খামেনির শেষ বিদায়ে তেহরানে কোটি মানুষ

খামেনির শেষ বিদায়ে তেহরানে কোটি মানুষ

ফন্ট সাইজ:

কাঁদছে ইরান। রাষ্ট্রীয় প্রধান থেকে শিশু পর্যন্ত সর্বস্তরের মানুষ তাদের প্রিয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে শেষ 
প্রদ্ধা জানাচ্ছেন হৃদয় বিগলিত ভালোবাসায়। তার জানাজায় শুক্রবার হাজার হাজার মানুষ শরিক হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। ইরানের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের দেখা গেছে, হাউমাউ করে কাঁদছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বোমা হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃতদেহ শুক্রবার তেহরানের একটি বিশাল প্রার্থনা হলে সর্বসাধারণের শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হয়েছে। সেখানে ধর্মীয় নেতা, সরকারি কর্মকর্তা, বিদেশি অতিথি এবং হাজারো শোকাহত মানুষ তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। ইরান খামেনির স্মরণে এক সপ্তাহব্যাপী রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান ও গণশবযাত্রার আয়োজন করেছে। দেশটির ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের আদর্শের প্রতি জনগণের আনুগত্য প্রদর্শনের অংশ হিসেবেই এই আয়োজন করা হচ্ছে।

এ খবর দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স লিখেছে, ৩৭ বছর ধরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী খামেনি ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধের প্রথম বিমান হামলায় নিহত হন, যার মাধ্যমে তার দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, খামেনির মৃতদেহ ইরানের কোম এবং ইরাকের শিয়া মুসলমানদের দু’টি প্রধান ধর্মীয় নগরী নাজাফ ও কারবালায় নেয়া হবে। এরপর আগামী বৃহস্পতিবার তাকে ইরানের পবিত্রতম তীর্থস্থানগুলোর একটি অবস্থিত মাশহাদ শহরে দাফন করা হবে।

বৃহস্পতিবার রাতে খামেনির কফিন জনসাধারণের সামনে আনা হলে হাজারো সমর্থক কান্নায় ভেঙে পড়েন। শোকসংগীতের তালে তারা দুলতে থাকেন, মাথায় আঘাত করেন এবং কফিনের ওপর ফুল নিক্ষেপ করেন। শুক্রবার খামেনি এবং তার সঙ্গে নিহত পরিবারের সদস্যদের কফিন রাখা হয় তার পূর্বসূরি আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির স্মরণে নির্মিত বিশাল প্রার্থনা হলে। তার বিদায় অনুষ্ঠান এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন ইরানের জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কর্তৃপক্ষ আগামী কয়েক দিনের শবযাত্রায় লাখো মানুষকে অংশ নিতে উৎসাহিত করছে। এজন্য যাতায়াত, খাবার ও থাকার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের প্রায় পাঁচ দশক পরও ইরানের অভ্যন্তরীণ বিভাজন এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় গভীর। খামেনির জানাজার আগে জাতীয় ঐক্যের সরকারি প্রচারণা চললেও বাস্তবে ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রতি জনসমর্থন খুবই দুর্বল। নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি, যিনি খামেনির ছেলে, বাবার মৃত্যুর সময়ের হামলায় আহত হওয়ার পর থেকে নতুন কোনো প্রকাশ্য ছবিতে দেখা যায়নি।

বহু বছরের কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিকে প্রায় পঙ্গু করে দিয়েছে। এদিকে ধারাবাহিক গণবিক্ষোভ দমন করতে নিরাপত্তা বাহিনী ক্রমেই কঠোর শক্তি প্রয়োগ করেছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে হাজারো বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে। তবে এই সপ্তাহে এসব সংকটকে আড়ালে রেখে সরকার রাষ্ট্রীয় শক্তি ও জনসমর্থনের প্রদর্শনী আয়োজন করছে।

তেহরানের প্রধান সড়কগুলোতে সামরিক ও পুলিশ যান মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশ এবং কালো পোশাকধারী স্বেচ্ছাসেবী আধাসামরিক বাহিনী বাসিজ সদস্যরা মোটরসাইকেলে টহল দিচ্ছেন। একই সঙ্গে ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে সতর্ক করে জানিয়েছে, জানাজা চলাকালে কোনো ধরনের হামলা চালানো হলে তার পরিণতি হবে গুরুতর।

শুক্রবার কফিনগুলো জনতার মাথার ওপর দিয়ে বহন করে প্রার্থনা হলে আনা হয়। পরে সেগুলো সাদা রঙের ধাপযুক্ত মঞ্চে রাখা হয়। পেছনে ছিল নকশাকরা বিশাল খিলান এবং দুই পাশে ইরানের জাতীয় পতাকা ও কালো শোকের পতাকা।
খামেনির কফিনের ওপর রাখা হয়েছিল একটি কালো পাগড়ি- নবী হযরত মুহম্মদ (স.)-এর বংশধর দাবি করা শিয়া আলেমরা পরে থাকেন। এর নিচে ছিল ভাঁজ করা একটি চেক নকশার স্কার্ফ, যা ইরানে বিপ্লবী আদর্শ এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।

শেষ শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত ছিলেন- রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ, চীনের ন্যাশনাল পিপল্‌স কংগ্রেস-এর উপ-প্রধান হ্য ওয়েই, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ এবং ইরাকের প্রেসিডেন্ট নিজার আমেদিসহ বিভিন্ন দেশের নেতা ও প্রতিনিধি। এ ছাড়া ইসরাইলি হামলায় নিহত ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র লেবাননের হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরুল্লাহ এবং শীর্ষ কমান্ডার ইমাদ মুগনিয়েহর পরিবারের সদস্যরাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন। ইরানের প্রেসিডেন্ট, পার্লামেন্টের স্পিকার, পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক নেতারাও কফিনের সামনে গিয়ে দোয়া করেন ও কান্নায় ভেঙে পড়েন।

একদল সামরিক জেনারেল কফিনের সামনে দাঁড়িয়ে সালাম জানান। তাদের মধ্যে ছিলেন সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর প্রধান আহমাদ বাহিদি। নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে দায়িত্ব নেয়ার পর এটাই ছিল তার প্রথম প্রকাশ্য উপস্থিতি।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন