যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল মলে শনিবার নির্বাচনী প্রচারণার আদলে ভাষণ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। ভাষণে তিনি নতুন ভোটসংক্রান্ত বিধিনিষেধ আরোপের আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন। দেশে ‘কমিউনিস্টদের’ উত্থানের আশঙ্কার কথা বলেন এবং নিজের প্রশাসনের বিভিন্ন সাফল্যের দাবি তুলে ধরেন। বৈরী আবহাওয়ার কারণে প্রায় দুই ঘণ্টা বিলম্বের পর ট্রাম্প ন্যাশনাল মলে ভাষণ দেন। তার বক্তব্যে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি দেশপ্রেমের আহ্বান ছিল, তেমনি দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন মতাদর্শগত হুমকি নিয়েও তীব্র সমালোচনা ছিল। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ঐতিহাসিক অর্জনের প্রশংসা করেন। এর মধ্যে যুদ্ধজয়, চাঁদে মানুষের অবতরণ, রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের প্রথম উড্ডয়ন এবং মার্কিন শাসনব্যবস্থার সাফল্যের কথা উল্লেখ করেন। তবে একই সঙ্গে তিনি কংগ্রেসের প্রতি আহ্বান জানান, যাতে ডাকযোগে ভোট দেয়ার সুযোগ সীমিত করা এবং ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের জন্য নাগরিকত্বের প্রমাণ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবিত আইন পাস করা হয়। এ ছাড়া তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক শক্তিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে এবং দেশে কমিউনিজমের বিস্তার ঠেকানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন। ট্রাম্প বলেন, আমরা এ ধরনের হুমকি শুরু হওয়ার আগেই থামিয়ে দিতে চাই। এটি ক্যানসারের মতো। এটিকে কেটে ফেলতে হবে, আর খুব দ্রুত কেটে ফেলতে হবে।
অতীতে ট্রাম্প ডেমোক্রেটিক পার্টির বামপন্থী অনেক প্রার্থীকে বারবার ‘কমিউনিস্ট’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে শনিবারের ভাষণে তিনি নির্দিষ্টভাবে কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেননি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টরা সাধারণত ৪ঠা জুলাইয়ের স্বাধীনতা দিবসের আনুষ্ঠানিক আয়োজনে সরাসরি রাজনৈতিক ভাষণ দেয়া এড়িয়ে চলেন। তবে ট্রাম্প সরকারি অনুষ্ঠান ও নির্বাচনী প্রচারণার মধ্যকার সেই প্রচলিত সীমারেখা বারবার ভেঙেছেন। ২০১৯ সালে দেয়া তার একটি ভাষণ ছাড়া ১৯৫১ সালের পর এই প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ন্যাশনাল মলে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ভাষণ দিলেন।
অনুষ্ঠানে প্রবেশের জন্য দর্শকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার পাশাপাশি তাদের ১০৩ ডিগ্রি ফারেনহাইট (প্রায় ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস) তাপমাত্রাও সহ্য করতে হয়েছে। রেকর্ড তাপপ্রবাহের কারণে ওয়াশিংটনের আশপাশে কয়েকটি শোভাযাত্রা ও অন্যান্য অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়। পরে বজ্রঝড়ের আশঙ্কায় কর্তৃপক্ষ অনুষ্ঠানস্থল খালি করার নির্দেশ দেয়। দর্শনার্থীরা কাছাকাছি জাদুঘর ও সরকারি ভবনে আশ্রয় নেয়ার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার অনুষ্ঠানে ফিরতে পারেন। ট্রাম্প এর আগে বলেন, তিনি ‘প্রমাণ করার জন্য যে আমি সবকিছুই করতে পারি’, এদিন ‘খুব দীর্ঘ একটি ভাষণ’ দেবেন। তবে শেষ পর্যন্ত তার বক্তব্য ৪০ মিনিটেরও কম স্থায়ী হয়, যা তার আগের অনেক ভাষণের তুলনায় অনেক ছোট।
অনুষ্ঠানে প্যাট্রিয়ট ফ্রন্ট নামের একটি শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী সংগঠনের সদস্যদেরও দেখা যায়। এর আগে তারা ওয়াশিংটনে মিছিল করে এবং পরে মেট্রো ট্রেনে করে অনুষ্ঠানস্থলে যায়। পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় কোনো সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি। ট্রাম্প প্রশাসনের ফ্রিডম ২৫০ কর্মসূচি ২০১৬ সালে গঠিত নির্দলীয় ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন কমিটির ভূমিকা কার্যত সীমিত করে দিয়েছে। এই কর্মসূচির আওতায় প্রায় ১ দশমিক ৫ মাইলজুড়ে ন্যাশনাল মল এলাকায় ‘গ্রেট আমেরিকান স্টেট ফেয়ার’ আয়োজন করা হয়েছে। এখানে নাগরদোলা (ফেরিস হুইল), বিভিন্ন রক্ষণশীল সংগঠন এবং প্রতিরক্ষা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের প্রদর্শনী রয়েছে। ফ্রিডম ২৫০-এর ভাষ্য, এই আয়োজনের উদ্দেশ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রকে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ দেশ হিসেবে গড়ে তোলা মানুষ ও উদ্ভাবনগুলোকে তুলে ধরা।
তবে ডেমোক্রেটিক পার্টি-শাসিত কয়েকটি অঙ্গরাজ্য এতে কোনো প্রতিনিধিদল পাঠায়নি। নির্ধারিত অনেক শিল্পীও অনুষ্ঠান থেকে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, আয়োজনটি অতিরিক্ত রাজনৈতিক হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সামনে রেখে ট্রাম্প ওয়াশিংটনের বিভিন্ন স্থাপনা সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছেন। অনেক ফোয়ারা ও ভাস্কর্য সংস্কার করা হলেও লিংকন মেমোরিয়ালের রিফ্লেক্টিং পুল সংস্কারের ১ কোটি ৫০ লাখ ডলারের প্রকল্প নানা সমস্যায় পড়েছে। বর্তমানে সেখানে নিরাপত্তাকর্মী ও নজরদারি ক্যামেরা থাকলেও পুলটির রং উঠে যাওয়া দেয়াল এবং শ্যাওলায় ভরা পানির সমস্যা এখনো রয়ে গেছে।
এদিকে রয়টার্স/ইপসোস-এর এক জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর উদযাপন অতিরিক্ত রাজনৈতিক হয়ে উঠেছে। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ডেমোক্রেট এবং অর্ধেক রিপাবলিকানও একই মত দিয়েছেন।
