জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে সংরক্ষিত আসনের বিএনপি’র সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনির মন্তব্যকে ঘিরে তোলপাড় চলছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। মনির এই বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন বিএনপি’র নেতারাও। তবে নিলোফার চৌধুরী মনির দাবি, তার বক্তব্য কাটছাঁট করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে। নিজেকে একজন ‘জুলাইযোদ্ধা’ দাবি করে তিনি বলেন, একটি পক্ষ তার বক্তব্য খণ্ডিতভাবে প্রচার করে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। ’২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর এই সময়ে এমপি মনির এই বক্তব্য দলের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে বলে নেতারা মনে করছেন।
১লা জুলাই বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আই’র ‘টু দ্য পয়েন্ট’ অনুষ্ঠানে আলোচনায় অংশ নেন তিনি। আলোচনার এক পর্যায়ে তিনি বলেন, “এই আন্দোলনে কারা যে মেইন ছিল, তা কেউ জানে না। একজন আরেক জনকে চেনে না। পাশে হাঁটতে গেছে, আন্দোলনে গেছে, পাশের আরেকজন পড়ে গেছে, মনে করছে যে, সে নরমাল পড়েছে, আসলে সে মারা গেছে। গুলিটা সামনে থেকে আসছে না পেছন থেকে আসছে, সেটাও জানে না। গুলির কোনো শব্দ হয় নাই। স্নাইপারের গুলি ছিল, অনেকেই যারা পড়ে গেছে।”
কোনো ষড়যন্ত্র ছিল কিনা উপস্থাপিকার এমন আরেক প্রশ্নের জবাবে মনি বলেন, “ডিজাইন তো অবশ্যই ছিল, তবে ষড়যন্ত্র ছিল কিনা তা জানি না। এটাও সত্যি, শুধু যারা আন্দোলনে ছিল, (আন্দোলন) যে কেবল তাদের হাতেই ছিল তা কিন্তু না। অনেক কিছু না জেনে তারা আবেগে এসেছিল, অন্যায়ের প্রতিবাদে এসেছিল। তারা একজন আরেকজনকে চেনে না।”
জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে নিলোফার চৌধুরী মনির এই বক্তব্য প্রচারের পর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে প্রতিক্রিয়া দেন ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব। বিষয়টি নিয়ে বৃহস্পতিবার রাতে ফেসবুক পোস্টে ছাত্রদল সভাপতি বলেন, নিলোফার চৌধুরী মনি আপা, আপনি দীর্ঘ ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন সংগ্রামের সারথি ছিলেন। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে আপনার অনবদ্য ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু বুধবার টকশোতে জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে আপনার অযাচিত বক্তব্যে আমরা অত্যন্ত মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ। আপনার বক্তব্য আমরা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করলাম।
নিলোফার চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলে পরে রাকিব অবশ্য আরেকটি পোস্ট দেন। সেখানে বক্তব্যের বিষয়ে মনির ব্যাখ্যা তুলে ধরেন রাকিব।
নিলোফার চৌধুরী মনির বক্তব্যের বিষয়ে বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী মানবজমিনকে বলেন, নিলোফার চৌধুরী মনির বক্তব্য অনভিপ্রেত। এটা বলা তার ঠিক হয়নি।
মনির বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে নানা আলোচনা সমালোচনা। জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত ‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ’ আওয়ামী লীগের অনেকে মনির বক্তব্য প্রচার করে নানা ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করছেন। যদিও মনির দাবি তার বক্তব্য খণ্ডিতভাবে উদ্দেশ্যমূলক প্রচার করা হচ্ছে।
তিনি মানবজমিনকে বলেন, আমি তো তাদের (জুলাই গণ-অভ্যুত্থান) পক্ষেই কথা বলেছি। আমি সব সময় তাদের পক্ষেই। আমি একাত্তরের সঙ্গে ’২৪কে মিলাই না। ’২৪-এর শ্রদ্ধা ’২৪-এর জায়গায়। ’৭১-এর শ্রদ্ধা একাত্তরের জায়গায়। এজন্য আমার পেছনে এত শত্রু লাগছে। তিনি বলেন, আমি নিজেই একজন জুলাইযোদ্ধা। আমি দিনে মিছিল ও রাতে টকশো করা মানুষ। আমি বলতে চেয়েছি, এই যে জুলাই নিয়ে ষড়যন্ত্রগুলো-এই নিষ্পাপ ছেলেমেয়েগুলো আন্দোলনের জন্য এসেছিলেন। তারা পুলিশের গুলিতে মারা গেছেন। আমরা সেগুলোর ভিডিও দেখেছি। হেলিকপ্টার থেকে গুলি করে মারা হয়েছে, সেটাও আমরা জানি। অনেক সময় হয়েছে, একটা বাসায় একটি শিশু দাঁড়িয়ে আছে-একটা গুলিতে সেই শিশুটি মারা গেছে! ছাদে মারা গেলেন, মিছিল করছিল, হঠাৎ করে পড়ে গেলেন! কোনো শব্দবিহীন। আমরা এরকম খবরও দেখেছি, আমি এই কথাগুলোই বলতে চেয়েছিলাম যে, স্নাইপারের গুলির তো শব্দ হয় নাই। কিন্তু মিছিল করতে করতে একটা ছেলে পড়ে গেল, পাশের জন মনে করছেন-সে হয়তো বা পড়ে গেছে।
তিনি বলেন, আরেকটা বিষয়, আমি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে ‘ডিজাইন’ বলিনি। জুলাইয়ের বিরুদ্ধে যারা কাজ করেছে, তারা তো একটা ‘ডিজাইন’ করেই করেছে, তাদেরকে যে মেরেছে।
বিএনপি’র এই নারী এমপি বলেন, এই সন্তানরা, আমরা যাদেরকে হারিয়েছি। এদের বিপক্ষে যে ডিজাইনটা হয়েছিল, সেই ডিজাইন করা মানুষগুলোকে আমরা কিন্তু এখনো শনাক্ত করতে পারিনি। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ এবং পুলিশ তো আছেই, কিন্তু এটার পেছনে...। আমি শুধু জানতে চেয়েছি, কারা স্নাইপার নিয়ে আসলো। কেউ উত্তর দেননি। আমি পরের কথায় চলে গিয়েছি। আমি কোনো ইনটেনশনালি কিছু বলিনি। তিনি আরও বলেন, আমি ’২৪কে ধারণ করি। আমি আমার নিজের গায়ে নিজে কি থুথু দিতে পারি।
