৫ই আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর সারা দেশের মতো চট্টগ্রামেও সক্রিয় হয়ে ওঠেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। সভা-সমাবেশে বাড়তে থাকে মানুষের সংখ্যা। লম্বা হয় মিছিলের সারি। তবে গড়ে ওঠেনি সাংগঠনিক কাঠামো। এমনকি ১২ই ফেব্রুয়ারিতে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পরও এখানে পুনর্গঠন হয়নি মহানগরসহ তিনটি সাংগঠনিক ইউনিটের নেতৃত্ব। এমনকি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট চট্টগ্রাম উত্তর জেলায় কমিটি নেই দীর্ঘদিন ধরে। শক্তিশালী নেতৃত্ব ও শৃঙ্খলা না থাকায় এখানে দলটির কর্মী-সমর্থকরাও যেমন খুশি তেমন চলছেন।
দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামে বিএনপি’র সাংগঠনিক কার্যক্রম চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর এবং দক্ষিণ জেলা এই তিনভাগে বিভক্ত হয়ে পরিচালিত হয়। সাংগঠনিক কাঠামো সুসংগঠিত না থাকলেও আধিপত্য বিস্তার ও পদ-পদবি নিয়ে প্রায়ই দলের ভেতরে ও বাইরে বিরোধের সৃষ্টি হচ্ছে। ফলাফলে দেখা যায় সংঘর্ষও খুনখারাবির। গত ২৩ মাসে চট্টগ্রামে ১৩৬টি খুনের মধ্যে ৫৩ জন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। এদের বড় একটি অংশ উত্তর চট্টগ্রামের রাউজান ও সীতাকুণ্ড উপজেলার।
তিনটি সাংগঠনিক এলাকায় দলীয় কোন্দল ও আধিপত্য বিস্তারের মতো ঘটনা থাকলেও সবচেয়ে বেশি বিএনপি’র নেতাকর্মী খুন হয়েছেন উত্তর জেলার পাঁচ উপজেলায়। এগুলো হলোÑ রাউজান, সীতাকুণ্ড, মিরসরাই, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়ি। এর মধ্যে রাউজানের চলমান বিরোধ ও সহিংসতা দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য গোলাম আকবর খোন্দকার অনুসারীদের সংঘাত-সংঘর্ষের জেরে গত বছরের ২৯শে জুলাই চট্টগ্রাম উত্তর জেলা কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে কেন্দ্র। এরপর থেকে সাংগঠনিক এই জেলায় দল পুনর্গঠনের উদ্যোগ কার্যত থমকে আছে। উত্তর চট্টগ্রামের ৭টি উপজেলা ও ৯টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এই সাংগঠনিক জেলা বিএনপি’র জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উত্তর জেলা বিএনপি’র সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও ফটিকছড়ি আসনের সংসদ সদস্য সরোয়ার আলমগীর মানবজমিনকে বলেন, দীর্ঘদিন কমিটি না থাকায় সাংগঠনিক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা এখন চান সংঘাতের রাজনীতি থামিয়ে বিতর্কমুক্ত, যোগ্য ও ত্যাগী নেতাদের হাতে নেতৃত্ব তুলে দেয়া হোক।
চলতি বছরের ২রা ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপি’র আংশিক আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে ইদ্রিস মিয়াকে আহ্বায়ক এবং লায়ন হেলাল উদ্দিনকে সদস্য সচিব করা হয়েছে। কমিটিতে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়েছে আলী আব্বাসকে। আংশিক এই কমিটিতে যুগ্ম আহ্বায়ক হয়েছেন লিয়াকত হোসেন ও মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা। এর মধ্যে হেলাল প্রবীণ বিএনপি নেতা জামালউদ্দিন হত্যা মামলার আসামি। আলী আব্বাসের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের বেশ কয়েকটি অভিযোগ আছে। আর কমিটি ঘোষণা দেয়ার পর পদত্যাগ করেন লিয়াকত আলী। যে কারণে অনেকটা নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ে এই ইউনিট। গঠিত হয়নি পূর্ণাঙ্গ কমিটি। হতাশা বিরাজ করছে তৃণমূলে।
চট্টগ্রাম মহানগর শাখা বিএনপি’রও একই অবস্থা। ২০২৪ সালের ৭ই জুলাই এরশাদ উল্লাহকে আহ্বায়ক ও নাজিমুর রহমানকে সদস্য সচিব করে আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। একই বছরের ৪ঠা নভেম্বর এই কমিটির আকার বাড়িয়ে ৫৩ সদস্যবিশিষ্ট করা হয়। তবে এই কমিটিতে দুঃসময়ের অনেক নেতাকর্মীর জায়গা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে সেসময় তৈরি হয় ক্ষোভ। যার প্রভাব আছে এখনো।
মহানগর ছাত্রদলের সাবেক এক নেতা বলেন, দলের দুঃসময়ে আমরা মাঠে ছিলাম। হুমকি-ধমকি উপেক্ষা করে নেতাকর্মীদের নিয়ে অ্যাক্টিভ ছিলাম। বিশেষ করে ডা. শাহাদাত, আবুল হাশেম বক্কর ও সুফিয়ান ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করা নেতাকর্মীদের কমিটিতে জায়গা হয়নি। ফলে মহানগর সংগঠনও অনেকটা নিষ্ক্রিয়। অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর অবস্থাও একই।
সংগঠনের সার্বিক বিষয়ে বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক (চট্টগ্রাম) মাহবুবের রহমান শামীম বলেন, জাতীয় নির্বাচন হয়েছে কিছুদিন আগে। নির্বাচন কেন্দ্রিক কিছু ব্যস্ততা ও বাস্তবতা ছিল। এখন আমরা আবার দল গোছানোর দিকে নজর দিচ্ছি। সংসদের এই অধিবেশন শেষে আশা করছি ভালো কিছু দেখবেন।
