনফান্তিনোকে ফোন করে ঘটনাটি পুনর্বিবেচনার জন্য ফিফাকে অনুরোধ করেন ট্রাম্প। তবে ফিফা লাল কার্ডটি বাতিল না করেই বালোগানকে খেলার অনুমতি দিয়েছে। ফিফা এক বিবৃতিতে বলেছে, ফিফা ডিসিপ্লিনারি কোডের ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ম্যাচ নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা এক বছরের পরীক্ষামূলক সময়ের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এই পরীক্ষামূলক সময়ের মধ্যে ফোলারিন বালোগান একই ধরনের ও সমান মাত্রার আরেকটি অপরাধ করলে স্থগিতাদেশ বাতিল হবে এবং আগের শাস্তি কার্যকর করা হবে। পাশাপাশি নতুন অপরাধের জন্য আরোপিত অতিরিক্ত শাস্তিও বহাল থাকবে। ফিফার বিচারিক সংস্থার পূর্ণ বা আংশিকভাবে কোনো শাস্তির কার্যকারিতা স্থগিত রাখার ক্ষমতা রয়েছে।

‘একটি বড় অন্যায়ের সংশোধন’
ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, সঠিক কাজটি করার জন্য এবং একটি বড় অন্যায়ের সংশোধন করার জন্য ফিফাকে ধন্যবাদ। অন্যদিকে হোয়াইট হাউস এক্সে পোস্ট করে লিখেছে, ‘ইউএসএ-ইউএসএ-ইউএসএ।’ যুক্তরাষ্ট্র ফুটবল ফেডারেশন ফিফার সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছে। বালোগানের সতীর্থরা জানান, সোমবার সিয়াটলে অনুশীলনে যাওয়ার পথে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকেই তারা প্রথম খবরটি জানতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিচ সাংবাদিকদের বলেন, এখানে আসার পথেই খবরটি জানতে পারি। প্রথমে মনে হয়েছিল, সত্যিই? এটা কি সত্যি? তারপর মনে হলো, দারুণ খবর। রোববার সন্ধ্যায় সিয়াটলে সংবাদ সম্মেলনে পোচেত্তিনোও সিদ্ধান্তটিকে স্বাগত জানান। তিনি বলেন, আমার মনে হয় ফুটবল জগতের ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষই বলেছেন এটি অন্যায্য শাস্তি ছিল। অতীতেও এমন উদাহরণ রয়েছে, যেখানে শাস্তি পরে কার্যকর করার জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে। তাই মানুষ কেন অবাক হচ্ছে, আমি বুঝতে পারছি না। তিনি আরও বলেন, অতীতেও এমন হয়েছে। শুধু আমাদের ক্ষেত্রেই এমন কিছু হয়নি। এই বিশ্বকাপেই আমরা দেখেছি, অনেক খেলোয়াড়কে একইভাবে শাস্তি দেয়া হয়নি। তাই আমি খুশি। কারণ এই শাস্তি কার্যকর হলে তা অন্যায্য হতো।

সিদ্ধান্তে বিস্মিত বেলজিয়াম
বেলজিয়ামের রয়েল বেলজিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (আরবিএফএ) এক বিবৃতিতে বলেছে, বালোগানকে খেলার অনুমতি দেয়ার সিদ্ধান্তে তারা বিস্মিত। তারা ফিফার নিয়মপুস্তক পর্যালোচনা করছে এবং সম্ভাব্য সব ধরনের পদক্ষেপ বিবেচনা করছে। আরবিএফএ বলেছে, ফিফা তাদের সিদ্ধান্তের ভিত্তি হিসেবে ডিসিপ্লিনারি কোডের ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদের কথা বলেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ফিফা ডিসিপ্লিনারি কমিটি পূর্বে দেয়া কোনো শাস্তির কার্যকারিতা স্থগিত রাখতে পারে। তবে সংস্থাটি আরও বলেছে, একই ডিসিপ্লিনারি কোডের ৬৬.৪ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, লাল কার্ড দেখলে পরবর্তী ম্যাচে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে। এই বিশ্বকাপে এর আগে সব লাল কার্ডের ক্ষেত্রেই সেই নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে। তাদের দাবি, এই সিদ্ধান্ত বিশ্বকাপের প্রতিযোগিতা বিধিমালার সঙ্গেও সরাসরি সাংঘর্ষিক।

আরবিএফএ আরও বলেছে, ১০.৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- কোনো খেলোয়াড় বা দলের কর্মকর্তা সরাসরি অথবা দ্বিতীয় হলুদ কার্ডের মাধ্যমে লাল কার্ড পেলে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দলের পরবর্তী ম্যাচে নিষিদ্ধ থাকবেন।

গত বছর আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের শেষের আগের ম্যাচে লাল কার্ড দেখার পর তিন ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা পেয়েছিলেন পর্তুগালের অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। পরে ফিফা সেই নিষেধাজ্ঞার শেষ দুই ম্যাচের শাস্তি স্থগিত করায় তিনি বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচগুলোতে খেলতে পেরেছিলেন। অন্যদিকে কাতারের মিডফিল্ডার আসিম মাদিবো গ্রুপ পর্বে কানাডার মিডফিল্ডার ইসমাইল কোনেকে গুরুতর চোট দেয়ার মতো ট্যাকলের জন্য লাল কার্ড দেখেন এবং পরে পাঁচ ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা পান। ফলে যুক্তরাষ্ট্র-বেলজিয়াম ম্যাচটি এখন এমন এক বিতর্কের ছায়ায় অনুষ্ঠিত হবে, যা ইতিমধ্যেই এই বিশ্বকাপের অন্যতম সংজ্ঞায়িত বিতর্কে পরিণত হয়েছে। আর ফিফার ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক যে শেষ বাঁশি বাজার পরও থামবে না, তা প্রায় নিশ্চিত।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন