সমাধান হতে পারে প্রযুক্তি

মা ম লা জ ট

সমাধান হতে পারে প্রযুক্তি

ফন্ট সাইজ:

দেশে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৪৫ লাখ। প্রতিদিনই তা লাফিয়ে বাড়ছে। দেশের আদালতগুলোতে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা এসব মামলার পাহাড় বিচারপ্রার্থী ও বিচারব্যবস্থার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিচারক সংকট, সমন জারিতে বিলম্ব, নথিপত্র ব্যবস্থাপনার জটিলতা, নিরাপত্তাজনিত কারণে আসামিকে আদালতে আনতে না পারা, সরকারি সাক্ষীদের দূর-দূরান্তে পোস্টিং থাকায় ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আদালতে উপস্থিত হতে না পারা এবং বারবার সময় নেয়ার প্রবণতার কারণে মামলার নিষ্পত্তি কাঙ্ক্ষিত গতিতে হচ্ছে না। এ অবস্থায় আদালতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করছেন আইন বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী ও বিচার সংশ্লিষ্টরা।

তাদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর বিচারব্যবস্থা চালু করা গেলে আদালতের কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে এবং মামলার নিষ্পত্তির হারও বাড়বে। বিশেষ করে সাক্ষ্যগ্রহণ, জামিন শুনানি, রিট আবেদন, আপিল শুনানি এবং অন্যান্য প্রাথমিক বিচারিক কার্যক্রম ভার্চ্যুয়াল প্ল্যাটফরমে পরিচালনা করা গেলে আদালতের সময় ও ব্যয় দুটোই কমবে।
এ বিষয়ে আইন ও বিচার বিভাগের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ মেহেদী হাসান বলেন, আদালতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকার দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে। ২০১৬ সালের দিকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সহযোগিতায় ‘ই-কোর্ট’ প্রকল্পের একটি প্রস্তাবনা প্রস্তুত করা হয়েছিল। ওই সময় প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনে উপস্থাপন করা হলে কমিশন বিভিন্ন কারিগরি ও প্রশাসনিক বিষয়ে কিছু পরামর্শ দেয় এবং প্রয়োজনীয় সংশোধন এনে পুনরায় প্রস্তাবনা জমা দেয়ার পরামর্শ দেয়। সেই অনুযায়ী প্রকল্পের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা ও হালনাগাদ করে পুনরায় প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়েছে। ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে শিগগিরই আবার তা জমা দেয়া হবে। মেহেদী হাসান বলেন, ই-কোর্ট প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের বিচারব্যবস্থায় একটি বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। মামলার নথিপত্র ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ, অনলাইনে মামলা দাখিল, মামলার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, ডিজিটাল কজলিস্ট, ভার্চ্যুয়াল শুনানি এবং ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সাক্ষ্যগ্রহণের মতো সুবিধা চালু করা সম্ভব হবে। এর ফলে বিচারপ্রার্থীদের আদালতে বারবার উপস্থিত হওয়ার প্রয়োজন কমবে এবং বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা আরও সহজ ও কার্যকর হবে।

কেন প্রয়োজন প্রযুক্তি: ২০২৫ সালের ২৭শে মে সেনাবাহিনীর বিশেষ অভিযানে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনসহ চারজন গ্রেপ্তার হন। মামলাটি বর্তমানে সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য রয়েছে। তবে নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে তাকে সরাসরি আদালতে না এনে ভার্চ্যুয়াল শুনানির জন্য কয়েকবার আবেদন করেছে কারা কর্তৃপক্ষ। কিন্তু আদালতে প্রযুক্তির ব্যবস্থা না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে অস্ত্র আইনের মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ কার্যক্রম থমকে আছে। আদালত সূত্র জানায়, নিরাপত্তাজনিত কারণে চারটি ধার্য তারিখে সুব্রত বাইনসহ শীর্ষ চার সন্ত্রাসীকে আদালতে হাজির করা হয়নি। প্রতি ধার্য তারিখের আগে কারা কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তাজনিত কারণে ভার্চ্যুয়াল সাক্ষ্যগ্রহণের আবেদন করেন। কিন্তু আদালতে ভার্চ্যুয়াল শুনানির ব্যবস্থা না থাকায় ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে সাক্ষ্যগ্রহণের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর এডভোকেট মাহফুজ হাসান বলেন, ২০২৫ সালের ১৬ই নভেম্বর শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল। সেদিন আদালতে চারজন সাক্ষীও উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু নিরাপত্তাজনিত কারণে নারায়ণগঞ্জ কারাগারে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীকে আদালতে হাজির করা হয়নি। পরে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ভার্চ্যুয়াল শুনানির উদ্যোগ নেয়া হয়। তবে মোবাইল সংযোগের চেষ্টা করা হলে আসামিপক্ষের আইনজীবী পূর্ণাঙ্গ ভার্চ্যুয়াল ডিভাইস স্থাপনের মাধ্যমে সাক্ষ্যগ্রহণের আবেদন জানান। তখন আদালত শুনানির কার্যক্রম বন্ধ রাখেন। চলতি মাসেও সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য দিন ধার্য রয়েছে। সাবেক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ড. শাহজাহান সাজু বলেন, দিন দিন দেশের আদালতগুলোতে মামলার জট উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিচারপ্রার্থীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে একটি মামলার নিষ্পত্তি হতে যুগের পর যুগ লেগে যাচ্ছে। তবে আদালতের কার্যক্রমে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে এই জট অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। তিনি বলেন, ফৌজদারি ও দেওয়ানি উভয় ধরনের মামলায় বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাক্ষ্যগ্রহণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রতিটি মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা, ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক, সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী কর্মকর্তা, আলামত পরীক্ষাকারী বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সাক্ষ্য দিতে হয়। কিন্তু মামলার তদন্ত বা অন্যান্য কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার কয়েক বছর পর বিচারিক কার্যক্রম শুরু হলে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ইতিমধ্যে অন্য জেলায় বা অন্য কর্মস্থলে বদলি হয়ে গেছেন।

উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ঢাকার কোনো মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বা ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক কয়েক বছর পর পঞ্চগড়, কক্সবাজার কিংবা রংপুরে কর্মরত থাকতে পারেন। আদালত থেকে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য সমন জারি হলে তাদের ঢাকায় এসে আদালতে হাজির হতে হয়। এতে একদিকে সরকারি অর্থ, সময় ও শ্রম ব্যয় হয়, অন্যদিকে তাদের কর্মস্থলের স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হয়। ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকার জনগণও প্রয়োজনীয় সেবা থেকে সাময়িকভাবে বঞ্চিত হন।
বাংলাদেশ আইন সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী মাহবুবুর রহমান খান বলেন, বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এসব সমস্যার কার্যকর সমাধান সম্ভব। আদালতগুলোতে ভিডিও কনফারেন্সিং বা ভার্চ্যুয়াল সাক্ষ্যগ্রহণ ব্যবস্থা চালু ও সম্প্রসারণ করা হলে দেশের যেকোনো স্থান থেকে সাক্ষীরা আদালতে উপস্থিত না হয়েও সাক্ষ্য দিতে পারবেন।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এডভোকেট মোহাম্মদ ফারুক হোসেন মানবজমিনকে বলেন, শুধু আদালত নয়, পুলিশ, কারা কর্তৃপক্ষ, আইনজীবী এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার মধ্যে সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। এতে বিচারপ্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও গতিশীল হবে। একইসঙ্গে বিচারপ্রার্থীদের সময় ও অর্থের অপচয় কমবে এবং জনগণের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির অধিকার আরও সহজতর হবে। তিনি বলেন, আদালতে প্রযুক্তির ব্যবহার এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং সময়ের দাবি। বিচার ব্যবস্থাকে আধুনিক ও জনবান্ধব করতে হলে প্রযুক্তিনির্ভর আদালত ব্যবস্থার দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন। এর মাধ্যমে মামলার জট কমানোর পাশাপাশি বিচারপ্রক্রিয়ার সামগ্রিক দক্ষতা ও গুণগত মানও বৃদ্ধি পাবে।

আছে ইতিবাচক অভিজ্ঞতা: আইনজীবীরা বলছেন, করোনা মহামারির সময় ভার্চ্যুয়াল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে বিচার কার্যক্রম সচল রাখা সম্ভব হয়েছিল। সে সময় অনলাইনে হাজার হাজার জামিন আবেদন, রিট ও অন্যান্য মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে প্রমাণ হয়েছে, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে ভার্চ্যুয়াল কোর্ট বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার একটি কার্যকর অংশ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভার্চ্যুয়াল কোর্ট শুধু জরুরি পরিস্থিতির জন্য নয়, বরং নিয়মিত বিচার কার্যক্রমেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে। বিশেষ করে প্রক্রিয়াগত শুনানি, কেস ম্যানেজমেন্ট, সাক্ষীর ভার্চ্যুয়াল সাক্ষ্যগ্রহণ এবং স্বল্প সময়ের শুনানিগুলো অনলাইনে পরিচালনা করলে আদালতের ওপর চাপ অনেকটাই কমবে।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়বে: সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, ভার্চ্যুয়াল কোর্ট ব্যবস্থায় ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণের সুযোগ থাকায় বিচার কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ হবে। শুনানির তথ্য, আদেশ ও মামলার অগ্রগতি সহজে সংরক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ করা যাবে। এতে প্রশাসনিক জটিলতা কমবে এবং বিচারপ্রার্থীরা দ্রুত তথ্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

তবে ভার্চ্যুয়াল কোর্ট কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, উচ্চগতির ইন্টারনেট, সাইবার নিরাপত্তা এবং দক্ষ জনবল। পাশাপাশি বিচারক, আইনজীবী ও আদালত কর্মচারীদের প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রশিক্ষণ দেয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনীয় আইনগত সংস্কার ও নীতিমালা প্রণয়ন ছাড়া এ ব্যবস্থার পূর্ণ সুফল পাওয়া সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, দেশে মামলার সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। এ বাস্তবতায় শুধু নতুন আদালত বা বিচারক নিয়োগ দিয়ে সমস্যা সমাধান কঠিন। বিচার ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর ও আধুনিক করার মাধ্যমে মামলার জট কমানো সম্ভব। আর সে লক্ষ্য অর্জনে ভার্চ্যুয়াল কোর্ট ব্যবস্থা হতে পারে একটি কার্যকর ও সময়োপযোগী উদ্যোগ।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন