কেন অংশ নেয়নি ৩৬ শতাংশ পরীক্ষার্থী

এইচএসসি পরীক্ষা

কেন অংশ নেয়নি ৩৬ শতাংশ পরীক্ষার্থী

ফন্ট সাইজ:

হাসিবুল হাসানের বাড়ি নীলফামারী জেলার ডোমার উপজেলায়। মানবিক বিভাগের এই শিক্ষার্থী একাদশে ভর্তিও হয়েছিল। কিন্তু হাসিবুল আর লেখাপড়া চালিয়ে যায়নি। বর্তমানে সে সরকারি কারিগরি প্রতিষ্ঠানে ইলেকট্রিকের ওপর ট্রেনিং নিচ্ছে। লক্ষ্য বিদেশ যাওয়া। হাসিবুল বলেন, পড়ালেখা ভালো লাগে না। আর এইচএসসি পাস করেই কী হবে? আমার বড় ভাই অনার্স শেষ করে বেকার বসে আছে। আমি এই সময়ে ড্রাইভিংও শিখেছি। মাঝে-মধ্যে গাড়ি চালানোর সুযোগ পাই। এতেই আমি মাসে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা আয় করতেছি। বয়স না হওয়ার কারণে লাইসেন্স করতে পারছি না। লাইসেন্স হলে চাকরিও হয়ে যাবে। ওই তরুণের ভাষ্য, এইচএসসি পরীক্ষা দেয়া থেকে আমি টেকনিক্যাল ট্রেনিংয়ে বেশি মনোযোগ দিয়েছি।

হাসিবুল মির্জাগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী। পরীক্ষার জন্য সে রেজিস্ট্রেশন করেনি। তারা একসঙ্গে ৫৪ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিল। ছাত্রী ১৬ জন। তার মধ্যে পরীক্ষা দিচ্ছেন ৩২ জন। ছাত্রী ৯ জনের বিয়ে হয়ে গেছে। ৮ জন পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না। আর একজন বিয়ের পরও বসেছে পরীক্ষায়। সাদিয়া জাহান নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, এখানে এসএসসির পর বিয়ে হওয়া খুবই স্বাভাবিক। ১৮ বছর না হলেও নিয়মিত বিয়ে হয়। তার ভাষ্যমতে, এই সময়ে ছাত্রীরাও মানসিকভাবে বিয়ের জন্য প্রস্তুতি নেয়। সে কেন পরীক্ষা দিচ্ছেন না জানতে চাইলে বলে, আমার বিয়ে হয়েছে প্রায় ছয় মাস আগে। এই সময়ে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পারি নাই। ইচ্ছাও ছিল না। পরীক্ষা দিলে ফেল করার সম্ভাবনা রয়েছে। আবার পরিবারেরও খুব একটা আগ্রহ নাই।

পরীক্ষা না দেয়া এমন ছয়জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হয়। তারা প্রত্যেকেই গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থী। তাদের কথায় শিখন ঘাটতি স্পষ্ট। এই ব্যাচটির এসএসসি পরীক্ষা হয় ২০২৪ সালে। আওয়ামী আমলে নিয়মে পরিণত হওয়া গণহারে পাস করেছে তারা। কিন্তু এরপর থেকে পরীক্ষাগুলোতে কমতে থাকে ফল। যার কারণে অনেকেই পরীক্ষা দেয়ার সাহস করে উঠতে পারেননি। এ ছাড়াও এই শিক্ষার্থীরা করোনাকালে ২০২০ সালে ৬ষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। যার কারণে উঠতি বয়সে তাদের শিক্ষায় ব্যাপক আঘাত লাগে। ফলে তাদের বেসিক জ্ঞানার্জনে দুর্বলতা দেখা দেয়।

গত বৃহস্পতিবার শুরু হয়েছে ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা। তথ্যানুযায়ী, এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাস করে প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধন করেছিল। তবে এবার এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেছেন প্রায় সাড়ে ৯ লাখ শিক্ষার্থী। অর্থাৎ নিয়মিত শিক্ষার্থীদের প্রায় সাড়ে ৫ লাখ, বা ৩৬ শতাংশ, পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না। গত বছর এই হার ছিল ২৯ শতাংশের কিছু বেশি, ফলে এক বছরের ব্যবধানে অনুপস্থিতির হার প্রায় ৭ শতাংশ বেড়েছে। গত বছর নিবন্ধিত সোয়া ৪ লাখের বেশি শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। ইদানিং পাবলিক পরীক্ষায় ফরম পূরণের পরও অনুপস্থিতির প্রবণতা বাড়ছে। গত বছরের এইচএসসি পরীক্ষার প্রথম দিনে ১৯ হাজার ৭৫৯ জন এবং তার আগের বছর ১৫ হাজার ২০৩ জন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল। এবার অনুপস্থিত প্রায় ২৪ হাজার ৭৮৪ জন। অর্থাৎ অনুপস্থিতির হারও বেড়েছে।

বোর্ডভিত্তিক চিত্রও উদ্বেগজনক। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধিত ১১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৬১ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৪৭৭ জন ফরম পূরণ করে। ফলে ৩ লাখ ৯১ হাজার ৯৮৪ জন, অর্থাৎ ৩৩.০৪ শতাংশ, পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে নিবন্ধিত ১ লাখ ৩৯ হাজার ৯২৯ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৭৮ হাজার ২৬৯ জন ফরম পূরণ করেছে, ফলে ৪৪.০৭ শতাংশ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না। সবচেয়ে উদ্বেগজনক অবস্থা কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে। সেখানে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪২ জন নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ৭৫ হাজার ১৯৭ জন ফরম পূরণ করেছেন। অর্থাৎ ৯০ হাজার ৩৪৫ জন বা ৫৪.৫৮ শতাংশ নিয়মিত শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না।
শিক্ষা বিভাগ এখনো এ বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ঝরে পড়ার নির্দিষ্ট কারণ জানাতে পারেনি। তবে গত বছরের এসএসসি পরীক্ষায় অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের নিয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১ হাজার ৩৫০ শিক্ষার্থীর তথ্য পর্যালোচনায় প্রায় ৪১ শতাংশের বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। এ ছাড়া দরিদ্র্য, পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাব এবং এসএসসি পাসের পর কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হওয়াও উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।

লতিফুল ইসলাম গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরের বাসিন্দা। নলডাঙ্গা ডিগ্রি কলেজের এই শিক্ষক বলেন, গ্রামাঞ্চলে বাল্যবিবাহ, কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হওয়ার পূর্বে থেকেই সমস্যা। এগুলো মূলত দরিদ্রতার কারণে হয়ে থাকে। কিছু শিক্ষার্থী থাকে যাদের পরিবার থেকে লেখাপড়ার জন্য চাপ থাকে না। পরিবার লেখাপড়া করলেও কিছু বলে না, না করলেও কিছু বলে না। সাম্প্রতিক সময়ে ফলের যে ধস নেমেছে এই কারণে এই লেবেলের শিক্ষার্থীরা ভীত হয়েছে। তিনি যোগ করেন, নতুন করে মোবাইল গেম কেন্দ্রিক জুয়ার একটা প্রভাব পড়ছে। এটা হয়তো এখনো মহামারি আকার ধারণ করেনি, কিন্তু যেভাবে প্রসার হচ্ছে এটা ভয়ের কারণ হবে। এটা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভবিষ্যতে আরও শিক্ষার্থীর কমে যাওয়া অস্বাভাবিক হবে না।

কারিগরিতে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার বিষয়ে লতিফা সিদ্দিকা নামে এক শিক্ষিকা বলেন, কারিগরিতে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা একটা হতাশায় ভোগে বরাবরই। এখনো বাংলাদেশে নিম্নআয়ের পরিবারের বাচ্চারা পড়তে আসে। যার কারণে টেকনিক্যাল বিষয়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ায় শুরুতেই তাদের আয়ের একটা পথ খুলে যায়। অনেকেই আয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। এই ছোট বয়সেই টাকা হাতে আসায় অনেকেই লেখাপড়ায় মনোযোগ দেয় না। এরফলে, দক্ষতাহীন বা আধা দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে উঠছে। তিনি আরও বলেন, দেশে এখনো ভালো শিক্ষার্থীরা কারিগরিমুখী নয়। কিন্তু এই বিষয়গুলোতে পুরোটাই সায়েন্স। তাই বেইজ ভালো না হওয়ার কারণে অনেক শিক্ষার্থীই ক্যারি করতে পারে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান বলেন, এর পেছনে কারণ কী তা আমাদের অনুসন্ধান করতে হবে। কারণ চিহ্নিত করে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী আনুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ছিটকে পড়বে। অনানুষ্ঠানিক খাতে যুক্ত হওয়ায় আমাদের মানব আর সম্পদ নয় বোঝায় পরিণত হবে।

শিক্ষা গবেষক ড. হামিদ হাসান বলেন, যেহেতু এসএসসি পাস করে ভর্তি হয়েছে। এইচএসসিতে আর পড়ছে না- এটা কিন্তু সমাজের জন্য একটা সিগন্যাল। তারা এসএসসিতে সহজভাবে পাস করেছে বা পাস করিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু এরপর আর পারছে না। এ ছাড়াও ড্রাগ, মোবাইল- অনলাইন আসক্তি, এলাকায় আড্ডাবাজি এসবে আসক্ত হয়ে পড়ছে। পরিচিত অনেকেই উচ্চ শিক্ষা নিয়ে বেকার বসে আছে। এটাও তাদের হতাশ করছে। আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ঠিকভাবে মোটিভেটেড করতে পারছে না। শিক্ষা তো শুধু চাকরি পাওয়ার জন্য না। শিক্ষকরা নিজেদের সুযোগ-সুবিধা বিশেষ করে কোচিং নিয়ে পড়ে আছেন।

এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, ঝরে পড়ার সংখ্যাটা এসএসসি’র পর এইচএসসি বা দাখিলের পর আলিমে। এটার একটা স্বাভাবিক গতি ছিল। অনেক মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়, অনেক ছেলেরা কাজে চলে যায়। এটার একটা সাধারণ মার্জিন (সীমা) সবসময় ছিল। এবার সেটা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। কারণ, শিক্ষার্থীরা বুঝতে পেরেছে যে পরীক্ষা দিতে হলে লেখাপড়া করতেই হবে। অনেকে এবার ঠিকঠাক প্রস্তুতি নিতে পারেনি বিধায় ফরম পূরণ করেনি, পরীক্ষায়ও বসেনি। তিনি আরও বলেন, তারপরও আমরা এটা নিয়ে ভাবছি, বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। ক্লাসরুমে শিক্ষকরা যাতে ভালোভাবে পড়াতে পারেন, মনিটরিং করতে পারেন, সেই কাজটা আমরা বাড়িয়ে দেবো। সিলেবাস, কারিকুলাম ও সময়- সবকিছু আমরা সুন্দরভাবে সাজিয়ে দেবো। যেন আগামীদিনে এমন ভয়াবহ হারে ড্রপ আউট না ঘটে। এ ঝরে পড়াটা আমাদের কাছে লক্ষণীয়। এটা নিয়ে আমরা কাজ করবো।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন