ভোর ৪টায় প্রিয় দল আর্জেন্টিনার খেলা। নকআউট পর্বের এই খেলা দেখার জন্য রাতভর উত্তেজনা বিরাজ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। ঘুমজাগা দর্শকরা ম্যাচের পুরো সময় চোখের পলক ফেরাতে পারেননি। নবাগত কেপ ভার্দে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে কোণঠাসা করে রাখে পুরোটা সময়। টান টান উত্তেজনার ম্যাচে অতিরিক্ত সময়ে জয় তুলে নেয় আলবিসেলেস্তেরা। প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে আসা ছোট্ট দেশ কেপ ভার্দে আর্জেন্টাইনদের পরাজিত না করতে পারলেও মন জয় করেছেন ফুটবলপ্রেমীদের। গতকাল ভোররাতে হওয়া এই খেলা নিয়ে উচ্ছ্বসিত ছিল গোটা বিশ্ব। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের সামনে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলতে আসা এবং প্রথম বারই নকআউটে জায়গা করে নেয় কেপ ভার্দে। দলটি পুরো টুর্নামেন্ট জুড়েই ছিল অপরাজিত, আত্মবিশ্বাসী এবং ভয়হীন। ফলে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মাঝেও চাপ ও অস্বস্তির ছায়া ছিল স্পষ্ট। শেষ পর্যন্ত ৯০ মিনিটের টানটান যুদ্ধের পর অতিরিক্ত সময়ে ভাগ্য নির্ধারণী মুহূর্তে শেষ হাসি হাসে নীল-সাদা সমর্থকরা। ৩-২ গোলে জয় পায় মেসি শিবির।
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২-এর এই ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয় যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামি স্টেডিয়ামে। হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠেছিল আরেক স্টেডিয়াম। দর্শকদের উচ্ছ্বাস আবেগের পাশাপাশি উৎকণ্ঠা ছিল পুরো সময় জুড়ে। আকাশি-নীল জার্সি আর পতাকায় ছেয়ে গিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। খেলা দেখতে আসা রাব্বি হোসেন বলেন, মেসি গোল করার পর তো মনে হচ্ছিল ম্যাচ শেষ, কিন্তু কেপ ভার্দে দেখালো তারা হাল ছাড়ার পাত্র নয়।
দ্বিতীয়ার্ধে কেপ ভার্দে ম্যাচে ফিরে আসে আরও সংগঠিত ও আক্রমণাত্মকভাবে। ৫৯তম মিনিটে ডেরয় দুয়ার্তে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের ফাঁক কাজে লাগিয়ে গোল করে ম্যাচে সমতা ফেরান। এই গোলের পর পুরো ম্যাচের গতি বদলে যায়। আর্জেন্টিনা কিছুটা চাপে পড়ে যায়, অন্যদিকে কেপ ভার্দের খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস কয়েকগুণ বেড়ে যায়। দর্শকদের মধ্যেও তখন দুই ভাগ- একদিকে আর্জেন্টিনার দুশ্চিন্তা, অন্যদিকে কেপ ভার্দের বিস্ময়কর লড়াইয়ের প্রশংসা।
সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সাদিয়া আক্তার বলেন, ৯২ মিনিটে যখন আর্জেন্টিনা এগিয়ে গেল, আমি ভেবেছিলাম শেষ। কিন্তু কেপ ভার্দের ফিরে আসাটা ছিল অসাধারণ। ইংরেজি বিভাগের মাহমুদ হাসান বলেন, আত্মঘাতী গোলটা ছিল সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্ত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে বসে খেলা দেখা দর্শকদের প্রতিক্রিয়াও ছিল তীব্র আবেগময়। প্রথমার্ধে স্বস্তি, দ্বিতীয়ার্ধে উৎকণ্ঠা, অতিরিক্ত সময়ে উত্তেজনা এবং শেষ মুহূর্তে বিস্ফোরক আনন্দ। সবমিলিয়ে এক ধরনের ‘রোলার কোস্টার রাইড’ অভিজ্ঞতা তৈরি হয়। কেপ ভার্দের সাহসী পারফরম্যান্স অনেককে মুগ্ধ করে, আবার আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞতা ও চাপ সামলানোর ক্ষমতা প্রশংসা কুড়ায়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ফারজানা ইসলাম বলেন, বিশ্বকাপ মানেই নাটক! এই ম্যাচ শেষে আমি কাঁপতে কাঁপতে উঠেছি। কেপ ভার্দে প্রমাণ করলো ফুটবলে বড়-ছোট বলে কিছু নেই। মেসির গোল, কাব্রালের দূরপাল্লার শট এবং শেষ মুহূর্তের আত্মঘাতী গোল- সবমিলিয়ে ম্যাচটি পরিণত হয় বিশ্বকাপের অন্যতম নাটকীয় নকআউট লড়াইয়ে। পরিসংখ্যানের বাইরে গিয়ে এই ম্যাচ ফুটবলপ্রেমীদের মনে জায়গা করে নেবে তার আবেগ, অনিশ্চয়তা এবং শেষ মুহূর্তের মোড় ঘোরানো নাটকীয়তার কারণে।
শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে আনন্দ-উল্লাসে মেতে ওঠেন আর্জেন্টিনা সমর্থকরা। বাজতে থাকতে ভবুজেলা, বাঁশি, ড্রামস সহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র। অনেকেই একে-অপরকে জড়িয়ে ধরেন, উড়ান আকাশি-সাদা পতাকা। অনেকেই মোবাইল ফোনে সেই মুহূর্ত বন্দি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। অনেকেই বলেন, ফলাফল যাই হোক, ম্যাচটি ছিল বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা নকআউট লড়াই। ভোরের ঘুম ত্যাগ করে খেলা দেখতে আসা শিক্ষার্থীদের কাছে ১২০ মিনিট যেন কেটে যায় চোখের পলকেই। গোলের পর গোল, আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ আর শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় প্রতিটি মুহূর্তে বদলেছে দর্শকদের মুখের অভিব্যক্তি। কখনো উৎকণ্ঠা, কখনো উল্লাস, আবার কখনো হতাশাÑ সবমিলিয়ে পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে ছিল এক অনন্য ফুটবল উৎসবের আবহ। শুধু আর্জেন্টিনা সমর্থকই নন, নিরপেক্ষ দর্শকরাও কেপ ভার্দের সাহসী লড়াইয়ে মুগ্ধ হয়েছেন। তাদের মতে, এমন টানটান উত্তেজনার ম্যাচই বিশ্বকাপকে বিশেষ করে তোলে এবং ফুটবলপ্রেমীদের মনে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
