ফুটবলে এক নতুন ইতিহাস তৈরি হয়ে গেল। মায়ামি স্টেডিয়ামে রোমাঞ্চকর যুদ্ধের সাক্ষী হলো ফুটবল দুনিয়া। অঘটন নয়, বাস্তব। ফুটবলের এক পরাশক্তিকে যেভাবে নাস্তানাবুদ করে ছাড়লো তা রীতিমতো চাঞ্চল্যকর, অনেকটাই নজীরবিহীন। বিশ্ব ফুটবল মানচিত্রে যাদের কোনো অস্তিত্বই ছিল না তারা কিনা কাঁপিয়ে দিলো আর্জেন্টিনাকে! মেসি জিতলেন বটে, কিন্তু রেখে গেলেন অনেক প্রশ্ন। বিশ্ব মিডিয়া তাই বলছে। আর্জেন্টিনা-কেপ ভার্দের লড়াই কেবলমাত্র রূপকথার সঙ্গেই তুলনা করা যায়। খেলার একদিন আগেই লিখেছিলাম, এমন এক লড়াই হতে যাচ্ছে যা ডেভিড বনাম গোলিয়াথ বা রূপকথার গল্পকেও হার মানাবে। বাস্তবে হলোও তাই। একদিকে তিনবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন, ফুটবলের অবিসংবাদিত পরাশক্তি আর্জেন্টিনা। আর অন্যদিকে আটলান্টিক মহাসাগরের ছোট্ট এক দ্বীপরাষ্ট্র। যারা এই প্রথম বিশ্বকাপের মূলমঞ্চে পা রেখে ইতিহাস গড়েছে। স্পষ্ট করেই লিখেছিলাম, এটি শুধু ফুটবল ম্যাচ নয়। এটি হবে অভিজ্ঞতা আর নতুন স্বপ্নের রোমাঞ্চকর সংঘাত, মহাকাব্যিক লড়াই। অনেকেই ভেবেছিলেন, পুঁচকে কেপ ভার্দে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতায়ই আসতে পারবে না। মাত্র পাঁচ লাখ ৩০ হাজার মানুষের এই দ্বীপরাষ্ট্রটি ফুটবলে যে এতোটা এগিয়েছে- তা কল্পনাতীত। সম্ভবত মেসিও এ খবর রাখতেন না। আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে অনেকবারই এই ব্লু শার্করা ঝড় তুলেছে। শনিবারের খেলায় দু’বার পেছন থেকে তারা আর্জেন্টিনার সঙ্গে যেভাবে লড়াই করলো-তা রোমাঞ্চকর, অবিশ্বাস্য।
বিবিসি’র স্প্যানিশ ফুটবল রাইটার এলিজাবেথ কন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেছেন, কেপ ভার্দের লড়াই দেখে তিনি তাদের ফ্যান হয়ে গেছেন। ভাবা যায় এই নীল হাঙর ২৮ মিনিট পর্যন্ত মেসিদের গতিরোধ করেছিল! তবে ২৯ মিনিটের মাথায় মেসির গোলে আর্জেন্টিনা এগিয়ে যায়। এ কারণে বলা হয়ে থাকে- এবারের বিশ্বকাপ মানেই মেসির বিশ্বকাপ। এটাই মেসিম্যাজিক।
খেলার ভাগ্যটা তখন অনেকেই মনে করেছিলেন এখানেই বুঝি শেষ। কিন্তু তখনই নীল হাঙরের গর্জন। গোল পরিশোধ করে সব হিসাব পাল্টে দেয়। আর্জেন্টিনাও চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। বিশেষ করে মেসি। গোলরক্ষক ভোজিনিয়া আসলেই এক অপ্রতিরোধ্য দেয়াল রচনা করেন। এজন্যই হয়তো তাকে অনেকেই চীনের গ্রেটওয়ালের সঙ্গে তুলনা করে থাকেন। যার প্রমাণ দেখেছে ফুটবল বিশ্ব।
খেলা চলতে থাকে। বলের নিয়ন্ত্রণ অনেকটা আর্জেন্টিনার কাছে। এর মধ্যেই আবার ৯৩ মিনিটে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেজ এক জটলা থেকে গোল করে বসেন। গোলটি ছিল অনেকটাই অপ্রত্যাশিত। তখন অনেকেই মনে করেছিলেন কেপ ভার্দে বুঝি আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। সে কি আর হয়! ঠিক কয়েক মিনিট বাদেই সিডনি কাবরালের গোলে কেপ ভার্দে খেলায় ফিরে আসে। নতুন উত্তেজনা। কাবরালের গোলটি ছিল অপূর্ব। যেভাবে তিনি গোলটি করলেন তা রীতিমতো বিস্ময়কর। এ যেন মেসিদের কাছে আকাশ ভেঙে মাথায় পড়ার মতো। কী যে গোল! চলুন আরেকবার দেখে আসি। এই গোলের পর আর্জেন্টিনার সমর্থকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। কোচ স্কালোনির মুখের দিকে তো তাকানোই যাচ্ছিল না। আর মেসি আবেগ ধরে রাখতে পারছিলেন না। চোখে তখন পানি। মেসিবিরোধীরা নতুন হিসাব-নিকাশ করতে শুরু করেছিলেন। মাঠের অবস্থা যা ছিল তাতে মনে হচ্ছিল- এটা শেষ মুহূর্তে পেনাল্টি শুটআউটেই যাবে। তখনই রোমেরোর হেড থেকে বল কেপ ভার্দের বোর্জেসের হাতে লেগে চলে যায় জালে। অসহায় ভোজিনিয়া শুধু তাকাচ্ছিলেন। আসলে এই লড়াইয়ের সমাপ্তি এভাবে হবে- ভাবেননি কেউই। কিন্তু আর্জেন্টিনা সারাক্ষণই বুঝেছে- কত ধানে কত চাল। এই লড়াইয়ে ফুটবলের পরাশক্তি আর্জেন্টিনা জয় পেয়েছে বটে। কিন্তু আসল জয়ী কেপ ভার্দে। বিশেষ করে গোলরক্ষক ভোজিনিয়া। ৪০ বছর বয়সে এসেও তিনি লামিন ইয়ামাল, নিকো উইলিয়ামস এমনকি মেসির একের পর এক শট যেভাবে আটকে দিয়েছেন তা এক কথায় অবিশ্বাস্য। মেসির মুখোমুখি হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন যে ভোজিনিয়া তিনিই কিনা ফুটবলের জাদুকরের বল রুখে দেন! ফুটবল যেহেতু গোলের খেলা। গোল নেই, ইতিহাসে আপনার নামও নেই। তবে এই খেলাটিকে ঘিরে শুধু মায়ামি স্টেডিয়ামে নয়, ফুটবল বিশ্বে রীতিমতো চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। কেপ ভার্দে লড়াই করেছে। শুধু লড়াই বললে ভুল হবে। মেসিবাহিনীকে খেলার অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে গেছে। এই যুদ্ধের কথা অনেকদিন মনে থাকবে। এ রকম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ খেলা সমসাময়িককালে হয়েছে- রেকর্ড এমনটা বলে না। কেপ ভার্দে বিশ্বকাপে আসলেই এক রূপকথা। জম্পেশ এই লড়াই দেখে অনেকেই বলতে শুরু করেছেন- নীল হাঙরদের গর্জন থামলো বটে, কিন্তু দিয়ে গেল আরও এক কঠিন ইঙ্গিত।
খেলা শেষে মেসি কী বলেছেন
এই রোমাঞ্চকর ম্যাচ শেষে মেসি তার আত্মসমালোচনাও করেছেন। বলেছেন, আমরা আগেই জানতাম এটি খুব কঠিন একটি ম্যাচ হতে যাচ্ছে। স্পেন বা উরুগুয়ের বিপক্ষে এই দলটি হারেনি, এটা কোনো কাকতালীয়ও নয়। প্রথম গোলটি করাই ছিল সবচেয়ে কঠিন কাজ। আমরা ভেবেছিলাম, গোল পাওয়ার পর ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবো। শান্তভাবে খেলতে পারবো। কিন্তু হয়েছে ঠিক উল্টোটা। কিছু সময় আমরা বলের দখল হারিয়েছি। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি নিচে নেমে গেছি। যেভাবে চাপ সৃষ্টি করতে চেয়েছিলাম, সেভাবে করতে পারিনি। কেপ ভার্দে নিজেদের শক্তির জায়গাগুলো কাজে লাগিয়েছে। সমতায় ফিরেছে।
মেসি আরও বলেন, ‘এগুলো এক ম্যাচের লড়াই। এখানে কেউ কাউকে কিছু উপহার দেয় না। অনেকেই হয়তো কিছু দলকে তাদের নামের কারণে হালকাভাবে নেয়। কিন্তু আমরা জানতাম এই ম্যাচ কখনোই সহজ হবে না। এটাই এই বিশ্বকাপকে এতটা বিশেষ করে তুলেছে। এখানে সবকিছুই খুব কাছাকাছি, আর প্রতিটি ম্যাচই ভীষণ কঠিন।’
