ঢাকার প্রথম আধুনিক হাসপাতাল হিসেবে ১৮৫৮ সালের ১লা মে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে যাত্রা শুরু করে মিটফোর্ড হাসপাতাল। তৎকালীন ঢাকা জেলার কালেক্টর রবার্ট মিটফোর্ডের দান করা সম্পত্তি ও উইলের অর্থে প্রতিষ্ঠিত এই হাসপাতাল বর্তমানে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতাল নামে পরিচিত। ইতিহাসের দীর্ঘ পথচলায় হাসপাতালটি রাজধানীসহ আশপাশের জেলার লাখো মানুষের চিকিৎসাসেবার অন্যতম ভরসাস্থল হয়ে উঠেছে। তবে আধুনিক যুগে এসেও চিকিৎসাসেবা ও বহির্বিভাগে টিকিট সংগ্রহ ব্যবস্থা রয়ে গেছে সেই পুরনো ধাঁচে। ফলে রোগীকে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে।
স্বাস্থ্যসেবা খাতে যখন ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে, তখন এই হাসপাতালে এখনো অনলাইনে টিকিট সংগ্রহের কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে প্রতিদিন হাজারো রোগীকে শারীরিক উপস্থিতির মাধ্যমে টিকিট সংগ্রহ করতে হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল টিকিটিং ব্যবস্থা চালু করা গেলে রোগীদের ভোগান্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডিজিটাল সেবা সমপ্রসারণ এখন সময়ের দাবি। বিশেষ করে মিটফোর্ড হাসপাতালের মতো পুরনো ও ব্যস্ত চিকিৎসাকেন্দ্রে অনলাইন টিকিটিং ব্যবস্থা চালু হলে প্রতিদিন হাজারো রোগী উপকৃত হবেন। পাশাপাশি দালালচক্রের তৎপরতাও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
সরজমিন দেখা যায়, ভোর না হতেই হাসপাতালের বহির্বিভাগের সামনে রোগীদের দীর্ঘ সারি। চিকিৎসক দেখানো, পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা আল্ট্রাসনোগ্রাফির সিরিয়াল পেতে শত শত রোগীকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অসুস্থ শরীর নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেকের ভাগ্যে জুটছে না কাঙ্ক্ষিত টিকিট। ফলে চিকিৎসাসেবা নিতে এসে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের বড় একটি অংশকে প্রথমেই টিকিট সংগ্রহের জন্য লাইনে দাঁড়াতে হয়। নারী ও পুরুষের জন্য আলাদা কাউন্টার থাকলেও রোগীর চাপের কারণে সকাল থেকেই দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়। বয়স্ক, শিশু ও গুরুতর অসুস্থ রোগীর স্বজনদেরও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে দেখা যায়। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের অভিযোগ পাওয়া গেছে আল্ট্রাসনোগ্রাফি সেবা নিয়ে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন মাত্র ১০টি আল্ট্রাসনোগ্রাফির টিকিট বিতরণ করা হয়। ফলে ভোরে লাইনে দাঁড়িয়েও অনেক রোগী টিকিট পান না। ১০ জনের পর যাদের অবস্থান, তাদের ফিরে যেতে হয়। পরদিন আবার নতুন করে লাইনে দাঁড়াতে হয়। এতে একদিকে যেমন সময় নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে চিকিৎসা প্রক্রিয়াও বিলম্বিত হচ্ছে। রোগীদের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালে কম খরচে চিকিৎসা পাওয়ার আশায় দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার সীমিত সুযোগ এবং টিকিট সংকটের কারণে তাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। কেউ কেউ অভিযোগ করেন, একটি টিকিটের জন্য কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করার পরও সেবা না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে।
হাসপাতালের কাউন্টার ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, পরীক্ষার ফি জমা দেয়ার জন্য মোট পাঁচটি কাউন্টার রয়েছে। এর মধ্যে একটি কাউন্টার স্টাফ, মুক্তিযোদ্ধা ও তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের জন্য নির্ধারিত। বাকি চারটির মধ্যে দু’টি পুরুষ এবং দু’টি নারী রোগীদের জন্য ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে বহির্বিভাগের টিকিট বিতরণের জন্য ১০টি কাউন্টার রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি নারী রোগীদের জন্য, চারটি পুরুষ রোগীদের জন্য এবং একটি কাউন্টার স্টাফ, মুক্তিযোদ্ধা ও তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের জন্য বরাদ্দ। তবে রোগীদের অভিযোগ, কাগজে-কলমে কাউন্টার বেশি থাকলেও রোগীর তুলনায় তা পর্যাপ্ত নয়। স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিদিন হাজারো রোগী চিকিৎসা নিতে আসলেও সেবার পরিধি সেই হারে বাড়েনি। ডিজিটাল টোকেন ব্যবস্থা করা গেলে রোগীদের ভোগান্তি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। বিশেষ করে আল্ট্রাসনোগ্রাফির মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার টিকিট সংখ্যা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন তারা। এ ছাড়া প্যাথলজিক্যাল টেস্টের জন্য ৫টি কাউন্টার রয়েছে।
নবাবগঞ্জ থেকে আসা রাবেয়া বেগম বলেন, “শিশু সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছি। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে বাচ্চা অস্থির হয়ে পড়েছে। এখানে রোগীদের জন্য বসারও ব্যবস্থা নেই। অনলাইনে টিকিট কাটার ব্যবস্থা থাকলে আমাদের এত ভোগান্তি হতো না।” পুরান ঢাকার বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম বলেন, “সরকারি হাসপাতালে গরিব মানুষ চিকিৎসা নিতে আসে। কিন্তু টিকিট কাটতেই যদি কয়েক ঘণ্টা চলে যায়, তাহলে চিকিৎসা নেবে কখন? অনেক সময় দালালরা এসে দ্রুত কাজ করে দেয়ার কথা বলে টাকা চায়।” বয়স্ক রোগী হালিমা খাতুন বলেন, “হাঁটতে কষ্ট হয়। তারপরও সকাল সকাল এসে লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে। বয়সের কারণে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব না। আমাদের মতো বৃদ্ধদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা দরকার।”
এ বিষয়ে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, রোগীদের কষ্টের কথা বিবেচনা করে টিকিট সরবরাহের জন্য আলাদা কাউন্টার জোন করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ই-টিকিটিং সিস্টেম চালুর জন্য প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে।
