টরন্টো স্টেডিয়ামে রেফারির শেষ বাঁশি বাজতেই ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর চোখে দেখা গেল অশ্রু। এই অশ্রু কেবলই শেষ ষোলোতে ওঠার স্বস্তির ছিল না, এর পেছনে লুকিয়ে ছিল এক বছরের এক গভীর ক্ষত। ম্যাচ শেষ হতেই পোপের দেয়া বিশেষ উপহারের লাল-সবুজ রিস্টব্যান্ড পরা হাত দিয়ে রোনালদো গায়ে জড়িয়ে নিলেন পর্তুগালের ‘২১’ নম্বর জার্সিটি। এরপর আকাশের দিকে আঙ্গুল উঁচিয়ে স্মরণ করলেন তাদের সাবেক সতীর্থ দিওগো জোতাকে। ঠিক এক বছর আগে, ২০২৫ সালের ৩রা জুলাই স্পেনে এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান লিভারপুলের তৎকালীন ফরোয়ার্ড জোতা ও তার ভাই আন্দ্রে সিলভা। ম্যাচের পর রোনালদো ফক্স স্পোর্টসকে বলেন, ‘ম্যাচের আগেই আমরা জানতাম এটি অত্যন্ত বিশেষ একটি মুহূর্ত হতে যাচ্ছে।
আজ আমরা দলের সবাই বলছিলাম। জীবনের এই কাকতালীয় মিল সত্যিই অবিশ্বাস্য। আমরা শুধু ম্যাচটি জিতিনি, যেভাবে জিতেছি তা আমাদের কাছে অনেক বড় কিছু।’
মাঠের ভেতরে ম্যাচটি ছিল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম রেকর্ড সমৃদ্ধ এক রাত। প্রথমার্ধে ইভান পেরিসিচের গোলে ক্রোয়েশিয়া এগিয়ে গেলে, ৬৮ মিনিটে পেনাল্টি থেকে পর্তুগালকে সমতায় ফেরান অধিনায়ক রোনালদো। ৪১ বছর ১৪৭ দিন বয়সে করা এই গোলটি ছিল বিশ্বকাপের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে নকআউট পর্বে তার প্রথম গোল। এর মাধ্যমে বিশ্বকাপের নকআউট ইতিহাসে সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ গোলদাতার রেকর্ড নিজের করে নেন সিআরসেভেন। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে (বিশ্বকাপ ও ইউরো মিলিয়ে) ২৫টির বেশি গোল করার প্রথম অনন্য রেকর্ডও গড়েন তিনি। ম্যাচটি আরও একটি অনন্য ইতিহাসের সাক্ষী হয়, যেখানে ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথম একই ম্যাচে ৪০ বা তার চেয়ে বেশি বয়সী দু’জন আউটফিল্ড খেলোয়াড় একে অপরের মুখোমুখি হন।
তারা আর কেউ নন, রোনালদো ও লুকা মদরিচ। এ ছাড়া রোনালদো (২৬), মদরিচ (২৩) ও পেরিসিচ (২১)- এই তিন মহাতারকার উপস্থিতিতে এটিই বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম ম্যাচ, যেখানে ২০টির বেশি বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলা তিনজন ফুটবলার একসঙ্গে মাঠে ছিলেন।
অন্যদিকে পর্তুগালের জন্য এটি ছিল ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে প্রথম কামব্যাক জয়। ম্যাচের ৮১ মিনিটে রোনালদো যখন মাঠ ছাড়েন, তখনো খেলা ১-১ সমতায়। ম্যাচের ৯৪ মিনিটে গঞ্জালো রামোসের নাটকীয় গোলে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় পর্তুগাল। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রতি ৩৭ মিনিটে একটি গোল বা অ্যাসিস্ট করা রামোসের এই গোলটি ছিল পর্তুগালের ইতিহাসে দ্বিতীয় সবচেয়ে দেরিতে করা গোল। ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তে, ইয়োস্কা গাভার্দিওলের গোলটি ভিএআর এবং বলের ভেতরের চিপ প্রযুক্তির মাধ্যমে অফসাইডের কারণে বাতিল হলে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয় ক্রোয়েশিয়া। ১০টি গোল এভাবে বাতিল হওয়ায় এই বিশ্বকাপ প্রযুক্তির নতুন মাইলফলক স্পর্শ করলো।
তবে সমস্ত রেকর্ড আর মাঠের রোমাঞ্চকে আক্ষরিক অর্থেই ছাপিয়ে যায় দিওগো জোতার স্মৃতি। ম্যাচ শেষে স্পোর্টস টিভিকে রোনালদো বলেন, ‘আমরা জানি সে আমাদের সঙ্গেই উপস্থিত আছে এবং তাকে সবচেয়ে সুন্দর উপায়ে সম্মান জানাতে আজ জয় ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় ছিল না।’
জয়সূচক গোলদাতা রামোসও ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রতিটি দিনই আমাদের কাছে বিশেষ। কারণ আমরা প্রতিদিন জোতাকে নিয়ে কথা বলি। সে আমাদের শক্তি জোগায়। আজকের এই জয় এবং টুর্নামেন্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপে পৌঁছানো আমাদের জন্য অনেক বড় আবেগের।’
জাতীয় সংগীতের সময় টরন্টোর বড় পর্দায় যখন জোতার গোল উদ্যাপনের সাদা-কালো ছবি ভেসে উঠলো, গ্যালারিতে থাকা জোতার মা-বাবার চোখ তখন অশ্রুসিক্ত। উইঙ্গার রাফায়েল লিয়াও ম্যাচ শেষে সেই আবেগের কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘আবেগের জায়গা থেকে আমরা শুরু থেকেই বিশ্বাস রেখেছিলাম। তবে আমাদের আরও একটি অতিরিক্ত ও গুরুত্বপূর্ণ শক্তি ছিল- দিওগো জোতা। যে সবসময় আমাদের সঙ্গে থাকে এবং আজ আমাদের ম্যাচটি জিততে সাহায্য করেছে।’
জোতার মৃত্যুর পর নিজের পায়ে তার একটি ট্যাটু করানো নেভেস শোনান এক রূপকথার মতো বাস্তবতার গল্প। বলেন, ‘আমি এখনো জোতার সঙ্গে কথা বলি। জোতা ও তার স্ত্রী রুতের সঙ্গে আমাদের যে পুরনো হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপটি ছিল, সেটি এখনো তেমনি আছে। আমরা এখনো সেখানে কথা বলি।’
আগামী সোমবার টেক্সাসের আর্লিংটনে শেষ ১৬-র লড়াইয়ে স্পেনের মুখোমুখি হবে পর্তুগাল। তবে টরন্টোর এই রাতটি ফুটবল ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে মাঠের বাইরের এক অমর বন্ধুত্বের গল্প হিসেবে।
