গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। অবশেষে তার নিহত হওয়ার চার মাসেরও বেশি সময় পর দেশটিতে তার জন্য কয়েকদিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালন ও শেষ বিদায়ের শোভাযাত্রা শুরু হয়েছে।
বিবিসি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার (৩রা জুলাই) থেকে তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় সাবেক এই আয়াতুল্লাহ’র মরদেহ সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হচ্ছে।
ইরানের স্থানীয় সময় শনিবার সকাল সময় ভোর ৬টায় তেহরানের ইমাম খোমেনি মোসাল্লায় মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে, যেখানে দর্শনার্থীরা রোববার বিকাল পর্যন্ত শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পারবেন। এরপর আগামী বৃহস্পতিবার তার নিজ শহর মাশহাদে তাকে দাফন করা হবে।
ইরানি কর্তৃপক্ষ ধারণা করছে, এই আয়োজনে এক কোটি ২০ লাখ থেকে দুই কোটি মানুষের উপস্থিতি হতে পারে। ইরানে কোনো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের জন্য এর আগে কখনও এত বড় পরিসরে প্রস্তুতি নেয়া হয়নি।
আলি খামেনির হত্যাকাণ্ডের চার মাসেরও বেশি সময় পর এই আনুষ্ঠানিকতা হচ্ছে, যেটিকে ইরানি কর্মকর্তারা ‘শতাব্দীর সেরা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া’- বলে অভিহিত করছেন।
প্রস্তুতির অংশ হিসেবে রয়েছে, শোক জানাতে আসা মানুষদের জন্য হাজারো সেবাকেন্দ্র (মাওকিব)। ১০ লাখের বেশি দর্শনার্থীর থাকার ব্যবস্থা, জনসমাগম নিয়ন্ত্রণের জন্য তেহরানের কেন্দ্রস্থলজুড়ে নির্ধারিত পথ।
বিবিসি বলছে, পুরো কার্যক্রমের নেতৃত্ব দিচ্ছে ইসলামিক রেভুল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) তেহরানভিত্তিক প্রধান প্রাদেশিক ইউনিট মোহাম্মদ রাসূলুল্লাহ কোর।
বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, ইরানি কর্তৃপক্ষ তেহরানের সরকারি ও বেসরকারি অফিসগুলো শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। যান চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে শহরের কেন্দ্রস্থলের বেশির ভাগ অংশে ব্যক্তিগত যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে।
তেহরানের আকাশসীমা শুক্রবার থেকে আংশিকভাবে এবং সোমবার থেকে পুরোপুরি বন্ধ থাকবে।
জানাজা, দাফনসহ অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নিতে তেহরানে আসা রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তালিকা সবচেয়ে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কয়েকজন বিশ্লেষকের মতে, উপস্থিত থাকা ব্যক্তিদের পাশাপাশি কারা আয়োজন থেকে দূরে থাকবেন- সেটিও একই গুরুত্ব বহন করতে পারে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কয়েক ডজন দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, পার্লামেন্টের স্পিকার এবং মন্ত্রীরা অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। প্রায় ৮০০ জন বিদেশি সাংবাদিক এই অনুষ্ঠান কভার করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদও তেহরানে গেছেন খামেনির জানাজায় যোগ দিতে। জানাজার জন্য ইরানি কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে প্রতীক হিসেবে মুষ্টিবদ্ধ হাত আর স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে, আমাদের জেগে উঠতেই হবে।
শনিবার স্থানীয় সময় সকাল ছয়টায় তেহরানের ইমাম খোমেনি মোসাল্লায় ছয়দিনের এই আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। রোববার বিকাল পর্যন্ত সাধারণ মানুষ সেখানে গিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে পারবেন।
মোহাম্মদ রাসূলুল্লাহ কোরের কমান্ডার হাসান হাসানজাদেহ জানান, খামেনির কফিন একটি উঁচু মঞ্চে রাখা হবে। দর্শনার্থীদের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে যাতে প্রত্যেকে ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষ করে বের হতে পারেন।
মঙ্গলবার তেহরানের দক্ষিণে অবস্থিত কোম শহরে স্থানান্তরিত করা হবে আয়োজন। সেখানে ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থান জামকারান মসজিদে জানাজার নামাজে ইমামতি করবেন শিয়াদের জ্যেষ্ঠ আলেম।
এরপর বুধবার খামেনির মরদেহ ইরাকের নাজাফে নেয়া হবে। অন্ত্যেষ্টিযাত্রার পর কারবালায় ইসলামের খলিফা আলীর (যাকে শিয়া মুসলিমরা তাদের প্রথম ইমাম হিসেবে মানেন) সমাধিস্থলে আনুষ্ঠানিকতা পালন করে মরদেহ আবার ইরানে ফিরিয়ে আনা হবে।
ইরানি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরাকের বিভিন্ন গোষ্ঠীর অনুরোধেই এসব কর্মসূচি রাখা হয়েছে। যদিও শিয়াশাসিত মুসলিম বিশ্বে খামেনির প্রভাব এবং অঞ্চলজুড়ে ইরানের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সম্পর্ক তুলে ধরতেই এসব আয়োজন করা হয়েছে বলে মত কয়েকজন বিশ্লেষকের।
অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি সমন্বয়ের জন্য বাগদাদ সফর করা ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এই আয়োজনের ‘প্রতীকী গুরুত্বের’ কথা উল্লেখ করেছেন।
বৃহস্পতিবার খামেনিকে তার জন্মশহর মাশহাদে দাফন করা হবে। শিয়া ইসলামের অষ্টম ইমামের সমাধিস্থল এবং ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান ইমাম রেজার সমাধিস্থলে তাকে সমাহিত করা হবে, যা প্রতিবছর লাখো মানুষ পরিদর্শন করে।
এরপর সারা দেশে আরও ৪০ দিন শোকানুষ্ঠান চলবে। দাফনের প্রথম বার্ষিকী পর্যন্ত বিভিন্ন স্মরণসভা ও কর্মসূচির পরিকল্পনা রয়েছে। খামেনির শেষকৃত্য এমন এক সময় অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
নিরাপত্তা ঝুঁকিতে বাবার জানাজায় থাকছেন না মোজতবা খামেনি
বাবার মৃত্যুর পর গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নেয়া মোজতবা খামেনি নিরাপত্তার কারণে এই সাতদিনের কোনো অনুষ্ঠানেই সশরীরে উপস্থিত থাকবেন না। ভারতে নিযুক্ত সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি আয়াতুল্লাহ হাকিম ইলাহী এই তথ্য নিশ্চিত করে জানান, ইসরাইলি হামলার হুমকি এবং সার্বক্ষণিক ড্রোন নজরদারির তীব্র ঝুঁকির কারণে নিরাপত্তা বিভাগ মোজতবাকে জনসমক্ষে আসার অনুমতি দিচ্ছে না। ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত নতুন এই নেতাকে একবারও প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।
ইলাহী তার বিবৃতিতে আরও জানান, গত সপ্তাহে ইরান সফরে যাওয়া তার কিছু পরিচিত ব্যক্তি খামেনির সঙ্গে দেখা করেছেন। খামেনি নিজে বাইরে এসে জনগণের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে ভীষণ আগ্রহী হলেও, দেশটির সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দল এই মুহূর্তে তাকে নিয়ে কোনো ধরণের ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না। ফলে কোনো জনসভায় বা জানাজায় তার আসার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
অবশেষে খামেনি হত্যায় বাংলাদেশের নিন্দা
এদিকে অবশেষে আলি খামেনির হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ। গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি নিহত হন আলি খামেনি। সেই সময় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শুধু ‘শোক ও দুঃখ’ প্রকাশ করা হয়। তবে চার মাস পর অবস্থান বদলালো বাংলাদেশ সরকার।
শুক্রবার (৩রা জুলাই) ইরানের রাজধানী তেহরানে দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের সঙ্গে বৈঠক করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। সেখানেই তিনি বাংলাদেশের এই অবস্থান তুলে ধরেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
এনিয়ে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, স্পিকার হাফিজ উদ্দিন ‘মহামান্য’ আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ‘মর্মান্তিক মৃত্যুতে’ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং তার ‘নৃশংস হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা’ জানিয়েছেন।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, স্পিকার হাফিজ উদ্দিন এই জাতীয় শোককালে ইরানের সরকার ও ভ্রাতৃপ্রতিম জনগণের প্রতি বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে সংহতি প্রকাশ করেছেন।
