পেশাদার কূটনীতির অবক্ষয় ও অনভিজ্ঞ নেতৃত্বের এক সংকটময় পরিস্থিতিতে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ঐতিহ্যগতভাবে একটি দেশের কূটনৈতিক দল গঠিত হয় নিরপেক্ষ ও পেশাদার ব্যক্তিদের নিয়ে। তাদের একমাত্র লক্ষ্য থাকে দেশের কল্যাণ। তবে ইরানের সাথে চলমান অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জটিল শান্তি আলোচনায় মার্কিন দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং দু’জন ব্যক্তি জ্যারেড কুশনার ও স্টিভেন উইটকফ। তাদের মূল পরিচয় তারা আবাসন খাতের ব্যবসায়ী এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির সাথে যুক্ত। ট্রাম্পের জামাতা হওয়ার সুবাদে কুশনারের এই অঙ্গনে প্রবেশ। অন্যদিকে উইটকফের প্রধান যোগ্যতা হিসেবে ট্রাম্প উল্লেখ করেছেন তার ৭০টিরও বেশি বহুতল ভবন নির্মাণের অভিজ্ঞতা।
স্বার্থের সংঘাত ও বিদেশি বিনিয়োগের মারপ্যাঁচ: যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী সরকারি পদে থাকাকালীন কোনো বিদেশি রাষ্ট্র থেকে আর্থিক সুবিধা বা ‘পারিতোষিক’ নেয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অথচ কুশনারের বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাফিনিটি পার্টনার্স’-এর ৫০০ কোটি ডলারের বেশি সম্পদের সিংহভাগই এসেছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোর সরকারি তহবিল থেকে। এমনকি যুদ্ধের চরম মুহূর্তেও তিনি উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে আরও তহবিল সংগ্রহের চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। কুশনারের পারিবারিক ইতিহাসও এখানে প্রাসঙ্গিক। তার বাবা চার্লস কুশনার ২০০৫ সালে একটি ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার পর ২০২০ সালে ট্রাম্পের কাছ থেকে প্রেসিডেন্টের ক্ষমা পান। ২০২৫ সালে ফ্রান্সে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিযুক্ত হন।
অন্যদিকে, উইটকফের ক্রিপ্টোকারেন্সি উদ্যোগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার সাথে সম্পৃক্ত একটি কোম্পানি বড় অঙ্কের শেয়ার কিনেছে, যা ট্রাম্পের শপথ নেয়ার ঠিক চার দিন আগে চূড়ান্ত হয়। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে মার্কিন স্বার্থ রক্ষার চেয়ে তাদের নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থ এই দেশগুলোর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।
ইসরাইল তোষণ ও গাজা নিয়ে ‘ব্যবসায়িক’ পরিকল্পনা: ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে এই দুইজনের ঘনিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষত ইসরাইলের প্রতি কুশনারের পক্ষপাত অত্যন্ত স্পষ্ট। তার পরিবার ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারী সংস্থা এবং দেশটির সামরিক বাহিনীকে বিপুল অর্থ অনুদান দিয়েছে। গাজা উপত্যকাকে কুশনার ও উইটকফ কেবল একটি ‘বিনিয়োগের সুযোগ’ হিসেবে দেখছেন। তাদের গঠিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর তৈরি করা ‘মাস্টার প্ল্যান ফর গাজা’ অনুযায়ী, গাজাকে একটি সস্তা শ্রমিকের ক্যাম্প বা কারখানার শহর বানানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। যেখানে ফিলিস্তিনিরা নির্দিষ্ট জোনের বাইরে যাতায়াত করতে পারবে না।
এছাড়া আগামী ১০ বছরের মধ্যে গাজার মনোরম উপকূলের ৭০ ভাগকে বিলাসবহুল হোটেল বানিয়ে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করার নীলনকশা রয়েছে তাদের।
অস্থায়ী চুক্তি ও বিপর্যয়ের আশঙ্কা: পেশাদার কূটনীতিকরা বছরের পর বছর ধরে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে দীর্ঘমেয়াদী আন্তর্জাতিক চুক্তি করেন (যেমন ওবামা আমলের পরমাণু চুক্তি)। কিন্তু কুশনার এবং উইটকফের এই অঞ্চলের ভূরাজনীতি নিয়ে কোনো গভীর জ্ঞান নেই। ট্রাম্পের যেকোনো উপায়ে একটি চুক্তি করার তাড়াহুড়ো এবং এই দুই মধ্যস্থতাকারীর অনভিজ্ঞতার কারণে হয়তো দ্রুত একটি সাময়িক সমঝোতা বা চুক্তি হয়ে যেতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন স্বার্থ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা উপেক্ষিত হওয়ায়, এই ধরনের চুক্তিগুলো টেকসই হবে না এবং ভবিষ্যতে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের মতোই আরও বড় রাজনৈতিক ও মানবিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
