পুশইন চেষ্টা কমলেও থামেনি

ফন্ট সাইজ:

ভারতের একতরফা পুশইন প্রচেষ্টা আগের তুলনায় কিছুটা কমলেও পুরোপুরি থামেনি। থেমে থেমে এখনো সীমান্ত দিয়ে মানুষ ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা চলছে। তবে শুরু থেকেই এ বিষয়ে অনড় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশের 
সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি। অবৈধ অনুপ্রবেশ বা একতরফা পুশইনের ক্ষেত্রে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি অনুসরণ করে প্রতিটি ঘটনাই প্রতিহত করার চেষ্টা করছে বাহিনীটি। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার কচুরগুল সীমান্ত দিয়ে ১০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করে বিএসএফ। স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেয় বিজিবি। পরে ওই ব্যক্তিদের ভারতীয় ভূখণ্ডে ফিরিয়ে দেয়া হয়।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, গত মাসেই নয়াদিল্লিতে বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকে সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়ে দুই পক্ষ একমত হয়েছিল। সেই প্রতিশ্রুতির পরও নতুন করে পুশইনের এই চেষ্টা সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, কয়েক সপ্তাহ আগের তুলনায় বর্তমানে পুশইনের চেষ্টা কমেছে। এর পেছনে বিজিবি’র কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের বিষয়টিও সামনে আসছে। কেননা তার এই সফরের মধ্যেই নেয়া নয়াদিল্লির কিছু উদ্যোগ দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে বর্তমান সরকার ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে সামনে রেখে এগোচ্ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েই প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও বিভিন্ন সময়ে একই বার্তা দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর তার দ্বিতীয় বিদেশ সফর ছিল চীনে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সামার দাভোস সম্মেলনে অংশ নেয়ার পাশাপাশি প্রায় পাঁচদিনের বেইজিং সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। বৈঠকে বাংলাদেশের জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগলিক অখণ্ডতা রক্ষায় এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যানে বাংলাদেশের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে শি জিনপিং। একইসঙ্গে তিনি বলেন, বিশ্ব পরিস্থিতি যেভাবেই পরিবর্তিত হোক না কেন, চীন বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্য বন্ধু, ভালো প্রতিবেশী ও অংশীদার হিসেবেই থাকবে।

তারেক রহমানের এই সফরের ওপর ভারতের নিবিড় নজর ছিল। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালও প্রকাশ্যে বিষয়টি স্বীকার করেছেন। ওই সফরের সময় থেকে দিল্লির পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর একাধিক উদ্যোগ কূটনৈতিক মহলের নজরে এসেছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তে পুশইনের ঘটনা আগের তুলনায় কমে আসাও সেই বৃহত্তর কূটনৈতিক বাস্তবতারই একটি ইঙ্গিত হতে পারে। যদিও তারা সতর্ক করে বলছেন, এটিকে সরাসরি সম্পর্কের উন্নয়ন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, বিচ্ছিন্নভাবে পুশইনের চেষ্টা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে পুশইন ইস্যুতে শুরু থেকেই কঠোর অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, যথাযথ যাচাই বাছাই এবং বিদ্যমান প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়া কাউকে বাংলাদেশ গ্রহণ করবে না- এই অবস্থান একাধিকবার নয়াদিল্লিকে জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে ভারতকে একাধিক নোট ভারবালও পাঠিয়েছে ঢাকা।

এই কূটনৈতিক যোগাযোগের সঙ্গে সীমান্তে বিজিবি টহল, গোয়েন্দা নজরদারি এবং স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা আরও জোরদার হয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে সন্দেহজনক গতিবিধির খবর পেলেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছে বিজিবি। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর একের পর এক পুশইনের চেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছে। বিজিবি বলছে, পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় থাকবে।

পরিসংখ্যান যা বলছে: ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী কর্তৃক পুশইনের চেষ্টা নতুন নয়। তবে গত এক বছরের বেশি সময়ে এর মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিজিবি’র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৭ই মে থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত দেশের ৩২টি জেলার সীমান্ত দিয়ে মোট ২ হাজার ৪৭৯ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে ১২৬ জন ভারতীয় নাগরিক এবং ৩৮ জন মিয়ানমারের নাগরিক ছিলেন। বাকিদের বাংলাদেশি বলে দাবি করেছে ভারত। তবে তাদের পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়া এখনো চলমান।

এরপরও পুশইনের চেষ্টা থামেনি। চলতি বছরের ৪ঠা জুন থেকে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে অন্তত ১৮টি পুশইনের চেষ্টা প্রতিহত করেছে বিজিবি। এসব ঘটনায় প্রায় ১৮০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। বাংলাদেশের অভিযোগ, প্রচলিত প্রত্যাবাসন চুক্তি ও নাগরিকত্ব যাচাইয়ের প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে একতরফাভাবে মানুষ পাঠানো হচ্ছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন