স্পেনের প্রতিটি ম্যাচের আগে দর্শকদের জার্সির পেছনে সবচেয়ে বেশি যে নামটি দেখা গেছে, সেটি হলো লামিন ইয়ামাল। লস অ্যানজেলেস স্টেডিয়ামে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে শেষ-৩২-এর ম্যাচে মাঠে আসার সময়ও ক্যামেরার মূল ফোকাস ছিলেন তিনিই। খেলোয়াড়রা মাঠে নামার সময়ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন ইয়ামাল। তবে এই স্পেন দলে সবচেয়ে বড় তারকা না হয়েও এখন পর্যন্ত সবচেয়ে উজ্জ্বল মিকেল ওয়ারজাবাল। ২৯ বছর বয়সী রিয়েল সোসিয়াদের এই ফরোয়ার্ড অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ৩-০ ব্যবধানে জয়ের ম্যাচে দু’টি গোল করেন। তার অসাধারণ নৈপুণ্যেই ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেন ১৬ বছর পর বিশ্বকাপ নকআউট পর্বে প্রথম জয় পেয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করে। গ্রুপ পর্বে সৌদি আরবের বিপক্ষে জোড়া গোল করেছিলেন ওয়ারহাজাল। স্পেনের এই নেপথ্যের নায়ক এক সময় হকি খেলতেন। সেখান থেকেই নাকি গোল করার নেশা পেয়েছে তার।
গত বছরের শুরু থেকে ইউরোপের খেলোয়াড়দের মধ্যে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ওয়ারজাবালের চেয়ে বেশি গোল করেছেন শুধু আর্লিং হালান্দ (২২টি)। এ ছাড়া ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় এমিলিও বুত্রাগেনিয়োর পর প্রথম স্প্যানিশ ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচে জোড়া গোল করলেন তিনি। ইয়ামালের উপস্থিতিও সাহায্য করছে। এই সাফল্যের অর্থ এই নয় যে তিনি ইয়ামালের ছায়ায় ঢাকা পড়েছেন। বরং ইয়ামালের অসাধারণ বল নিয়ন্ত্রণ ও ড্রিবলিং প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের তার দিকে টেনে নিয়ে যায়। ফলে ওয়ারজাবাল বাড়তি ফাঁকা জায়গা পান। এনিয়ে সাবেক জার্মান মিডফিল্ডার টমাস হিটলসস্পেগার বলেন, ‘দলে যদি ইয়ামালের মতো এমন একজন খেলোয়াড় থাকে, যে সবার মনোযোগ নিজের দিকে টেনে নেয়, তাহলে অন্যরা স্বাভাবিকভাবেই বেশি জায়গা পায়। ওয়ারজাবাল সেই জায়গার দারুণ ব্যবহার করছে, বল পাচ্ছে এবং গোল করছে।’ স্পেন দলের এই ফুটবলার কিন্তু এক সময়ে হকি খেলতেন। হকি খেলার মধ্যদিয়েই তার গোল করার ক্ষুধা বেড়েছে জানিয়ে ওয়ারজাবাল বলেন, ‘আমি ছোটবেলায় হকি খেলতাম এবং অনেক গোল করতাম। আমার মাথায় সব সময় একটা কথা ঘুরত’-একটা সুযোগ মিস করলে সমস্যা নেই, সামনে আরও সুযোগ আসবে।
এতেই আমি গোলের গন্ধ পেতাম।’ এখন স্ট্রাইকার হিসেবে খেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বলেন,‘অন্য পজিশনের খেলোয়াড়দের ভালো খেলতে হলে বল বেশি ছুঁতে হয়। কিন্তু একজন স্ট্রাইকারের জন্য পুরো ম্যাচের পার্থক্য গড়ে দেয় কয়েকটি মুহূর্ত। আমাদের বুঝতে হয় বল কোথায় পড়তে পারে, কোথায় দাঁড়ালে গোল করার সুযোগ মিলবে।’
বিশ্বকাপে ওয়ারজাবালের পারফরমেন্স নিয়ে স্প্যানিশ ফুটবল বিশেষজ্ঞ গিয়েম বালাগে বিবিসি রেডিও ফাইভ লাইভকে বলেন, ‘এটা স্পষ্ট যে ইয়ামালই দলের নেতা। সবাই যা করছে, তার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে ইয়ামালের সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু মিকেল ওয়ারজাবাল যেন অদৃশ্য মানুষ। তিনি প্রায় প্রতিটিতেই গোল করেছেন। তিনি আমাদের সবচেয়ে বুদ্ধিমান খেলোয়াড়দের একজন এবং ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিতে পারেন।’ জাতীয় দলে এক দশকের ক্যারিয়ারে ওয়ারজাবাল খুব একটা আলোচনায় ছিলেন না। ১৯ বছর বয়সে স্পেনের হয়ে অভিষেক হলেও তিনি ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ খেলতে পারেননি, হাঁটুর ইনজুরির কারণে। চার বছর পর বিশ্বকাপে অভিষেকের আগে তিনি ছিলেন দুর্দান্ত ফর্মে। বিশ্বকাপের আগে ১২টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে করেছেন ১২ গোল।
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করে তিনি শেষ ১৬ ম্যাচে গোলসংখ্যা বাড়িয়ে ১৭-তে নিয়ে যান। চলতি বিশ্বকাপে তার গোল এখন চারটি। এনিয়ে বালাগে বলেন, চোট থেকে ফেরার পর গত দুই মৌসুমই তার ক্যারিয়ারের সেরা সময়। বিশ্বকাপে চার গোল-এখন পর্যন্ত নিঃসন্দেহে স্পেনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়।’ ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেন এখন বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম দাবিদার। অস্ট্রিয়াকে হারিয়ে তাদের অপরাজিত থাকার ধারাবাহিকতা দাঁড়িয়েছে ৩৪ ম্যাচে। কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে পারলে নিজেদের সর্বোচ্চ ৩৫ ম্যাচের রেকর্ড স্পর্শ করবে তারা।
