প্রথম আলো
‘পাঠদানের শিক্ষক কম, প্রধান শিক্ষক নেই ৫৫% বিদ্যালয়ে’-এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় অবস্থিত শহীদ মনু মিঞা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে এখন নতুন ছয়তলা ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। ভবনটি হচ্ছে বিদ্যালয়ের একমাত্র খেলার মাঠের জায়গায়। শ্রেণিকক্ষের সংকট মেটাতে নতুন ভবন নির্মাণ করা হলেও আরেকটি মৌলিক সংকট রয়ে গেছে আগের মতোই—পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই।
শহীদ মনু মিঞা সরকারি উচ্চবিদ্যালয় ১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত। ২০১৩ সালে এটি সরকারি হয়। বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ৪২০ শিক্ষার্থীর জন্য এখন শিক্ষক রয়েছেন প্রধান শিক্ষকসহ মাত্র ৯ জন। অর্থাৎ গড়ে একজন শিক্ষকের বিপরীতে প্রায় ৪৭ জন শিক্ষার্থী। অথচ মাধ্যমিকে গড়ে ৩০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক থাকার কথা।
বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক হালিমা খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় প্রতিদিন একজন শিক্ষককে পাঁচ থেকে ছয়টি পর্যন্ত ক্লাস নিতে হয়। প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষককেও নিয়মিত ক্লাস নিতে হয়। তিনি বলেন, বহুদিন ধরেই শিক্ষক চেয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে (মাউশি) চাহিদাপত্র পাঠানো হচ্ছে। এক পালায় (শিফট) চলা সরকারি বিদ্যালয় হিসেবে এখানে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক ছাড়া আরও ২৫ জন শিক্ষক থাকার কথা।
শুধু শহীদ মনু মিঞা সরকারি উচ্চবিদ্যালয় নয়, দেশের অধিকাংশ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় শিক্ষকের সংকটের কারণে ধুঁকছে। পাশাপাশি অনেক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ ফাঁকা। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের ৩৮৩টি পদ শূন্য, যা মোট পদের প্রায় ৫৫ শতাংশ। কিছু বিদ্যালয়ে এখনো প্রধান শিক্ষকের পদই সৃষ্টি হয়নি।
একই সঙ্গে প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোও দীর্ঘদিন শূন্য থাকায় বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা ও তদারকিও দুর্বল হয়ে পড়েছে। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এই পরিস্থিতিতে মানসম্মত মাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন।
জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক অধ্যাপক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকসংকট কমাতে সরকার কাজ করছে। এ বিষয়ে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী, সচিবসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আলোচনা করছেন, যাতে দ্রুত শূন্য পদে নিয়োগ দেওয়া যায়। পাশাপাশি শূন্য প্রশাসনিক পদ পূরণ এবং পদোন্নতি-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনেও কাজ চলছে।
অবশ্য সমস্যাটি নতুন নয়। শিক্ষা খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিগত দেড় দশকে তিন শতাধিক বিদ্যালয় সরকারীকরণ হয়েছে। এ ছাড়া বেশির ভাগ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নতুন ভবন হয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়নে যতটা জোর দেওয়া হয়েছে, শিক্ষকসংকট দূর করা, প্রধান শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষার মানোন্নয়ন কার্যক্রমে জোর কম দেওয়া হয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়নে কেনাকাটা ও দরপত্রে কমিশন–বাণিজ্যের সুযোগ থাকে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আরও বলছেন, প্রধান শিক্ষকদের পদটি খালি থাকছে অবহেলার কারণে। উদ্যোগ নিলেই তা পূরণ করা সম্ভব।
১৮% সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ২০ হাজারের বেশি বিদ্যালয়ে মাধ্যমিক স্তরে পাঠদান হয়। দেশে বর্তমানে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৭০২টি। এসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক-শিক্ষিকার অনুমোদিত পদ ১৫ হাজার ২৯৩টি। এর মধ্যে ২ হাজার ৮৪২টি পদ শূন্য, অর্থাৎ ১৮ শতাংশের বেশি পদে শিক্ষক নেই।
বর্তমান জনবলকাঠামো পর্যাপ্ত কি না, সেই প্রশ্নও রয়েছে। তার ওপর দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক পদ শূন্য। সম্প্রতি সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে ৭২৮ জন সহকারী শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। তবে এই নিয়োগ সম্পন্ন হলেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পদ শূন্যই থেকে যাবে।
২০১০ সালের শিক্ষানীতিতে ২০১৮ সালের মধ্যে বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১: ৩০-এ নামিয়ে আনার লক্ষ্য ছিল। কিন্তু সরকারি বিদ্যালয়ে এখনো গড়ে প্রতি ৩৭ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে ১ জন শিক্ষক রয়েছেন। যদিও বিদ্যালয় অনুযায়ী কোথাও কোথাও আরও বেশি।
শিক্ষকসংকটের পাশাপাশি মাধ্যমিক শিক্ষা প্রশাসনে নেতৃত্বের সংকটও প্রকট। ৭০২টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের ৩৮৩টি পদ শূন্য। এ ছাড়া সহকারী প্রধান শিক্ষকের ২৪৯টি পদও খালি রয়েছে।
শুধু বিদ্যালয় পর্যায়ে নয়, মাধ্যমিক শিক্ষার প্রশাসনিক কাঠামোতেও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পদ রয়েছে। মাউশির ৯টি আঞ্চলিক কার্যালয় ও প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালকের ১০টি পদই বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। এ ছাড়া ৬৪টি জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পদের মধ্যে ২৩টি শূন্য। বিদ্যালয় পরিদর্শকের ১৬টি পদের সব কটিই খালি। পদোন্নতি দীর্ঘদিন আটকে থাকায় প্রশাসনিক কাঠামোয় একধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।
বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক না থাকায় পাঠদান ব্যাহত
নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ পাইলট সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের চিত্রটি উদ্বেগজনক। প্রভাতি ও দিবা শাখা মিলিয়ে বিদ্যালয়টিতে ১ হাজার ১৩৪ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। শিক্ষকের অনুমোদিত ৫৩টি পদের মধ্যে ১৫টিই শূন্য।
প্রধান শিক্ষকের পদ দীর্ঘদিন খালি থাকায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সহকারী প্রধান শিক্ষক সৈয়দ আবদুল ওয়াদুদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, প্রধান শিক্ষক ছাড়াও সহকারী প্রধান শিক্ষকের একটি, ইংরেজির দুটি, গণিতের দুটি, সামাজিক বিজ্ঞানের একটি, জীববিজ্ঞানের তিনটি, ধর্ম বিষয়ে তিনটি এবং চারু ও কারুকলার দুটি পদ শূন্য রয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীদের পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। শূন্য পদ পূরণের জন্য প্রায় প্রতি মাসেই মাউশিতে আবেদন পাঠানো হচ্ছে।
দেশের অন্যতম সেরা সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রাজধানীর গবর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাইস্কুলে প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থী পড়লেও দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই।
ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল ঢাকার সদরঘাট এলাকায় অবস্থিত। এটি অবিভক্ত বাংলার প্রথম সরকারি উচ্চবিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত। এখানে প্রভাতি ও দিবা—এই দুই পালায় শিক্ষার্থী পড়ানো হয়। শিক্ষার্থী ১ হাজার ৯৮০ জন। মোট সেকশন ৩৪টি। কর্মরত শিক্ষক আছেন ৩২ জন। তবে শিক্ষকের পদসংখ্যা ৫৩। প্রধান শিক্ষকের নিয়মিত পদও খালি। একজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন।
জানতে চাইলে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের সহকারী শিক্ষক আবদুল্লাহ আল নাহিয়ান প্রথম আলোকে বলেন, পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় অনেক সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণি কার্যক্রম কোনো রকমে চলছে। সব সময় বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক দিয়ে পাঠদান সম্ভব হচ্ছে না। এর প্রভাব পড়ছে শ্রেণির রুটিন প্রণয়ন, বিষয়ভিত্তিক পাঠদান এবং পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নেও। তিনি বলেন, দুই পালার একটি বিদ্যালয়ে ৫০ জন শিক্ষক থাকলে একজন শিক্ষকের সপ্তাহে ১৫ থেকে ১৬টি ক্লাস নেওয়ার কথা। কিন্তু শিক্ষকসংকটের কারণে অনেককে সপ্তাহে ২৫ থেকে ৩০টি পর্যন্ত ক্লাস নিতে হচ্ছে। অথচ কার্যকর পাঠদানের জন্য একজন শিক্ষকের দৈনিক ৩ থেকে ৪টির বেশি ক্লাস নেওয়া উচিত নয়।
আবদুল্লাহ আল নাহিয়ান আরও বলেন, শিক্ষার মানের জন্য শুধু শিক্ষকের পাঠদানকে দায়ী করলে হবে না, পাঠদানের পরিবেশ কতটা অনুকূল, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
পদোন্নতির জটিলতা
বর্তমানে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শুরুর পদ সহকারী শিক্ষক। সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকদের বেশির ভাগই ৩০ থেকে ৩৫ বছর ধরে এই পদে চাকরি করে পদোন্নতি ছাড়াই অবসরে যেতেন। তবে ২০১৮ সালে ‘সিনিয়র শিক্ষক’ নামে নবম গ্রেডের পদ সৃষ্টি করা হয়। এই পদে ২০২১ সালের জুনে পদোন্নতি দেওয়া হয়। কিন্তু নানা জটিলতায় এই পদে পদোন্নতিও এখন আটকে আছে। সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদগুলোতেও মূলত চলতি দায়িত্ব পালন করছেন শিক্ষকেরা। নিয়োগবিধি–সংক্রান্ত জটিলতায় উপপরিচালকের পদেও নিয়মিত কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শিক্ষকদের অভিযোগ, এমনিতেই তাঁদের বেতন-ভাতা কম। তার মধ্যে ঠিক সময়ে পদোন্নতি দেওয়া হয় না। শিক্ষকদের এভাবে হতাশার মধ্যে রেখে তাঁদের কাছ থেকে ভালো মানের শিক্ষাও আশা করা কঠিন।
শিক্ষকসংকট কাম্য নয়
বিএনপি সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষা খাতের ওপর জোর দেওয়ার কথা বলেছে। ইশতেহারে বলা হয়েছে, দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক, কর্মমুখী, উৎপাদনমুখী এবং সময়োপযোগী করে গড়ে তুলবে তারা। শিক্ষার সব স্তরে জোর দেওয়া হবে। তবে প্রাথমিক শিক্ষা বেশি জোর পাবে। শিক্ষা খাতের বাজেট বরাদ্দ ধাপে ধাপে জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) ৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে।
এদিকে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। মোট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা। বরাদ্দ আগের বছরের চেয়ে বেড়েছে ৪৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘এবারের বাজেটে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে আমরা জাতীয় অগ্রযাত্রার “নিউক্লিয়াস” (মূল কেন্দ্র) হিসেবে বিবেচনা করেছি।’
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শিক্ষা খাতে অবকাঠামো উন্নয়ন অনেক হয়েছে। এখন দরকার গুণমান বৃদ্ধিতে নজর দেওয়া। সে জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত ভালো শিক্ষক।
শিক্ষকসংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তখনই কার্যকরভাবে পরিচালিত হতে পারে, যখন অনুমোদিত জনবলকাঠামো অনুযায়ী প্রয়োজনীয়সংখ্যক শিক্ষক থাকে। মাধ্যমিক শিক্ষা মূলত বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের ওপর নির্ভরশীল। সেখানে সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকসংকট থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক। তিনি বলেন, শিক্ষকস্বল্পতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে এক বিষয়ের শিক্ষককে অন্য বিষয় পড়িয়ে কোনোভাবে পাঠদান চালিয়ে নিতে হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের শিখন অর্জন দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং শিক্ষার গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ধরনের ঘাটতি কোনোভাবেই কাম্য নয়।
হাফিজুর রহমান বলেন, গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করতে দ্রুত শিক্ষকসংকট দূর করার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
যুগান্তর
দৈনিক যুগান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘চাল বদলের ভয়াবহ প্রতারণা’। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে ‘মিনিকেট’ নামে ধানের কোনো জাত নেই। নেই সরকারি স্বীকৃতি। উলটো আছে বিক্রি বন্ধের আইন। অথচ বছরের পর বছর বাজারে দাপটের সঙ্গে বিক্রি হচ্ছে এই চাল। মূলত কৃষকের উৎপাদিত স্বর্ণা, পাইজাম, বিআর-২৮সহ মোটা ও মাঝারি জাতের ধান কম দামে কিনে মজুত করেন মিলাররা। এরপর আধুনিক মেশিনে অতিরিক্ত ছাঁটাই আর পলিশ করে বানানো হয় সরু, চকচকে চাল। সেই চালই এজেন্ট-পাইকার-খুচরা বিক্রেতার হাত ঘুরে ভোক্তার কাছে পৌঁছায় দামি ‘মিনিকেট’ নামে। এতে বছরে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা লুটে নিচ্ছে মিলার চক্র।
তবে শুধু ভোক্তার পকেট কাটাই নয়, এই চাল খেয়ে ক্ষতি হচ্ছে স্বাস্থ্যেরও। অতিরিক্ত পলিশে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে চালের ভিটামিন বি-১, বি-৬, আয়রন ও ফাইবার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই চাল বেশি খেলে দ্রুত বাড়ে শরীরে শর্করার মাত্রা। বাড়ে ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকিও। যুগান্তরের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এই ভয়াবহ চিত্র।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) তথ্যমতে, দেশে বছরে মিনিকেট চালের চাহিদার সুনির্দিষ্ট কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নেই। কারণ এটি কোনো নির্দিষ্ট ধানের জাত নয়। তবে চালকল মালিকদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে বছরে চালের মোট চাহিদার প্রায় ৪০-৫০ শতাংশ মিনিকেট নামে বিক্রি হয়। সে হিসাবে, বছরে মিনিকেটের চাহিদা প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টন। খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মোটা চাল যেখানে ৬০ টাকা সেখানে মিনিকেট বিক্রি হচ্ছে ৮৫ টাকায়। এক্ষেত্রে মোটা চাল ছেঁটে কেজিপ্রতি ২৫ টাকা বাড়তি মুনাফা করা হচ্ছে। সে হিসাবে ১ কোটি ৮০ লাখ টন চালে বছরে ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি মুনাফা করা হচ্ছে। মিলাররা পাইকার, এজেন্ট ও খুচরা বিক্রেতাদের নিয়ে একটি বড় নেটওয়ার্ক তৈরি করে সরাসরি ভোক্তার পকেট থেকে এই টাকা লুটে নিচ্ছে।
ক্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, মিনিকেট নামের প্রতারণা ঠেকাতে খাদ্য মন্ত্রণালয় ২০২৩ সালে আইন করলেও এর বাস্তবায়ন নেই। প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে। মিলার-ব্যবসায়ী চক্রের প্রতারণায় ঠকছেন ক্রেতা ও কৃষক। ভোক্তার কাছ থেকে বছরে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা লুটে নেওয়া হচ্ছে। সরকারের এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
উন্নয়ন বিকল্পের নীতিনির্ধারণী গবেষণার (উবিনীগ) কনসালট্যান্ট ডা. এমএ সোবাহান যুগান্তরকে বলেন, মিলে অতিরিক্ত পলিশের কারণে চালের গায়ে থাকা প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান নষ্ট হচ্ছে। এর মধ্যে ভিটামিন বি-১, বি-৬, আয়রন ও ফাইবার কমে যাচ্ছে। মিনিকেট চাল বেশি খেলে শরীরে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়ার ঝুঁকি থাকে। যার ফলে দীর্ঘমেয়াদে ডায়াবেটিস ও হৃদরোগসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত রোগ হতে পারে। দেশে প্রতিনিয়ত এই রোগ বাড়ছে। তিনি আরও বলেন, চালের শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, এর পুষ্টিমান নিশ্চিত করা জরুরি। যা কৃষকের উৎপাদিত মোটা ও মাঝারি চালের মধ্যেও রয়েছে।
দিনাজপুরের কৃষক মো. করিম যুগান্তরকে বলেন, আমরা মাঠে মিনিকেট নামে কোনো ধান চাষ করি না। কৃষি কর্মকর্তারাও এই ধানের বিষয়ে আমাদের কখনো কোনো তথ্য দেননি। তাহলে এই চাল আসে কোথা থেকে?
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম বলেন, বাংলাদেশে মিনিকেট নামে ধানের কোনো জাত নেই। বাজারে প্রচলিত ‘মিনিকেট’ কোনো স্বীকৃত ধানের জাত নয়; বরং বিভিন্ন জাতের ধান প্রক্রিয়াজাত করে ভিন্ন নামে বিক্রি করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ সিড অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কৃষিবিদ মোহাম্মদ মাসুম বলেন, সরকারি কোনো সংস্থা মিনিকেট ধানের কোনো জাত উদ্ভাবন করেনি। বেসরকারিভাবেও উদ্ভাবিত হয়নি। দেশের বাইরে থেকেও এই নামে ধান আমদানি হয়নি। যে চাল কিনতে পাওয়া যায়, তা শুধুই মিল মালিকদের প্রতারণা।
নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বাজারে দাপট: মিনিকেটের নামে প্রতারণা ঠেকাতে ২০২৩ সালের ১১ জুলাই তৎকালীন সরকার একটি আইন প্রণয়ন করে। এই আইনে চালের বস্তার গায়ে ‘মিনিকেট’ বা ভিন্ন নাম লিখলে ২ বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়। আইনটি প্রণয়নের প্রায় ৩ বছর হলেও বাজারে মিনিকেটের রমরমা ব্যবসা বন্ধ হয়নি। শুক্রবার রাজধানীর পাইকারি আড়ত বাদামতলী ও কাওরান বাজার ঘুরে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া ও শেরপুরের বিভিন্ন কোম্পানির মিনিকেট চাল বিক্রি করতে দেখা গেছে। যা পাইকারি পর্যায়ে ৭০-৮৫ টাকা এবং খুচরায় ৮০-৮৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
এ বিষয়ে তদারকি সংস্থা জাতীয় ভোক্তা অধিদপ্তরের পরিচালক পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ২০২৩ সালে আইন হওয়ার পর বাজারে চিরুনি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল। তখন বাজারে মিলাররা নাম পরিবর্তন করে বিক্রিও শুরু করেছিল। তবে বিভিন্ন পণ্যের মূল্য সহনীয় রাখতে গিয়ে এক্ষেত্রে তদারকি কিছুটা কমেছে। যে কারণে বাজারে মিনিকেট নামেই বিক্রি হচ্ছে। তবে অভিযান থেমে নেই। সামনে আবারও কঠোরভাবে তদারকি করা হবে।
কালের কণ্ঠ
‘সাড়ে ৫ বছরে ৪৭ মণের বেশি সোনা জব্দ’-এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রথশ পাতার খবর। প্রতিবেদনে বলা হয়, দুবাই থেকে চট্টগ্রাম হয়ে গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ল্যান্ড করে বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-১৪৮ ফ্লাইট। ওই ফ্লাইট থেকে প্রায় ১৮ কেজি ৭২০ গ্রাম স্বর্ণের (১৬০টি বার) চোরাচালান জব্দ করে গোয়েন্দা সংস্থা, শুল্ক গোয়েন্দা, এভসেক ও কাস্টমস মিলে একটি যৌথ দল।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে এভসেকের সহায়তায় বিমানের কার্গো হোল্ডে তল্লাশি চালিয়ে বিশেষভাবে লুকিয়ে রাখা এসব স্বর্ণ জব্দ করা হয়। তবে এ ঘটনায় এখনো কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। জব্দ করা স্বর্ণের আনুমানিক বাজারমূল্য ৪৫ কোটি টাকা। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, ১৮ কেজি স্বর্ণ জব্দ শুধু একটি ঘটনা নয়, মূলত এভাবে আন্তর্জাতিক স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের অন্যতম প্রধান রুট হয়ে উঠেছে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এর আগে গত ১১ জুন চোরাচালানের প্রায় ৬০০ গ্রাম স্বর্ণালংকারসহ ছয়জনকে আটক করে এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)। এপিবিএন জানায়, আটক ব্যক্তিরা ‘চোরাচালান চক্রের সদস্য’, তাঁরা ওই চক্রের ‘রিসিভার’ হিসেবে কাজ করতেন। এর আগে গত ২৮ মার্চ চোরাচালানের প্রায় ১৮ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়।
এভাবে গত সাড়ে পাঁচ বছরে প্রায় এক হাজার ৯০২ কেজি (৪৭.৫৫ মণ) চোরাচালানের স্বর্ণ জব্দ করা হয় শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে। জব্দ করা এসব স্বর্ণের দাম বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের গতকাল শুক্রবার নির্ধারিত ২২ ক্যারেটের মূল্য ধরে (প্রতি ভরি দুই লাখ ২৮ হাজার ৫৫৬ টাকা) প্রায় তিন হাজার ৭২৮ কোটি টাকা। এ থেকে বোঝা যায়, গত কয়েক বছরে এই বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক স্বর্ণ চোরাকারবারিদের অন্যতম করিডর হয়ে ওঠে। বিশেষ করে দুবাইকেন্দ্রিক স্বর্ণ চোরাচালান চক্রগুলো অভিনব সব উপায়ে সক্রিয় হয়ে ওঠার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও স্বর্ণ চোরাচালানের প্রবেশপথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি), শুল্ক গোয়েন্দা, এপিবিএন এবং অন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর নিয়মিত অভিযানে প্রতি মাসেই দেশজুড়ে ছোট-বড় অসংখ্য সোনার চোরাচালান জব্দ হচ্ছে।
ঢাকা কাস্টম হাউসের তথ্য মতে, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের এ পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ বছরে শতাধিক অভিযানে বিমানবন্দর থেকে এক হাজার ৯০২ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ উদ্ধারের পরও এই রুটে কারবারিরা ঝুঁকি নিয়ে চোরাচালান অব্যাহত রেখেছে। সর্বশেষ ৪৫ কোটি টাকার সোনার চালান জব্দ সেই কথা মনে করিয়ে দেয়। দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বলছেন, আগের তুলনায় নজরদারি অনেক বেড়েছে। সে কারণে চোরাচালানের ঘটনা কমে আসছে।
স্বর্ণ জব্দ ও মামলার পরিসংখ্যান
ঢাকা কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায় ৬৯৮ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫৫৫ কেজি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জব্দ স্বর্ণের পরিমাণ ৪১৭ কেজি এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৬৯ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে। আর চলতি বছরের এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৬৩ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে।
বিমানবন্দর থানার তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে চলতি বছরের এ পর্যন্ত স্বর্ণ চোরাচালানের অভিযোগে ৫৪০টি মামলা করা হয়েছে। তবে অনেক ঘটনায় কেউ গ্রেপ্তার না হওয়ায় বেশির ভাগ মামলার আসামি অজ্ঞাতপরিচয়।
শাহজালাল কেন বিশেষ টার্গেট: স্বর্ণ পাচারের রুট হিসেবে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রগুলো শাহজালাল বিমানবন্দরকে ব্যবহার করছে। বেশির ভাগ চালান আসে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই, পাশাপাশি সৌদি আরব, কাতার, ওমান ও কুয়েত থেকে আসা ফ্লাইটে। চোরাকারবারিরা কখনো যাত্রীর শরীরে, কখনো বিমানের সিট, টয়লেট, বর্জ্য ট্রলি বা কার্গো অংশে স্বর্ণ লুকিয়ে আনে। একের পর এক চালান ধরা পড়ার পরও চক্রটি কেন বারবার এই রুট ব্যবহার করছে, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দৃশ্যত অনেক চালান ধরা পড়লেও হয়তো এর চেয়ে বড় বড় চালান প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে নিরাপদে বের করে নিয়ে যাচ্ছে। এ কারণে বারবার তারা এই বিমানবন্দরকে বেছে নিচ্ছে।
সমকাল
দৈনিক সমকালের প্রধান শিরোনাম ‘গুম প্রতিরোধে আলাদা আইন করছে সরকার’। প্রতিবেদনে বলা হয়, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশ নির্ধারিত সময়ে সংসদে অনুমোদন না করায় কার্যকারিতা হারিয়েছে। এখন সরকার গুমকে গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে আলাদা আইন করার উদ্যোগ নিয়েছে।
এরই মধ্যে আইনটির খসড়া তৈরি করা হয়েছে। গত বুধবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সেই খসড়া নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হয়েছে। এতে বাতিল হওয়া অধ্যাদেশের কিছু বিধানে পরিবর্তনের পাশাপাশি নতুন ধারা যুক্ত করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে। নতুন আইনের খসড়ায় সর্বোচ্চ সাজা অধ্যাদেশের মতোই মৃত্যুদণ্ড রাখা হলেও কারাদণ্ডের বিধানে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এ ছাড়া তদন্তকারী সংস্থার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ছাড়াও বিভিন্ন বাহিনীর প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন। আইনের খসড়া নিয়ে অনেকে তাদের মতামত তুলে ধরেন।
সূত্র জানায়, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনটির খসড়া নিয়ে দুই-তিন দিনের মধ্যে আরেকটি বৈঠক হবে। সেখানে বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, মিশন প্রধান ও উন্নয়ন সহযোগীরা উপস্থিত থাকবেন। তাদের কাছে নতুন আইনের বিষয়ে মতামত জানতে চাওয়া হবে।
খসড়া আইনে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি পাঁচ বছরের বেশি নিখোঁজ থাকলে আদালত থেকে তাঁর পরিবার একটি সনদ নিতে পারবে। সেখানে গুম হিসেবে তাঁকে বিবেচনা করা হবে। ওই ব্যক্তির অবর্তমানে তাঁর উত্তরাধিকারের মধ্যে সম্পদ বণ্টন ও ব্যাংকিং লেনদেন-সংক্রান্ত নথিপত্রে স্বজনরা আইনি সহায়তা পাবেন।
ইত্তেফাক
‘এক যুগে ঝরে পড়েছে অর্ধেক শিক্ষার্থী’-এটি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, নানা কারণে শিক্ষার বিভিন্ন স্তর থেকে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার প্রবণতা বাড়ছে। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, গত এক যুগে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার বেড়ে যাওয়ার ৩টি কারণ সামনে এনেছেন শিক্ষাবিদসহ সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, বাল্যবিবাহের কারণে মেয়ে এবং শ্রমবাজারে ঢুকে পড়ায় ছেলে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার অন্যতম বড় কারণ। আর্থিক অনটনে অনেক পরিবার খরচ মেটাতে না পেরে সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ করে দিয়ে কাজে (শিশুশ্রম) যুক্ত করেছে। করোনা মহামারির কারণে দেশে ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে টানা ৫৪৩ দিন স্কুল-কলেজসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। এই সময়ে জুম বা গুগল মিটের মতো অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে পাঠদান অব্যাহত রাখা হয়। তবে ডিভাইস ও ইন্টারনেটের অভাবে অনেক শিক্ষার্থী ছিল ক্লাসের বাইরে। ২০২১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় খুলে দেওয়া হয়। কিন্তু ঐ সময় অনেক শিক্ষার্থী আর ক্লাসে ফিরে আসেনি।
জানা গেছে, এক যুগের বেশি সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার ঘটনা ঘটছে। তবে গত দুই বছরে এই হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। যার প্রেক্ষিতে চলমান ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুলগুলোতে ৮ লাখ, একাদশ-দ্বাদশে ২৬ লাখ ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ১১ লাখ আসন ফাঁকা রয়েছে। দুই বছর আগে এসএসসি পাশ করেও এবার এইচএসসি পরীক্ষায় নেই ৪৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ শিক্ষার্থী। গত নভেম্বরে প্রকাশিত ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো পরিচালিত বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫ অনুযায়ী, প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করা ৮৪ শতাংশ শিক্ষার্থীর মধ্যে শেষ পর্যন্ত মাত্র ৪৪ শতাংশ শিক্ষার্থী দশম শ্রেণি পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম হয়। বাকি ৫৬ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। যদিও শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখী করা ও ধরে রাখার জন্য সরকার প্রতি বছর উপবৃত্তি, বিনা মূল্যে বই, খাবার দেওয়াসহ অন্যান্য খাতে হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে। এরপরও বিভিন্ন পর্যায়ে এত অধিকসংখ্যক শিক্ষার্থী কেন ঝরে পড়ছে—এ প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।
এসএসসি পাশ করেও একাদশে ভর্তি হয়নি ১ লাখ ৮০ হাজার: আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, ২০২৪ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাশ করেছিল ১৬ লাখ ৭২ হাজার ১৫৩ জন শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ভর্তি হয়েছিল ১৪ লাখ ৯১ হাজার ৯৩২ জন। অর্থাত্ এসএসসি পাশ করেও ১ লাখ ৮০ হাজার ২২১ জন শিক্ষার্থী উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হয়নি। আর উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি ও রেজিস্ট্রেশন করেও পরীক্ষায় অংশ নিতে চূড়ান্ত ফরম পূরণ করেনি ৫ লাখ ৪৩ হাজার ৯৮৯ জন শিক্ষার্থী। গত বৃহস্পতিবার এইচএসসি পরীক্ষার প্রথম দিন অনুপস্থিত ছিল ২৪ হাজার ৭৮৪ জন ছাত্র-ছাত্রী। সব মিলিয়ে গত দুই বছরে ৭ লাখ ৪৮ হাজার ৯৯৪ শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। অর্থাত্ ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর হার ৪৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
সংসার সামলিয়ে প্রভাতির পড়াশোনা করার ইচ্ছা নেই: নূর ইয়াসমিন হিরা রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা। তিন বছর আগে একমাত্র মেয়ে প্রভাতির বিয়ে দেন তিনি। প্রভাতির বয়স তখন ১৯ বছর। এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলেন। বিয়ের পর প্রভাতির আর পড়াশোনা হয়নি। এখন এক সন্তানের মা তিনি। নূর ইয়াসমিন হিরা বলেন, তিনি চাইতেন মেয়ে পড়াশোনা করুক। জামাতারও সেই ইচ্ছা ছিল। দুজনে মিলে প্রভাতিকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু সংসার সামলিয়ে প্রভাতির পড়াশোনা করার ইচ্ছা নেই।
নয়া দিগন্ত
দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রধান শিরোনাম ‘খামেনির বিদায়ে কোটি মানুষের শ্রদ্ধা’। খবরে বলা হয়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরাইলি যৌথ বিমান হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির সাত দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। মৃত্যুর দীর্ঘ চার মাস পর আয়োজিত এই বিদায় অনুষ্ঠানকে দেশটির কর্মকর্তারা ‘শতাব্দীর সবচেয়ে বড় দাফন কার্যক্রম’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদে তার লাশ রাখার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই বিশাল কর্মযজ্ঞে অংশ নিতে বিশ্বের প্রায় শতাধিক দেশের প্রতিনিধিদল এবং লাখ লাখ শোকাতুর মানুষ এখন ইরানে অবস্থান করছেন।
ইরানি কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, সপ্তাহব্যাপী এই রাষ্ট্রীয় বিদায় অনুষ্ঠানে প্রায় দেড় থেকে দুই কোটি মানুষের সমাগম হতে পারে। এ কারণে দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় লজিস্টিক ও নিরাপত্তা প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। পুরো আয়োজনের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) তেহরানভিত্তিক শাখা ‘মোহাম্মদ রাসূলুল্লাহ কোর’।
কঠোর নিরাপত্তা ও লজিস্টিক প্রস্তুতি
তীব্র দাবদাহ ও গরমের মাঝেই তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লা চত্বরকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেয়া হয়েছে। মূল প্রবেশদ্বারগুলোতে সশস্ত্রবাহিনীর চৌকস দল মোতায়েন রয়েছে। বিশেষ পাস ছাড়া কাউকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না। রাজধানীজুড়ে শোকের প্রতীক হিসেবে কালো এবং প্রতিশোধের বার্তাসংবলিত লাল ও সবুজ রঙের বিশাল ব্যানার টাঙানো হয়েছে। আজ শনিবার তেহরানের তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে যাওয়ার পূর্বাভাস থাকায় আগত মানুষের তৃষ্ণা মেটাতে শত শত ট্রাক ভর্তি পানির বোতল সরবরাহ করা হচ্ছে। এ ছাড়া শোকাকুল মানুষের সুবিধার্থে ১০ লাখের বেশি আবাসনব্যবস্থা এবং হাজারো সেবাকেন্দ্র (মাওকিব) স্থাপন করা হয়েছে।
৭ দিনের সূচি ও দাফনপ্রক্রিয়া
ঘোষিত সূচি অনুযায়ী, ৪ ও ৫ জুলাই (শনিবার ও রোববার) তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য খামেনির লাশ রাখা হবে। আইআরজিসির কমান্ডার হাসান হাসানজাদেহ জানান, লাশ একটি উঁচু মঞ্চে রাখা হয়েছে যাতে দর্শনার্থীরা দ্রুত শ্রদ্ধা জানিয়ে চলে যেতে পারেন। ৬ ও ৭ জুলাই (সোমবার ও মঙ্গলবার) কফিন নিয়ে তেহরানে বিশেষ শোকমিছিল হবে এবং এরপর তা শিয়া ইসলামের প্রধান শিক্ষাকেন্দ্র পবিত্র কোম শহরে নেয়া হবে। সেখানে জামকারান মসজিদে জানাজা শেষে ৮ জুলাই (বুধবার) লাশ বিশেষ বিমানে ইরাকের নাজাফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পাঠানো হবে। শিয়া সম্প্রদায়ের অন্যতম পবিত্র স্থান নাজাফ ও কারবালায় জনসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদন ও বিশেষ ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে ৯ জুলাই (বৃহস্পতিবার) লাশ আবার ইরানে ফিরিয়ে আনা হবে। সেদিন খামেনির জন্মশহর মাশহাদের ঐতিহ্যবাহী ইমাম রেজার মাজারের পাশে তাকে সমাহিত করা হবে। দাফনের পর দেশজুড়ে আরো ৪০ দিনের শোক কর্মসূচি চলবে।
বিশ্বনেতাদের উপস্থিতি ও ভূরাজনীতি
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, বিশ্বের প্রায় ১০০টি দেশের সরকারি প্রতিনিধিদল, পার্লামেন্ট স্পিকার এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এই শেষকৃত্যে অংশ নিচ্ছেন। যার মধ্যে অন্তত আটজন সরকারপ্রধান এবং ১২টি দেশের পার্লামেন্ট স্পিকার রয়েছেন। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদও এই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ইতোমধ্যে তেহরানে পৌঁছেছেন। এ ছাড়া প্রায় ৮০০ আন্তর্জাতিক সাংবাদিক এই আয়োজন কাভার করছেন। তবে রাশিয়া, চীন, ভারত ও পাকিস্তানের মতো মিত্র দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকলেও এই তালিকায় সৌদি আরব কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন ও কুয়েতের মতো উপসাগরীয় (গালফ) অঞ্চলের কোনো দেশের প্রতিনিধি দেখা যায়নি। পাশাপাশি, ইরানের ওপর চলমান সামরিক হামলাকে সমর্থন জানানো পশ্চিমা দেশগুলোকে এই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
বণিক বার্তা
‘দেশে উৎপাদনে থাকা গ্যাস ক্ষেত্রের মজুদ নেমে এসেছে ৬ টিসিএফে’-এটি দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, দেশে উৎপাদনে থাকা গ্যাস ক্ষেত্রের সংখ্যা বর্তমানে ২০। এ গ্যাস ক্ষেত্রগুলোতে চলতি বছরের জানুয়ারিতে গ্যাস মজুদ ছিল ৬ হাজার ৩২১ বিলিয়ন কিউবিক ফুট (বিসিএফ) বা ছয় টিসিএফের কিছু বেশি।
তবে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত এ মজুদ ছয় টিসিএফে নেমে এসেছে। গ্যাস মজুদ নিয়ে পেট্রোবাংলার সাম্প্রতিক প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন বিশ্লেষণে এ তথ্য পাওয়া যায়।
উল্লেখ্য, প্রতি মাসে গড়ে উত্তোলন হয় ৫৮ বিসিএফ। তবে পেট্রোবাংলা বলছে, দেশে মজুদ থাকা গ্যাসের পরিমাণ ৭ দশমিক ৬৩ বিসিএফ। এ মজুদের হিসাব ধরা হয়েছে পরিত্যক্ত ও উৎপাদনে নেই এমন গ্যাস ক্ষেত্রের হিসাব ধরে। দেশে পরিত্যক্ত ও উৎপাদনে নেই এমন গ্যাস ক্ষেত্রের সংখ্যা ১০। এসব ক্ষেত্রে মোট ১ হাজার ৩৩৪ বিসিএফ গ্যাসের মজুদ রয়েছে। উত্তোলন ও মামলা-সংক্রান্ত জটিলতায় দীর্ঘদিন ধরে এসব গ্যাস ক্ষেত্রে উৎপাদন জাতীয় গ্রিডে আনা যায়নি।
দেশে স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন এখন বছরে ৭০০ বিসিএফে নেমে এসেছে। সেই হিসাবে বর্তমান মজুদ দিয়ে চলবে মাত্র আট বছর। প্রতি বছর গ্যাসের চাহিদা ও জোগানের যে বড় ব্যবধান তৈরি হচ্ছে, তাতে স্থানীয় গ্যাসের মজুদ বড় আকারে বাড়ানো না গেলে বিদ্যুৎ খাত থেকে শুরু করে শিল্প-কারখানা, নতুন বিনিয়োগ বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তাদের ভাষ্য, স্থানীয় গ্যাস খাতের আজকের এ দুর্দশা একদিনের নয়, বরং দশকের পর দশক ধরে তৈরি হয়েছে। এ সংকটের পেছনে যেমন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোর ব্যর্থতা রয়েছে, তেমনি আমদানি নীতি থেকে শুরু করে অনেক ভুল সিদ্ধান্তও ভূমিকা রেখেছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি), পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের শীর্ষ পদে কাজ করেছেন সাবেক আমলা মকবুল ই ইলাহী চৌধুরী। আশির দশক থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন সংস্থার শীর্ষ পদে কাজ করার পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারের সময়ে জ্বালানি নীতির অনেক পরিকল্পনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। বণিক বার্তাকে মকবুল ই ইলাহী চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশের তেল, গ্যাস, কয়লা নিয়ে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকে শুরু করে ১৯৮০-৮১ সাল পর্যন্ত জোরালো একটা উদ্যোগ দেখা গিয়েছিল। ১৯৯৩-৯৫ সালে এনার্জি পলিসিও করা হয়। এ পলিসির মূল লক্ষ্য ছিল স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধি ও স্বনির্ভরতা তৈরি করা। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এ উদ্যোগ গতি পায়নি।’
স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ কেন গতি পায়নি তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘নব্বইয়ের দশকে দেশের শিল্পে বড় আকারে গ্যাসের ব্যবহার ছিল না। অন্যদিকে একটা ধারণা ছিল যে আমাদের প্রচুর গ্যাস আছে। কিন্তু অনুসন্ধান যে গতিতে হওয়ার দরকার ছিল তা হয়নি।’
দেশে গ্যাসের বর্তমান যে মজুদ রয়েছে সেখানে চারটি বড় গ্যাস ক্ষেত্র বাদে বাকিগুলোর মজুদ যৎসামান্য। এর মধ্যে দেশের সবচেয়ে বেশি পরিমাণ গ্যাস উৎপাদনে থাকা ক্ষেত্রটি হচ্ছে বিবিয়ানা (মার্কিন কোম্পানি শেভরন পরিচালিত গ্যাস ক্ষেত্র)। হাইড্রোকার্বন ইউনিট তথ্যমতে, এ গ্যাস ক্ষেত্রে টুপি রিজার্ভ (গ্যাস মজুদের প্রাথমিক সমীক্ষা) মজুদ ছিল ৫ হাজার ৭৫৫ বিসিএফ। যদিও পেট্রোবাংলা বিবিয়ানায় টুপি রিজার্ভ দেখিয়েছিল ৭ হাজার ৬৬৬ বিসিএফ।
নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, শেভরন তাদের বিবিয়ানা গ্যাস ফিল্ডে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কূপগুলোতে কাজ করে যাচ্ছে। যে কারণে তাদের রিজার্ভ বাড়ছে। তার প্রতিফলনও দেখা যাচ্ছে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার তথ্য-উপাত্তে।
আজকের পত্রিকা
দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ‘পদ্মা রেললাইনে চুরির উৎসব’। খবরে বলা হয়, ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে যশোর পর্যন্ত নির্মিত ২৩৬ কিলোমিটার নতুন রেললাইন দেশের অন্যতম বৃহৎ রেল অবকাঠামো প্রকল্প। প্রায় ৩৮ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত হয়েছে এই প্রকল্প। জনবলসংকট, সীমিত ট্রেন চলাচল এবং যথেষ্ট নিরাপত্তা না থাকার সুযোগে ব্যয়বহুল এ রেলপথের বিভিন্ন স্থাপনা ও যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে যাচ্ছে। এতে একদিকে যেমন রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে বিঘ্নিত হচ্ছে ট্রেন চলাচলের নিরাপত্তা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নতুন রেললাইন থেকে প্রায় ৯৩ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ রেল অবকাঠামোর অংশ ও যন্ত্রাংশ চুরি হয়েছে। সম্প্রতি পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কনস্ট্রাকশন সুপারভিশন কনসালট্যান্ট (সিএসসি) এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়েকে একটি বিস্তারিত চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে পুরো প্রকল্প করিডরজুড়ে নিয়মিত চুরি ও নাশকতার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে, চুরি হওয়া সরঞ্জামের মধ্যে রেললাইন-সংশ্লিষ্ট ৪২ ধরনের সামগ্রী রয়েছে। এ ছাড়া সেতু, কালভার্ট, আন্ডারপাস ও ভায়াডাক্ট থেকে ৮ ধরনের; স্টেশন, ভবন ও গেট থেকে ১৩ ধরনের; বৈদ্যুতিক ১৬ ধরনের এবং সিগন্যাল ও টেলিযোগাযোগব্যবস্থার ১৪ ধরনের সরঞ্জাম চুরি হয়েছে।
চুরি হওয়া সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে গার্ড রেলের স্ক্রু স্পাইক, ফিশ বোল্ট, ইলাস্টিক রেল ক্লিপ, ফিশ প্লেট, টার্ন আউট বোল্ট, গেজ প্লেট, বাফারের বিভিন্ন অংশসহ লাইনের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ। সেতু ও আন্ডারপাসের চুরি হওয়া সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে স্টিল গ্রেটিং প্লেট, হ্যান্ডরেল, রেলিং, জয়েন্ট প্লেট ও ট্র্যানজিশন পাইপ।
স্টেশন ও ভবনের বিভিন্ন স্থাপনা থেকে পাম্প হাউসের মোটর, পানির মিটার, দরজার লকিং সিস্টেম, জানালার কাচ, গ্রিল, ম্যানহোল কভার, টয়লেটের স্যানিটারি ফিটিংস, পানির কল ও ফ্যান চুরি হয়েছে। আরও চুরি হচ্ছে বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার কেব্ল, ডিস্ট্রিবিউশন বোর্ড, মোটর কন্ট্রোল বক্স, সাবমারসিবল পাম্প এবং সিগন্যাল ব্যবস্থার কেব্ল, ট্র্যাক ট্রান্সফরমার, অ্যাক্সেল কাউন্টার, পয়েন্ট মেশিন ও পয়েন্ট মোটরের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র বা যন্ত্রাংশ।
রেলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সিগন্যাল সরঞ্জাম ও তার চুরির কারণে ঝকঝকে নতুন এই লাইনের কম্পিউটারভিত্তিক সিগন্যাল ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ট্রেন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এটি ট্রেন পরিচালনায় ঝুঁকি তৈরি করছে এবং দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।
মাদারীপুরের শিবচর রেলওয়ে স্টেশন সূত্র আজকের পত্রিকাকে জানান, গত ১৯ জুন রাতে স্টেশনের সিগন্যাল পয়েন্টের কয়েকটি ট্র্যাক পট (ট্র্যাক সার্কিটের যন্ত্রাংশ) খুলে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এর মাত্র কয়েক দিন আগে, ৯ জুন একই স্টেশনের শিবচর প্রান্তের সিগন্যাল পয়েন্টের সবগুলো ট্র্যাক পট চুরি হয়। এরও আগে গত ১৮ মার্চ স্টেশনটির ট্র্যাক পট খুলে নিয়ে যায় চোরেরা।
শিবচর রেলওয়ে স্টেশনের কর্মকর্তারা জানান, যন্ত্রাংশ চুরি হলে সংশ্লিষ্ট ব্লক ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে এবং ট্রেন পরিচালনায় জটিলতা সৃষ্টি হয়। এতে ট্রেন চলাচলে সময় বেশি লাগছে। দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়ছে। দুর্ঘটনা এড়িয়ে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে রেলওয়ের কর্মীদের ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ‘লুক স্টিক’ ব্যবহার করে পেপার লাইন ক্লিয়ার কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। ট্রেন চলাচলের সময় রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে দায়িত্ব পালন করতে হওয়ায় প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন তাঁরা।
দেশ রূপান্তর
‘সাশ্রয়ী এলএনজি ছেড়ে কেন এলপিজি’-এটি দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, গৃহস্থালিতে পাইপলাইনের গ্যাস সরবরাহ নিয়ে বিশ্ব এক দিকে হাঁটলেও বাংলাদেশ যাচ্ছে উল্টোপথে। সরকারের তরফ থেকে বারবার সারা বিশ্বে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ সংকুচিত হয়ে আসার কথা বলা হলেও পরিসংখ্যান বলছে অন্য কথা। শহর এলাকায় গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে এখনো পাইপলাইনকেই সবচেয়ে সস্তা ও নিরাপদ মনে করছে বিভিন্ন দেশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলপিজির পরিবর্তে এলএনজি আমদানি করে শহর এলাকায় পাইপলাইনে সরবরাহ বাড়ালে বছরে এক বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় সম্ভব।
প্রতিবেশী দেশ ভারতে বাড়ছে পাইপলাইনের গ্যাস সরবরাহের নেটওয়ার্ক। জাপানের শহর এলাকার বড় অংশে পাইপলাইনেই গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাস ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশ পাইপলাইনের গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। তবে বাংলাদেশে এলএনজির আওতা কমে আসার শঙ্কার পাশাপাশি বাড়ছে এলপিজি-নির্ভরতা। বেসরকারি খাতের একতরফা নিয়ন্ত্রণ থাকায় এলপিজির দামে নাগাল পরানোও কঠিন হয়ে পড়ছে।
দেশে তিতাস গ্যাসের প্রথম গৃহস্থালি গ্রাহক ছিলেন কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমান। মুক্তিযুদ্ধের তিন বছর আগে ১৯৬৮ সালে শওকত ওসমানের ঢাকার বাড়িতে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়। এখন দেশের সবগুলো গ্যাস বিতরণ কোম্পানি মিলিয়ে দেশে গৃহস্থালির গ্রাহক সংখ্যা ৩৬ লাখ ৫৬ হাজার।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর গৃহস্থালি আয় ও ব্যয় জরিপ ২০২২ অনুযায়ী দেশের শহরাঞ্চলে ৩০ থেকে ৪০ ভাগ মানুষ বসবাস করে। দেশের মোট সাড়ে তিন কোটি পরিবারের মধ্যে শহরাঞ্চলের পরিবারের সংখ্যা এক কোটি ৩০ লাখ থেকে এক কোটি ৪০ লাখ। অথচ পাইপলাইনের গ্যাসের গ্রাহক হিসাবে এক কোটির বেশি পরিবার সরকারি সেবার বাইরে রয়েছেন। শহরের যে ৩৬ লাখ ৫৬ হাজার পরিবারের ঘরে গ্যাস রয়েছে তাও সরকার পর্যায়ক্রমে কেটে দিতে চায়। শহরাঞ্চলের পরিবারগুলোর মধ্যে ২৬ ভাগ পাইপলাইনের গ্যাস ব্যবহার করছে। সারা দেশের হিসাবে এর পরিমাণ ১০ দশমিক ৫ ভাগের বেশি নয়।
এলপিজি এবং এলএনজি কী: এলপিজি হচ্ছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস। জ্বালানি তেল পরিশোধনের সময় প্রপেন ও বিউটেন দুটি উপজাত বের হয়। নির্দিষ্ট পরিমাপে এই দুটি উপজাতের মিশ্রণে তৈরি করা হয় এলপিজি। সিলিন্ডারে ভরে এই গ্যাস রান্নার কাজে ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে খনি থেকে সরাসরি উত্তোলিত গ্যাসকে বিশেষ রেফ্রিজারেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে মাইনাস ১৬২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ঠা-া করা হয়। এই তাপমাত্রায় গ্যাস তরলে পরিণত হয়, যা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি নামে পরিচিত। তরল করার কারণে গ্যাসের আয়তন কমে আসে। ফলে পরিবহন সহজ হয়। সমুদ্রপথে জাহাজে করে এনে আবার গ্যাসে রূপান্তর করে পাইপলাইনে সরবরাহ করা হয়। দেশের বড় শহরগুলোতে পাইপলাইন থাকায় এলএনজি আমদানি করেই সরবরাহ করা সম্ভব। অন্যদিকে এলপিজি আমদানি করা হলে সিলিন্ডারে ভরে গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে বাড়তি খরচ হয়।
বাংলাদেশ প্রতিদিন
দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রধান শিরোপনাম ‘শনির দশা কাটছে না’। খবরে বলা হয়, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা, রপ্তানিতে ধীরগতি, ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতা ও অর্থ পাচার-সব মিলিয়ে যেন অর্থনীতিতে শনির দশা কাটছেই না। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, এসব সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি), ঢাকা চেম্বারসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে বিনিয়োগের গতি স্পষ্টভাবেই কমে গেছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ব্যয় কমে যাওয়া এবং মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি হ্রাস পাওয়াও বিনিয়োগ কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। রপ্তানি খাতেও ধাক্কা লেগেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি করে আয় হয়েছে ৪ হাজার ৮০০ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। আর সরকার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল, তার চেয়েও প্রায় ১৩ শতাংশ কম হয়েছে রপ্তানি আয়। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ছে। এর মধ্যে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় আমদানি খরচ বেড়েছে। শিল্পকারখানার জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির দাম বেড়ে যাওয়ায় নতুন বিনিয়োগ আরও নিরুৎসাহ হচ্ছে। এ সংকটের মধ্যেই বাড়ছে অর্থ পাচারের প্রবণতা। সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বেড়ে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঙ্কে দাঁড়িয়েছে, যা এক বছরে প্রায় ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি।
বিশ্লেষকদের মতে হুন্ডি ও বাণিজ্যে কারসাজির মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে। ভারত, মালয়েশিয়া, দুবাইসহ বিভিন্ন দেশে সম্পদ কেনায় এ অর্থ ব্যবহার হচ্ছে। এতে দেশে বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় পুঁজি কমে যাচ্ছে।
এদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, জিডিপির সঙ্গে মোট বিনিয়োগের অনুপাত কমে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ২৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরে বিনিয়োগ কমেছে শূন্য দশমিক ৬১ শতাংশ পয়েন্ট। এ ছাড়া চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে দেশে নিট এফডিআই (বিদেশি বিনিয়োগ) এসেছে ১১৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৪৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার। অর্থাৎ কমেছে প্রায় ২৯ কোটি ডলার বা ২০ দশমিক ২২ শতাংশ। যদিও আগের অর্থবছরে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও এফডিআই কিছুটা বেড়েছিল, বর্তমানে বিনিয়োগকারীরা আরও সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। জ্বালানিসংকট, অনুমোদন পেতে দীর্ঘ সময় এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা এ ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেছেন, ‘বিদেশি বিনিয়োগ আনতে সবচেয়ে বড় সমস্যা জ্বালানি, বিশেষ করে গ্যাস। গ্যাসের স্বল্পতার কারণে সবচেয়ে বেশি ভুগছে আমাদের ফ্যাক্টরিগুলো। দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সমস্যার তালিকা প্রায় একই-জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও প্রশাসনিক জটিলতা।’ সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বিনিয়োগ না বাড়লে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য কাগজে কলমে থাকলেও বাস্তবে অর্জন করা কঠিন হবে। কারণ প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তিই হলো বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্প সম্প্রসারণ। আর মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে, অভ্যন্তরীণ চাহিদা দুর্বল হচ্ছে। চাহিদা না বাড়লে বিনিয়োগের আগ্রহও স্বাভাবিকভাবে কমে যায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘শুধু বাজেট প্রণয়ন দিয়ে এ পরিস্থিতির সমাধান হবে না। আমাদের প্রয়োজন নীতিগত স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, সহজ করব্যবস্থা এবং জ্বালানি খাতে দ্রুত ও কার্যকর সমাধান। এগুলো নিশ্চিত করতে পারলে অর্থনীতি আবার গতি ফিরে পেতে পারে, না হলে এ চাপ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।’ অন্যদিকে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ দ্রুত বাড়ছে। সিপিডির তথ্যানুযায়ী, ২০২০ সালে যেখানে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ ছিল ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার, তা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে। ফলে রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। এদিকে মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ২০২১ সালে মূল্যস্ফীতির এ ঊর্ধ্বগতি শুরু হয়। বাজারে চাল, ডাল, আটা, ময়দা, তেল, শাকসবজি, মাংস সব নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ চরম চাপে রয়েছে। জ্বালানি তেলের দামও সম্প্রতি দুই দফায় বাড়ানো হয়েছে। অকটেন ও পেট্রোলের পাশাপাশি এলপিজি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির কারণে আবারও মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে, যা অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে। এ ছাড়া ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতি পূরণে সরকারকে দেশি ও বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নিতে হবে। এর মধ্যে দেশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি এবং বিদেশ থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বাজেট ব্যয়ের সবচেয়ে বড় খাত হয়ে উঠেছে ঋণের সুদ পরিশোধ ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ উন্নয়ন ব্যয়ের তুলনায় সুদ পরিশোধেই বড় অংশ চলে যাচ্ছে। অন্যদিকে অনেক আমানতকারীর ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে না পারার অভিযোগও সামনে আসছে, যা আর্থিক খাতের আস্থায় প্রভাব ফেলছে। সব মিলিয়ে অর্থনীতির সামনে এখন জটিল সমীকরণ। একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অন্যদিকে কমে যাওয়া বিনিয়োগ, ঋণের চাপ, রপ্তানিতে ধীরগতি ও অর্থ পাচার-সবকিছু মিলে প্রবৃদ্ধির পথ কঠিন হয়ে উঠেছে।
