বিশ্ব ফুটবল মঞ্চে এক মহাকাব্যিক লড়াইয়ের গল্প

বিশ্ব ফুটবল মঞ্চে এক মহাকাব্যিক লড়াইয়ের গল্প

ফন্ট সাইজ:

বিশ্ব ফুটবল মঞ্চে একটি খেলাকে ঘিরে এতো আলোচনা আর কখনও হয়েছে—এমনটা জানা নেই। এটা এমনই এক লড়াই যা ডেভিড বনাম গোলিয়াথ বা রূপকথার গল্পকেও হার মানায়। একদিকে তিনবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন, ফুটবলের অবিসংবাদিত পরাশক্তি আর্জেন্টিনা। অন্যদিকে আটলান্টিক মহাসাগরের ছোট্ট দীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে। যারা এই প্রথমবার বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে পা রেখে ইতিহাস গড়েছে। ফুটবল পণ্ডিতরা বলছেন, এটি শুধু ফুটবল ম্যাচ নয়। এটি হলো অভিজ্ঞতা আর এক নতুন স্বপ্নের রোমাঞ্চকর লড়াই। অভিজ্ঞতার দিক থেকে এটি আকাশ-পাতাল তফাৎ। দুই দলের অভিজ্ঞতা যোগ করলে মনে হবে—একপাশে রয়েছে হিমালয় পর্বত, আর অন্যপাশে ছোট মাটির ঢিবি। আর্জেন্টিনার এটা ১৮তম বিশ্বকাপ। মোট তিনবার তারা বিশ্বসেরার মুকুট মাথায় পরেছে। বিশ্বকাপের মঞ্চে একশটিরও বেশি ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা তাদের। অনেকেই কেপ ভার্দেকে পুঁচকে বলে বর্ণনা করছেন। তারাই এখন বলছেন, এই লড়াই হতে যাচ্ছে মহাশক্তি বনাম এক রূপকথার। মায়ামি স্টেডিয়ামে কী হবে তা নিয়েই যত হিসেব-নিকেশ। পাঁচ লাখ ৩০ হাজার জনসংখ্যার এই দ্বীপ রাষ্ট্র কেপ ভার্দের জন্য এটিই প্রথম বিশ্বকাপ। এর আগে আফ্রিকার কাপ অব ন্যাশনসে তারা কয়েকবার চমক দেখিয়েছে বটে। কিন্তু বিশ্বকাপের মতো মেগা টুর্নামেন্টের চাপ সামলানোর অভিজ্ঞতা তাদের একেবারেই নেই। পরিসংখ্যানের এই বিশাল ব্যবধান আর্জেন্টিনাকে অনেক এগিয়ে রেখেছে। তাই মাঠের লড়াইয়ে নামার আগেই মানসিক দিক থেকে তারা বেশ চাঙ্গা। আর্জেন্টিনা-কেপ ভার্দের এই লড়াইয়ের পেছনে রয়েছে এক অদ্ভুত ভৌগোলিক ও ফুটবলীয় ইতিহাস।

আর্জেন্টিনা ফুটবলকে ধর্ম মনে করে। ম্যারাডোনা ও মেসির মতো কিংবদন্তির জন্ম দিয়েছে। কেপ ভার্দের ফুটবল মূলত পর্তুগালের ঔপনিবেশিক ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। একসময় কেপ ভার্দের সেরা ফুটবলাররা পর্তুগালের হয়ে খেলতেন। পর্তুগালের কিংবদন্তি ফুটবলার নানির (Nani) জন্ম এই কেপ ভার্দেতেই। তিনি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের একজন সেরা ফরওয়ার্ড ছিলেন। গত এক দশকে নিজেদের ফুটবলকে নতুন করে সাজিয়েছে দ্বীপ রাষ্ট্রটি। প্রবাসে থাকা প্রতিভাদের একত্র করেছে। কেটেছে বিশ্বকাপের টিকিট। আর্জেন্টিনার আভিজাত্যের বিপরীতে কেপ ভার্দের এই উঠে আসার গল্প ফুটবল ভক্তদের চোখে পানি এনে দেয়। কেপ ভার্দে- আর্জেন্টিনার সঙ্গে কোনো হিসেবেই মিল নেই। আর্জেন্টাইন শিবিরের মোট বাজার মূল্য বিলিয়ন ডলারের ওপরে। অন্যদিকে কেপ ভার্দের পুরো দলের মূল্য যে কোনো একজন বেঞ্চের খেলোয়াড়ের মূল্যের চেয়েও কম। আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগে রয়েছেন বিশ্বসেরা তারকারা। যারা ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবে খেলেন। সেখানে কেপ ভার্দের ভরসা তাদের অধিনায়ক রেকর্ড গোলদাতা রায়ান মেন্দেসের মতো সৈনিক। এছাড়া ইউরোপের মাঝারি সারির ক্লাবে খেলা কিছু লড়াকু ফুটবলার।

গোলরক্ষক ভোজিনিয়া বাড়তি শক্তি কেপ ভার্দের। ভোজিনিয়াকে চীনের গ্রেটওয়ালের সঙ্গে তুলনা করা হয়। চল্লিশ বছর বয়সি এই গোলরক্ষক মেসিদের গোলার মতো শটগুলো কীভাবে রুখে দেন, তাই দেখার বিষয়। তাদের অবশ্য হারাবার কিছু নেই। জয়ের আকাঙ্ক্ষা আছে। রয়েছে লড়াইয়ের প্রস্তুতি। আমরা সবাই জানি, ফুটবলের নিষ্ঠুর সত্য হচ্ছে—আবেগ দিয়ে জয় পাওয়া যায় না। আর্জেন্টিনার মতো দলের রক্ষণভাগ তছনছ করা প্রায় অসম্ভব। আর সেখানে যদি মেসির পায়ে বল থাকে—তাহলে তো কথাই নেই। আর্জেন্টিনা এই ম্যাচে পরিষ্কার হট ফেভারিট। কেপ ভার্দেকে নিয়ে আবার অনেকেই আত্মবিশ্বাসী। মঙ্গলবার ডালাস এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামের প্রেসবক্সে ভিয়েতনামী সাংবাদিক ত্রুং-এর সঙ্গে কথা হয়। যিনি ছয়টি বিশ্বকাপ কাভার করেছেন। তার মতে, কেপ ভার্দে যদি প্রথম ২০ মিনিট গোল না খেয়ে টিকে থাকতে পারে, তাতেই একটি মহাকাব্যিক লড়াইয়ের সাক্ষী হবে বিশ্ব ফুটবল। এতে কোনো সন্দেহ নেই।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন