রেফারির শেষ বাঁশি বাজতেই টরন্টো স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাসে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন লুকা মদরিচ। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পাশে দাঁড়িয়ে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ দুই ‘আউটফিল্ড’ তারকার যে মহাকাব্যিক দ্বৈরথ বিশ্ব উপভোগ করছিল, তার সমাপ্তি যেকোনো একজনের বুকভাঙা বেদনাতেই হওয়ার কথা ছিল। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে ইয়োস্কা গাভার্দিওলের গোলটি যখন ভিএআর প্রযুক্তির সূক্ষ্ম অফসাইডের খাঁড়ায় বাতিল হয়ে গেল, তখনই নিশ্চিত হয়ে যায়Ñ ক্রোয়েশিয়ার সোনালি প্রজন্মের শেষ প্রতিনিধি আর ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা মিডফিল্ড জাদুকরের বিশ্বকাপ ‘লাস্ট ডান্স’। ২-১ গোলে হারের পর টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়ে ক্রোয়াট কোচ জøাতকো দালিচ আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‘সম্ভবত এটিই লুকার শেষ বিশ্বকাপ।
সে আজকেও দুর্দান্ত খেলেছে, দলের সবাইকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নেতৃত্ব দিয়েছে। ওর মতো একজন কিংবদন্তির বিদায়টা এভাবে হলো, এর জন্য আমি সত্যিই দুঃখিত।’ লুকা মদরিচের এই বিদায়বেলাটা কেবল একটা ফুটবল ম্যাচ হারের গল্প নয়, এটি আসলে মানুষের ইচ্ছাশক্তি আর ঘুরে দাঁড়ানোর এক অলৌকিক উপাখ্যান। ১৯৮৫ সালে সাবেক যুগোসøাভিয়ায় জন্ম নেয়া মদরিচের শৈশবটা আর দশটা শিশুর মতো ছিল না। ১৯৯১ সালে যখন ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়, তখন তার বয়স মাত্র ছয় বছর। সার্বিয়ান মিলিটারিরা চোখের সামনে তার প্রিয় দাদাকে নির্মমভাবে হত্যা করে এবং তাদের বাড়িটি পুড়িয়ে দেয়। জীবন বাঁচাতে সপরিবারে জাদার শহরের এক শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিতে হয় মদরিচদের। যেখানে অন্য শিশুরা স্কুলের পড়া আর খেলাধুলা নিয়ে ব্যস্ত থাকতো, সেখানে ছোট্ট লুকা বড় হয়েছেন বোমার আওয়াজ আর মৃত্যুর অনিশ্চয়তার মাঝে।
সেই অন্ধকার সময়ে তার একমাত্র সঙ্গী ছিল একটি ফুটো হয়ে যাওয়া ফুটবল। শরণার্থী শিবিরের হোটেলের পার্কিং লটে বোমাবর্ষণের শব্দের মাঝেই চলতো তার বল ড্রিবলিংয়ের প্র্যাকটিস। শারীরিক গঠনে অত্যন্ত রোগা আর খাটো হওয়ায় শুরুর দিকে স্থানীয় কোচরা তাকে বাতিলের খাতায় ফেলে দেন। সবার ধারণা ছিল, এত ভঙ্গুর শরীর নিয়ে পেশাদার ফুটবলের মারমার-কাটকাট দুনিয়ায় টিকে থাকা অসম্ভব। কিন্তু লুকা পা থাকতে মুখে কোনো জবাব দেননি। ডাইনামো জাগরেবের যুব দল থেকে টটেনহ্যাম হটস্পার হয়ে ২০১২ সালে যখন রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দিলেন, তখনো স্প্যানিশ মিডিয়া তাকে ‘বছরের সবচেয়ে বাজে সাইনিং’ বলে কটূক্তি করেছিল। সেই তথাকথিত দুর্বল ছেলেটিই অল হোয়াইটদের হয়ে ৬টি চ্যাম্পিয়ন্স লীগ, ৪টি লা লিগা শিরোপা জিতে ইতিহাস রচনা করেন। ২০১৮ সালে লিওনেল মেসি আর ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর এক দশকের রাজত্ব ভেঙে প্রথম ক্রোয়েশিয়ান হিসেবে জিতে নেন ফুটবলের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সম্মান ব্যালন ডি’অর। মাত্র ৬৬ কেজি ওজনের হালকা শরীরটাকেই চোট এড়ানোর সবচেয়ে বড় অস্ত্র বানিয়ে ফেলেছিলেন মদরিচ।
২০১২ সাল থেকে তার ব্যক্তিগত ট্রেইনার, অধ্যাপক ভøাতকো ভুচেতিচ এক অবিশ্বাস্য তথ্য জানান। বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে ৩৫০ দিনই মূল অনুশীলনের আগে ৪৫ মিনিটের বিশেষ ওয়ার্কআউট করেন মদরিচ। রেজিস্ট্যান্স ব্যান্ড আর কোর স্ট্রেন্থ বাড়ানোর এই কঠোর নিয়মানুবর্তিতার কারণেই ৪০ বছর বয়সেও চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে মদরিচের ‘মেটাবলিক বয়স’ ৩০ বছরের নিচে! পেশাদার ফুটবলে দীর্ঘ দুই দশকের ক্যারিয়ারে ১,১৫০টিরও বেশি ম্যাচ খেললেও চোটের কারণে মাঠের বাইরে ছিলেন মাত্র ২৫০ দিন। এটি আধুনিক ফুটবলে এক বিরল রেকর্ড। বয়স বাড়ায় গতি কমলেও মদরিচ মাঠ মাতান তার ‘মোটর ইন্টেলিজেন্স’ বা চালিকা বুদ্ধিমত্তা দিয়ে। বল পায়ে আসার আগেই তিনি চারপাশ স্ক্যান করে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন কোনদিকে সেটি পাঠাবেন। ফলে মাঠে অহেতুক দৌড়ে তাকে শক্তি অপচয় করতে হয় না। এই চোটহীন ইস্পাতদৃঢ় শরীর আর জাদুকরী ফুটবল মস্তিষ্কই ৪০ বছর বয়সেও তাকে ধরে রেখেছে বিশ্বমঞ্চের চূড়ায়। পরিসংখ্যান বা ট্রফি দিয়ে কখনোই মদরিচের মাহাত্ম্য বোঝানো সম্ভব নয়।
তার সাবেক রিয়াল মাদ্রিদ সতীর্থ ও বন্ধু রোনালদো ম্যাচ শেষে বলেন, ‘আমি লুকার সঙ্গে বহু বছর খেলেছি। আমরা প্রায় সমবয়সী। ও ফুটবলের একজন লিভিং লেজেন্ড।’ পর্তুগাল কোচ রবার্তো মার্তিনেজও তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে বলেন, ‘মদরিচ এমন একজন খেলোয়াড় যে মাঠে পা দিয়ে খেলাটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। ও ফুটবলীয় বুদ্ধিমত্তার এক অনন্য উদাহরণ।’ ২০১৮ সালে ক্রোয়েশিয়াকে রূপকথার মতো করে বিশ্বকাপের ফাইনালে তোলা এবং ২০২২ সালে সেমিতে নিয়ে যাওয়া মদরিচ এবারো চার ম্যাচের প্রতিটিতেই স্টার্টার হিসেবে মাঠে নেমেছিলেন। বিদায়ের রাতে দল হারলেও, মাঠে তার ছোঁয়া ছিল ৬৬ বার, ৩টি ট্যাকল এবং দু’টি দুর্দান্ত ক্রস। ট্রফি ছাড়াই হয়তো তার বিশ্বকাপ অধ্যায় শেষ হলো। কিন্তু যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে এসে ফুটবল বিশ্ব জয় করা মদরিচ ক্রোয়েশিয়া, তথা বিশ্ব ফুটবলে চিরকাল টিকে থাকবেন এক অমর প্রেরণার নাম হয়ে।
