ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গে পাকিস্তানের ক্রিপ্টো চুক্তির নেপথ্যে কী?

ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গে পাকিস্তানের ক্রিপ্টো চুক্তির নেপথ্যে কী?

ফন্ট সাইজ:

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ২০২৫ সালের আর্থিক আয়-ব্যয়ের বিবরণ প্রকাশের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে তার পরিবারের ক্রিপ্টোকারেন্সি উদ্যোগ ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল (ডব্লিউএলএফ)। প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, শুধু টোকেন বিক্রি থেকেই গত বছর ট্রাম্প ৫০ কোটি ডলারেরও বেশি আয় করেছেন। এ ছাড়া অন্যান্য ক্রিপ্টো সম্পদ থেকে তার আয় আরও কয়েকশ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।

এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরকারী প্রথম দিকের দেশগুলোর একটি ছিল পাকিস্তান। তবে প্রায় ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও চুক্তির আওতায় ঘোষিত কার্যক্রমের কোনো বাস্তব অগ্রগতি হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তির প্রকৃত মূল্য অর্থনৈতিক নয়; বরং ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে পাকিস্তানের কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।

চুক্তি হলেও বাস্তবায়ন হয়নি
চলতি বছরের জানুয়ারিতে পাকিস্তানের অর্থ মন্ত্রণালয় ও ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়ালের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এসসি ফাইন্যান্সিয়াল টেকনোলজিস একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। এতে সীমান্ত-পার লেনদেনে প্রতিষ্ঠানটির মার্কিন ডলারের সঙ্গে সংযুক্ত ইউএসডি-১ স্টেবলকয়েন ব্যবহারের সম্ভাবনা যাচাইয়ের কথা বলা হয়।

চুক্তি স্বাক্ষরের সময় উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ, সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা স্টিভ উইটকফের ছেলে জ্যাক উইটকফ। পাকিস্তানের অর্থমন্ত্রী মুহাম্মদ আওরঙ্গজেবের সঙ্গে তিনি চুক্তিতে সই করেন।
কিন্তু পাকিস্তানের কর্মকর্তারা এখন স্বীকার করেছেন, এখন পর্যন্ত ইউএসডি-১ ব্যবহার করে কোনো পরীক্ষামূলক প্রকল্প চালু হয়নি, কোনো লাইসেন্স দেয়া হয়নি এবং এই স্টেবলকয়েন ব্যবহার করে কোনো লেনদেনের তথ্যও পাওয়া যায়নি।

স্টেবলকয়েন কী?
স্টেবলকয়েন হলো এমন একটি ডিজিটাল মুদ্রা, যার মূল্য সাধারণত মার্কিন ডলারের সঙ্গে নির্দিষ্ট হারে সংযুক্ত থাকে। এটি ব্যাংকের মধ্যস্থতা ছাড়াই দ্রুত অনলাইনে অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ দেয়।
ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়ালের ইউএসডি-১ এর ক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা প্রযোজ্য। প্রতিটি কয়েনের বিপরীতে সংরক্ষিত ডলার রিজার্ভ থেকে প্রতিষ্ঠানটি সুদ আয় করে। ফলে ইউএসডি১ যত বেশি ব্যবহৃত হবে, ট্রাম্প পরিবারের আয়ও তত বাড়বে।

প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন
পাকিস্তান ইতোমধ্যেই বিশ্বের অন্যতম বড় ক্রিপ্টো বাজার। চেইনঅ্যানালিসিস-এর ক্রিপ্টো গ্রহণযোগ্যতা সূচক অনুযায়ী, গত বছর ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের পর পাকিস্তানের অবস্থান ছিল তৃতীয়। তবে দেশটির অনানুষ্ঠানিক ক্রিপ্টো লেনদেনের বড় অংশই বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্টেবলকয়েন টেথার (ইউএসডিটি)-এর মাধ্যমে হয়ে থাকে বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু ইউএসডি-১ ব্যবহারের কোনো প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাকিস্তানের এক জ্যেষ্ঠ ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে কত অর্থ স্থানান্তর হয়, তার নির্ভরযোগ্য কোনো পরিসংখ্যান নেই। ধারণা করা হয়, মোট প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের প্রায় ১০ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক পথে আসে, যার একটি অজানা অংশ স্টেবলকয়েনের মাধ্যমে হতে পারে।

অন্যদিকে পাকিস্তানে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে পাকিস্তান ৩৮ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পেয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২৭ শতাংশ বেশি এবং দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। শুধু মে মাসেই এসেছে ৪ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার। চলতি বছরে এই অঙ্ক ৪২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বিশেষজ্ঞদের সংশয়
কানাডাভিত্তিক ব্যাংকিং ও অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ ইব্রাহিম খলিলের মতে, যখন ব্যাংকিং চ্যানেলেই দ্রুত ও নিরাপদে অর্থ পাঠানো সম্ভব হচ্ছে এবং রেমিট্যান্সও রেকর্ড পরিমাণে আসছে, তখন নতুন করে ইউএসডি-১ ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা প্রশ্নবিদ্ধ।

তার ভাষায়, যারা বর্তমানে ইউএসডিটি ব্যবহার করছেন, তারা মূলত ব্যাংকিং ব্যবস্থা এড়িয়ে চলছেন। সেই বাস্তবতা পরিবর্তন করতে ইউএসডি-১ কোনো সমাধান নয়, যদি শেষ পর্যন্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থাই ব্যবহার করতে হয়।
তিনি আরও বলেন, পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ মাত্র প্রায় ১৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার, যা দুই মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্য যথেষ্ট। যদি বাণিজ্যিক অংশীদাররা সরাসরি ইউএসডি১ গ্রহণ না করে, তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আবারও সেটিকে মার্কিন ডলারে রূপান্তর করতে হবে। এতে বরং অতিরিক্ত জটিলতা তৈরি হতে পারে।

নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তুলছে পাকিস্তান
এদিকে ক্রিপ্টো খাতের জন্য নতুন আইন প্রণয়নে দ্রুত এগিয়েছে পাকিস্তান। মার্চে পাস হওয়া ভার্চুয়াল অ্যাসেটস অ্যাক্ট অনুযায়ী গঠিত হয়েছে পাকিস্তান ভার্চুয়াল অ্যাসেটস রেগুলেটরি অথরিটি (পিভিএআরএ)। এই সংস্থার অনুমোদন ছাড়া ক্রিপ্টো ব্যবসা পরিচালনা করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

এপ্রিল মাসে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক লাইসেন্সপ্রাপ্ত ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যাংক হিসাব খোলার অনুমতি দেয়। তবে এখনও পূর্ণাঙ্গ লাইসেন্সিং নীতিমালা প্রকাশ করা হয়নি। বিশ্বের বড় দুটি ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বিন্যান্স ও এইচটিএক্স নিবন্ধিত হলেও এখনও তাদের কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়ালের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক মূলত প্রযুক্তিগত আলোচনা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের জন্য ছিল। এতে কোনো নির্দিষ্ট স্টেবলকয়েন চালুর বাধ্যবাধকতা নেই। ভবিষ্যতে পিভিএআরএ-এর শর্ত পূরণ করতে পারা যেকোনো প্রতিষ্ঠান একই ধরনের সেবা দিতে পারবে।

কূটনৈতিক লাভই মূল লক্ষ্য?
অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তিটির সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল কূটনৈতিক। ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়ালের প্রতিনিধি দল পাকিস্তান সফর করে এমন এক সময়ে, যখন ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পাহেলগামে হামলার পর ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল।
পরবর্তীতে পাকিস্তান ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য সুপারিশ করে। ভারতের সঙ্গে উত্তেজনা কমাতে ভূমিকা রাখার জন্য ট্রাম্পের “দূরদর্শী নেতৃত্বের” প্রশংসাও করে ইসলামাবাদ।

এরপর ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে মধ্যাহ্নভোজে আমন্ত্রণ জানান, যা ছিল নজিরবিহীন। একই সময়ে ইরান-ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র সংকটের সময় পাকিস্তান ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাও নেয়ার চেষ্টা করে।

সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স প্রকাশ্যে আসিম মুনিরের প্রশংসা করে বলেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে শান্তির কাঠামো তৈরিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
অন্যদিকে পিভিএআরএ-এর চেয়ারম্যান বিলাল বিন সাকিব সরকারে যোগ দেওয়ার আগে ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়ালের উপদেষ্টা ছিলেন।

পরে তিনি ব্লুমবার্গকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ক্রিপ্টো উদ্যোগের কারণে ওয়াশিংটনের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। যদিও হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, এতে কোনো স্বার্থের সংঘাত ছিল না।

‘অ্যাক্সেসের জন্য মূল্য’
করাচিভিত্তিক অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষক খুররম হুসেইনের মতে, এই সমঝোতা স্মারকের প্রকৃত উদ্দেশ্য অর্থনৈতিক ছিল না।

তার ভাষায়, এটি মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে প্রবেশাধিকার পাওয়ার একটি কৌশল ছিল। নীতিগতভাবে এর তেমন কোনো ভিত্তি ছিল না। কিন্তু সেই লক্ষ্য সফল হয়েছে। বিশেষ করে ইরান ইস্যুতে পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতার সঙ্গে মিলিয়ে ইসলামাবাদ হোয়াইট হাউসে উল্লেখযোগ্য প্রবেশাধিকার অর্জন করেছে।

ইব্রাহিম খলিলও একই ধরনের মূল্যায়ন করে বলেন, আমার দৃষ্টিতে পুরো উদ্যোগটি ছিল মূলত ‘অ্যাক্সেসের বিনিময়ে মূল্য পরিশোধ’।

বিশ্লেষকদের মতে, ইউএসডি-১ আদৌ পাকিস্তানের অর্থনীতিতে কোনো ভূমিকা রাখবে কি না, তা এখনও অনিশ্চিত। তবে এই চুক্তি পাকিস্তানকে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে- এ বিষয়ে অনেক পর্যবেক্ষকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঐকমত্য রয়েছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা




কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন