নজরদারিতে কাইল্যা পলাশের খুনিরা

অধরা টিটনের হত্যাকারীরা

নজরদারিতে কাইল্যা পলাশের খুনিরা

ফন্ট সাইজ:

আধিপত্য বিস্তার, এলাকা নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, খুনখারাবিতে নাম আসছে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘটছে একের পর এক হত্যাকাণ্ড। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসী কাইল্যা পলাশ ও টিটনকে হত্যার ঘটনায় শুটারদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ, ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে তারা। একেকটি খুনের ঘটনায় আড়ালে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কলকাঠি নাড়ার তথ্য বের হয়ে আসছে। এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর অনুসারীদের হাতে নিহত হচ্ছে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী। রাজধানীর আন্ডারওয়ার্ল্ডে এখন আতঙ্কের নাম প্রতিপক্ষের হামলা। একের পর এক হত্যায় শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে আতঙ্ক। নিরাপত্তার আশঙ্কায় তারা প্রকাশ্যে চলাফেরা সীমিত করেছে, অনেকেই আত্মগোপনে রয়েছে। নিরাপত্তার শঙ্কায় আদালতে আনা হচ্ছে না শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনকে।

হত্যা, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় ওঠে তার নাম। গত ১০ই নভেম্বর আদালতে হাজিরা দিতে এসে হত্যার শিকার হন শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুন। আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের ঘনিষ্ঠরা গুলি করে হত্যা করে তাকে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও গোয়েন্দা সূত্র বলছে, দীর্ঘদিন ঝিমিয়ে পড়া আন্ডারওয়ার্ল্ড পটপরিবর্তনের সময় সুযোগ নিয়ে চাঙা হয়। বিভিন্ন কারাগারে থাকা সরকারের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী অনেকে জামিন পেয়ে যান। জামিনে বের হয়েই তারা পুরনো স্টাইলে জীবনযাপন শুরু করেন। একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিন পাওয়াতে এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েও একে-অপরের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ছেন।

সর্বশেষ গত ১২ই জুন বেলা পৌনে ২টার দিকে রামপুরায় বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবনের উল্টো দিকে নিজের বাসার কাছে গুলিবিদ্ধ হন শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন খান পলাশ ওরফে ‘কাইল্যা পলাশ। গুলিবিদ্ধ হওয়ার এক সপ্তাহ পর শুক্রবার রাত ১টার দিকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় দু’জনকে গ্রেপ্তার করলেও ঘটনায় জড়িত শুটার ও মূল পরিকল্পনাকারীকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ হত্যায় জড়িতদের মধ্যে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের নাম উঠে এসেছে। ডিবি বলছে, শীর্ষ সন্ত্রাসী পলাশ হত্যার ঘটনায় যারা জড়িত তাদেরকে শনাক্ত করা হয়েছে। শিগগিরই তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হবে।

২০০২ সালের ২৯শে মে রামপুরায় যুবদল নেতা মিজানকে গুলি চালিয়ে হত্যা মামলায় দণ্ডিত ছিলেন ইয়াছিন খান পলাশ। এ মামলায় বিচারিক আদালত মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন পলাশকে। পরে উচ্চ আদালত তার সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। এই মামলায় এক মাস আগে কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান পলাশ। গুলির ঘটনায় পলাশের স্ত্রী মাহমুদা খানম হাতিরঝিল থানায় হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা করেন। তাতে জিসান আহমেদ মন্টি নামে একজনকে ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ উল্লেখ করে প্রধান আসামি করা হয়। এ ছাড়া, বাদশা ওরফে গুজা বাদশা (৪৮), গলদা বাদশা (৪৫), শান্ত ওরফে পিচ্চি শান্ত (২৮), সোলাইমান খন্দকার (৪৫), ফারুক ওরফে চাচা ফারুক (৩৫), হেবেল (৩৫), মোল্লা জনি (৪২), ফিরোজ মোহাম্মদ মোল্লা (৪৫), পিচ্চি আলামিন ওরফে তোতলা আলামিন এবং সজীবের (৩৫) নাম এজাহারে আসামির তালিকায় রয়েছে।

মামলার পর গত শনিবার রাজধানীর বাড্ডা এলাকা থেকে ইমাম হোসেন নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর সোমবার মো. মারুফ সুলতান ওরফে ফেরদৌস নামে আরেকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
হাতিরঝিল থানা পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় জড়িত দু’জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের নাম এজাহারে নেই। তবে দু’জনই এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত। যেই মোটরসাইকেলে করে এসে গুলি করা হয়েছে, ইমাম হোসেন সেটির চালক ছিলেন। আর মারুফ সুলতান ওই এলাকায় সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরি করছিলেন।

এ ছাড়া গত ২৮শে এপ্রিল ঢাকার নিউমার্কেটের পশ্চিম পাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাসের সামনে বটতলায় শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে হত্যার দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। জড়িত দুই শুটারসহ কাউকেই শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। এমনকী হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়া সন্ত্রাসীরা কোনো শীর্ষ সন্ত্রাসী চক্রের অনুসারী কি না, তাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তদন্তকারী দল বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে খুনিদের রায়েরবাজার পর্যন্ত শনাক্ত করতে পারলেও এরপর তারা কোথায় গিয়েছেন, কোন পথে গিয়েছেন তা আর শনাক্ত করতে পারেননি। ঢাকার অপরাধজগতের অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলেই ধারণা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। সন্দেহের তালিকায় রয়েছেন ঢাকার ‘সিটি অব গড’ খ্যাত মোহাম্মদপুর অঞ্চলের দুই শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান ওরফে পিচ্চি হেলাল ও সানজিদুল ইসলাম ইমন।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টিটনের ব্যবহৃত মুঠোফোনটি উদ্ধার করা যায়নি। ফলে তিনি কার সঙ্গে যোগাযোগ করতেন, কে তাকে ঘটনাস্থলে ঢেকেছিল এসব বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না, এ ছাড়া শুটারদের চেহারাও অস্পষ্ট। তাই তদন্ত এগোচ্ছে না। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও ডিবি’র উপপরিদর্শক ইরফান খান বলেন, খুনিরা মোটরসাইকেলে মোহাম্মদপুরের দিকে পালিয়েছে তা নিশ্চিত হওয়া গেছে।

সম্প্রতি কাওরান বাজার এলাকায় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মোছাব্বির হত্যাকাণ্ডে নাম আসে বিদেশে পলাতক দীলিপ ওরফে দাদা দীলিপের। এর আগে তার নাম শোনা না গেলেও বিদেশে পলাতক অপর শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের হয়ে তিনি কাওরান বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে। কারাগারে বসেই মগবাজারের কিছু এলাকা এখনো নিয়ন্ত্রণ করছে সুব্রত বাইন, তার মেয়ে খাদিজা ও সুব্রত বাইনের সেকেন্ড ইন কমান্ড মোল্লা মাসুদ। তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকা দখল নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের ক্যাডাররা। সূত্রের দাবি মালিবাগ, রামপুরা, খিলগাঁও, পল্টন ও মতিঝিল এলাকায় একক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে জিসানের।

২০২৫ সালের ১০ই নভেম্বর বেলা ১১টার দিকে পুরান ঢাকার সূত্রাপুরে ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফটকের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয় শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাঈদ মামুনকে। এর আগে, ২০২৪ সালের ২০শে সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার বেড়িবাঁধে সাদিক খান আড়তের সামনে নাসির ও মুন্না নামের দুই যুবককে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় নাম আসে পিচ্চি হেলালের। এরপর ২০২৫ সালের ১০ই জানুয়ারি রাতে নিউ এলিফ্যান্ট রোডের মাল্টিপ্ল্যান সেন্টার বিপণিবিতানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নিয়ে ব্যবসায়ী এহতেশামুল হককে কোপানোর ঘটনায় নাম আসে শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের।

২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিনে মুক্তি পান। জামিনপ্রাপ্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীরা হলো- ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল, সানজিদুল ইসলাম ইমন ওরফে ক্যাপ্টেন ইমন, মিরপুরের আব্বাস আলী, তেজগাঁওয়ের শেখ মোহাম্মদ আসলাম ওরফে সুইডেন আসলাম, হাজারীবাগের খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটন (নিহত), খোরশেদ আলম ওরফে ফ্রিডম রাসু ও তারিক সাঈদ মামুন (নিহত)। ফ্রিডম রাসু পরে আবার গ্রেপ্তার হন। অবশ্য বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কুষ্টিয়া থেকে গ্রেপ্তার করা হয় মগবাজারের শীর্ষ সন্ত্রাসী ত্রিমাতি সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদকে। পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্র বলছে, কারামুক্তির পর এসব সন্ত্রাসী নিজেদের প্রভাব বিস্তার ও এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিতে নতুন করে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন। বিশেষ করে পিচ্চি হেলাল ও ইমনের মধ্যে বিরোধ সবচেয়ে বেশি আলোচিত। ইমন বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে, তবে সেখান থেকেই তিনি ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে আধিপত্য বিস্তার ও অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে ইমন ও পিচ্চি হেলাল আলাদা সন্ত্রাসী দল গঠন করে। ১৯৯৭ সালে একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয় জোসেফ। তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছিল। ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রেসিডেন্টের ক্ষমা পেয়ে মুক্তি পান। তিনি কারাগারে থাকা অবস্থাতেই ১৯৯৯ সালের ১৩ই মার্চ ইমন বাহিনীর হাতে খুন হন জোসেফের ভাই আবু সাঈদ টিপু ও তার বন্ধু এমরান। ইমন ও টিটন এ হত্যা মামলার আসামি। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ২০০১ সালে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের একটি তালিকা প্রকাশ করে পুলিশ। ওই তালিকায় ছিলেন- মোহাম্মদপুরের ইমন, টিটন, পিচ্চি হেলাল ও হারিস আহমেদ।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, গত কয়েক মাসে ঘটিত চাঞ্চল্যকর সবকয়টি হত্যাকাণ্ডের রহস্য আমরা উদ্‌ঘাটন করেছি এবং আসামিদেরও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিছু মামলায় চার্জশিটও আমরা প্রস্তুত করেছি, শিগগিরই জমা দিবো। শুধুমাত্র টিটন হত্যাকাণ্ডের শুটারকে শনাক্ত করতে পারিনি। আমাদের টিম কাজ করছে। শিগগিরই আমরা তাদের শনাক্ত করবো। অন্যদিকে শীর্ষ সন্ত্রাসী কাইল্যা পলাশের ঘটনায় যারা জড়িত তাদেরকে শনাক্ত করে নজরদারিতে রেখেছি। শিগগিরই তাদের গ্রেপ্তার করা হবে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন