পশ্চিমবঙ্গ তৃণমূল কংগ্রেসের নাম, প্রতীক ও তহবিলের অধিকার নিয়ে যখন জোর লড়াই চলছে মমতাপন্থি তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর, ঠিক সেই সময়ই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে জোর ধাক্কা দিয়ে পদত্যাগ করেছেন তার দীর্ঘদিনের সঙ্গী সাবেক অথর্মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের পর গত মাসের গোড়ার দিকে দলে সাংগঠনিক বদল করে সুব্রত বক্সিকে সরিয়ে বিশ্বস্ত হিসেবে চন্দ্রিমাকে রাজ্য তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবে নিয়োগ করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই চন্দ্রিমাই শনিবার সকালে দলের রাজ্য সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। পদত্যাগের চিঠি পাঠিয়ে দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। তিনি জানিয়েছেন, দলে তার বিশ্বাসযোগ্যতা, আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাই তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তৃণমূল কংগ্রেসের সব পদ থেকেই চন্দ্রিমা ইস্তফা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। পরে বিধানসভায় সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন, ‘কালের যাত্রায় সবাইকেই পা মেলাতে হয়।’
জানা গিয়েছে, মেট্রোপলিটানের ভবন দখল নিয়ে ‘মমতাপন্থি তৃণমূল কংগ্রেস’ ও ‘ঋতব্রতপন্থি তৃণমূল কংগ্রেসে’র তীব্র দ্বন্দ্বের মধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চন্দ্রিমার আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সেই ‘অভিমানে’ চন্দ্রিমা সব পদ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। তৃণমূলের অ্যাকাউন্টের সিগনেটরি দায়িত্ব থেকেও অব্যাহতি নিয়েছেন চন্দ্রিমা। কালীঘাটেও যাবেন না বলে জানিয়েছেন। রাজনৈতিক মহলের মতে, দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধার এই সিদ্ধান্তে আরও নিঃসঙ্গ হলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
রাজ্য সভাপতিসহ তৃণমূল কংগ্রেসের সব পদ ছেড়েই বিধানসভায় গিয়েছেন চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। সেখানে নতুন তৃণমূল অর্থাৎ বিদ্রোহী তৃণমূল গোষ্ঠীর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তিনি। বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘরে এই বৈঠক হয়। বৈঠকে বিদ্রোহী শিবিরের একাধিক বিধায়ক উপস্থিত ছিলেন। এ বিষয়ে চন্দ্রিমাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছেন, ‘কালের যাত্রায় সবাইকেই পা মেলাতে হয়।’ যদিও তিনি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগ দেয়ার বিষয়টি স্পষ্ট করেননি। তবে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর অন্যতম নেতা তথা বিধায়ক সন্দীপন সাহা চন্দ্রিমার পদত্যাগের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন।
পদত্যাগের পরই বাজেট তৈরির প্রশ্নে চন্দ্রিমা বিস্ফোরক সব তথ্য প্রকাশ্যে এনেছেন। তিনি জানিয়েছেন, বাজেট পেশের কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি জানতে পারতেন, বাজেটে কী আছে, কী কী প্রস্তাব তিনি পাস করতে চলেছেন। তিনি অথর্মন্ত্রী হলেও বাজেট তৈরি নিয়ে তার সঙ্গে কোনো আলোচনাই করতেন না দলনেত্রী, এমনই অভিযোগ করেছেন চন্দ্রিমা। তিনি বলেছেন, জনতা যখন জেনেছে, আমি তার কয়েক ঘণ্টা আগে জেনেছি।
চন্দ্রিমার পদত্যাগের পরই শনিবার ফেসবুক লাইভ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছেন, চন্দ্রিমা বিদায়ের পর তিনিই সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় চেয়ারপারসনের পাশাপাশি সভানেত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। মমতার কথায়, ‘কে ছেড়ে গেল, তাতে কিছু যায় আসে না। আমি নেতা চাই না, সাধারণ কর্মী চাই। দলের রাজ্য সংগঠনটাও এখন আমি চালাবো। আপাতত আমার কাজ নেই। সারাদিন দলটাই দেখবো। এমনি আমি রোজ এই পার্টি অফিসে বসি, কর্মীদের সঙ্গে দেখা করি। এবার থেকে আরও বেশি সময় দেবো। এ ছাড়া কাজ চালাতে সুবিধার জন্য দু’জন সাধারণ সম্পাদক ঠিক করেছি। মদন মিত্র ও কুণাল ঘোষ হবেন সাধারণ সম্পাদক। তারা এই কাজে আমাকে সাহায্য করবেন।’ গত দুই মাসে মমতা একধিকবার দলের সাংগঠনিক রদবদল করেছেন।
পাশাপাশি শনিবার ফেসবুক লাইভে মুখ্যমন্ত্রী পদে দায়িত্ব নেয়ার জন্য শুভেন্দু অধিকারীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মানুষের জন্য কাজ করলে পাশে থাকার আশ্বাসও দিয়েছেন মমতা। ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের শোচনীয় পরাজয়ের পরও সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, এই ফলাফল তিনি মানেন না। তিনি হারেননি। এই যুক্তিতে মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে ইস্তফা দিতে রাজভবনেও যাননি তিনি। অবশেষে হার স্বীকার করে নিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
