ডিজিটাল কেনাকাটায় নতুন যুগে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। দেশের ডিজিটাল লেনদেনব্যবস্থাকে আরও সহজ, সাশ্রয়ী ও সর্বজনীন করতে ‘বাংলা কিউআর’ (কুইক রেসপন্স) কোড ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে নগদ টাকার ব্যবহার ও টাকা ছাপানোর খরচ কমবে। পাশাপাশি আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। সেই সঙ্গে মানুষের কেনাকাটা, বিল পরিশোধসহ সব ধরনের লেনদেন সহজ হবে। গত ৩০শে জুন ও ১লা জুলাই-এই দুইদিনে এ বাংলা কিউআর কোড ব্যবহার করে ২২ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে।
বাংলা কিউআর কোড চালুর ফলে যেকোনো ব্যাংক, মোবাইলে আর্থিক সেবাদাতা (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকেরা এই কোডের মাধ্যমে সব ধরনের লেনদেন করতে পারছেন। অর্থাৎ যেকোনো ব্যাংক ও এমএফএসের গ্রাহকেরা পণ্য বা সেবা বিক্রেতার এক বাংলা কিউআর কোড দিয়েই অর্থ পরিশোধের সুযোগ পাচ্ছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মেনে ইতিমধ্যে কোড ব্যবহার করা সব ব্যাংক ও এমএফএস তাদের নিজস্ব কিউআর কোড বদলে বাংলা কিউআর কোড চালু করেছে। এতে এক ছাতার নিচে এসেছে ডিজিটাল লেনদেনব্যবস্থা। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বাংলা কিউআর কোড যত জনপ্রিয় হবে, ততই নগদ টাকার ব্যবহার কমে আসবে। এতে ঝুঁকিও অনেকাংশে কমে যাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, পণ্য ও সেবা কিনতে দুইদিনে (গত ৩০শে জুন ও ১লা জুলাই) বাংলা কিউআর কোডে ৭৭ হাজার ১৬৫টি লেনদেন হয়েছে। এতে ২২ কোটি ২ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে।
দেশে কতো কিউআর কোড: ২০২৩ সালের ১৮ই জানুয়ারি রাজধানীর মতিঝিলে একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প হিসেবে ‘বাংলা কিউআর’ চালু হয়। ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশের ৪৬টি ব্যাংক, ৭টি এমএফএস ও ৪টি পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার বাংলা কিউআর সেবায় যুক্ত হয়। তখন পর্যন্ত দেশে ৯ লাখ ৬৩ হাজার মার্চেন্ট বা বিক্রেতা বাংলা কিউআর ব্যবহার শুরু করে। ২০২৫ সালের ১লা নভেম্বর থেকে সব ব্যাংক, পিএসপি (পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার), পিএসও (পেমেন্ট সার্ভিস অপারেটর) ও এমএফএস সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তাৎক্ষণিক আন্তঃলেনদেন শুরু হয়। গত বুধবার থেকে বাধ্যতামূলক প্রথম বাংলা কিউআর চালু করে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশ জুড়ে বিকাশের কিউআর কোডের সংখ্যা প্রায় ৯ লাখ, নগদের সাড়ে ৪ লাখ, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ২ লাখ ৭০ হাজার (রকেটসহ), পূবালী ব্যাংকের ১ লাখ ৯০ হাজার, ইসলামী ব্যাংকের ৮০ হাজার, সোনালী ব্যাংকের ৫৪ হাজার, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ৫০ হাজার, সিটি ব্যাংকের ৩৮ হাজার। এসব কিউআর এখন বাংলা কিউআরে রূপান্তর হয়েছে।
চীন, এস্তোনিয়া, ভারতসহ আরও অনেক দেশ এমন উদ্যোগের মাধ্যমে লেনদেনব্যবস্থাকে ডিজিটাল মাধ্যমে রূপান্তর করেছে। নগদবিহীন (ক্যাশলেস) এই লেনদেনব্যবস্থা হয়েছে সহজ ও স্বচ্ছ। সামনে সরকারি সব ধরনের সেবার আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রেও বাংলা কিউআর বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ইন্টারনেট ব্যবহার ছাড়াই বাংলা কিউআর কোড দিয়ে লেনদেন চালুর পরিকল্পনা নিয়েও কাজ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. এহতেশামুল হক খান বলেন, আমরা আমাদের সব কিউআর কোড বদলে বাংলা কিউআরে রূপান্তর করেছি। এতে সব ব্যাংক ও এমএফএসের গ্রাহক এসব প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল মাধ্যমে লেনদেন করতে পারছেন। এই সুবিধার ফলে গ্রাহকের নগদ টাকা বহনের ঝুঁকি কমে গেছে। পাশাপাশি ভাংতি টাকার প্রয়োজন হচ্ছে না। যেকোনো সময় মানুষ যেকোনো পরিমাণ লেনদেন করতে পারছেন।’
যেভাবে কাজ করছে বাংলা কিউআর: বাংলা কিউআর বা যেকোনো কিউআর কোড হলো- সংশ্লিষ্ট অর্থ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব ও হিসাবধারীর নামসংবলিত একটি সংকেত। এই কোড শুধু যন্ত্রে পাঠযোগ্য। গ্রাহকেরা মোবাইল ফোন থেকে এই কোড স্ক্যান করে সহজে লেনদেন করতে পারেন। দেশের বিভিন্ন ব্যাংক এবং বিকাশ, রকেট ও নগদের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বেশ আগে থেকে নিজস্ব কিউআর কোড দিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে (মার্চেন্ট) অর্থ সংগ্রহের সুযোগ দিয়ে আসছে। নতুন সুবিধার ফলে শপিং মল থেকে শুরু করে ফুটপাথের ব্যবসায়ী পর্যন্ত সর্বত্র একটি অভিন্ন কিউআর কোড ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বাংলা কিউআর কোড ব্যবহারে গ্রাহকের বাড়তি অর্থ খরচ হবে না। ডিজিটাল আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে জড়িত ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে নতুন এই উদ্যোগের ফলে গ্রাহকের দিক থেকে সর্বজনীন ডিজিটাল লেনদেনের সুবিধাটি অনেক বেশি বিস্তৃত হলো।
খুচরা বিক্রেতা তামিম বলেন, আগে বিকাশের অ্যাপে টাকা নিতাম। শুধু বিকাশের গ্রাহকেরা অনলাইনে টাকা দিতেন। এখন বিকাশ থেকে বাংলা কিউআর দিয়েছে। সবাই এখন টাকা দিতে পারবেন। এতে বিক্রি বাড়বে বলে আশা করছেন তিনি।
