জনদাবি নিয়ে সংসদের ভেতরে বাইরে সোচ্চার থাকবে জামায়াত

জনদাবি নিয়ে সংসদের ভেতরে বাইরে সোচ্চার থাকবে জামায়াত

ফন্ট সাইজ:

জনগণের দাবি আদায়ে জামায়াত সংসদের ভেতরে ও বাইরে সোচ্চার থাকবে বলে জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার ভিত্তিতে প্রস্তুত হওয়া চার্টারে প্রায় সব রাজনৈতিক দল স্বাক্ষর করলেও সরকার পরে অবস্থান পরিবর্তন করেছে। নির্বাচনের আগে সংস্কার বাস্তবায়নের যে অঙ্গীকার ছিল, তা থেকে সরকার সরে এসেছে। বিরোধী দল হিসেবে জামায়াত সংসদে বিষয়টি উত্থাপন করলেও কোনো কার্যকর সিদ্ধান্ত হয়নি। তাই জনগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আমরা জনগণের কাছেই যাবো। গতকাল সংসদের এলডি হলে বাজেট পরবর্তী সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সংসদ সদস্য মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের জনগণের প্রায় ৭০ শতাংশ সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। সেই জনমত উপেক্ষা করে কেবল সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। অথচ জনগণ সংস্কারের ম্যান্ডেট দিয়েছে, শুধু সংশোধনের নয়। সংস্কার ও সংবিধান সংশোধনের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। আদালত সংশোধনের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারলেও সংস্কারের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ নেই।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রসঙ্গে জামায়াত আমীর বলেন, আদালতের রায়ের মাধ্যমে এই ব্যবস্থা আবার ফিরে এসেছে। তবে এর পূর্ণাঙ্গ কাঠামো এখনো চূড়ান্ত হয়নি। অতীতে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছিল, যা ছিল বিচারিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থি। এখন সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমে এটি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ায় একটি ইতিবাচক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

বাজেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার কিছু ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অগ্রিম কর প্রত্যাহারসহ কয়েকটি বিষয়ে বিরোধী দলের প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষ করে সাইকেলের খুচরা যন্ত্রাংশের ওপর অতিরিক্ত কর প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। এতে ক্ষুদ্র শিল্প, কর্মসংস্থান এবং রপ্তানি বাড়বে।

তবে বাজেট বাস্তবায়ন সক্ষমতা ও দুর্নীতিকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বড় বাজেট করাই সাফল্য নয়। দুর্নীতি ও অপচয় বন্ধ না হলে জনগণ এর সুফল পাবে না। উন্নয়ন বাজেটের বড় অংশ বছরের শেষ তিন মাসে ব্যয়ের প্রবণতাও বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। এ জন্য অর্থবছর জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর করার প্রস্তাব পুনর্ব্যক্ত করেন জামায়াত আমীর।

বাজেট প্রসঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, বাজেটকে বলা হচ্ছে সর্বকালের সর্ববৃহৎ বাজেট। কিন্তু আমরা যদি মানি অ্যান্ড মার্কেট ইনফ্লেশনের কথা চিন্তা করি তাহলে এটাকে সর্বকালের সর্ববৃহৎ বাজেট বলা যাবে না। অনেকটা বাজারের সঙ্গে এটা সংগতিপূর্ণ। বড় বাজেট করা কোনো অপরাধ নয়। একটা জাতির মিশন থাকলে বড় বাজেট লাগবে।

চ্যালেঞ্জটা কয়েক জায়গায় একটা হলো- বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতার চাইতে বড় হলো দুর্নীতি। এই দুই জায়গায় যদি বড় সংস্কার আনা না যায়, বাজেট হবে কিন্তু বাজেটের প্রকৃত সুফল জনগণ পাবে না। এই বাজেট থেকেই তো ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে চলে গেছে। যদি এই দুই জিনিসের সংস্কার না হয় আবার যাবে। এই বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা শুধু এনবিআরের না। এনবিআর হলো আমাদের কালেক্টর। কিন্তু এক্সিকিউশন এক্সিকিউটিভ ডিপার্টমেন্টের ওপর।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, জুলাইয়ের আত্মত্যাগের কারণেই বর্তমান সংসদ ও রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। অথচ বাজেটে জুলাই জাদুঘর ও জুলাই ফাউন্ডেশনের জন্য কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি, যা হতাশাজনক।

তিনি বলেন, ৮৫ হাজার টাকা খরচ করে মালয়েশিয়ায় লোক পাঠাতে হবে এমন দাবি তুলেছিলাম সংসদে। এই কারণে অনেক সিন্ডিকেট আমার বিরুদ্ধে ক্ষেপে গিয়ে হুমকি দিচ্ছে। জনগণের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে কোনো সিন্ডিকেটের কোনো হুমকির তোয়াক্কা করবো না, ইনশাআল্লাহ।

সংসদকে দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সংসদ গান-বাজনা বা অপ্রয়োজনীয় বিতর্কের জায়গা নয়। জনগণের করের অর্থে পরিচালিত সংসদে জনগণের সমস্যা, সমাধান এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়েই আলোচনা হওয়া উচিত।

তিনি বলেন, জামায়াত দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবে। সরকার ভালো কাজ করলে সমর্থন দেয়া হবে, আর জনগণের স্বার্থবিরোধী কোনো পদক্ষেপ নিলে তার বিরোধিতা করা হবে।
তিনি বলেন, দায়িত্ব শুধু রাজনীতিবিদদের নয়; রাষ্ট্রের চারটি পিলারকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। একটি খুঁটি না থাকলে যেমন ভবন ভেঙে পড়ে, তেমনি রাষ্ট্রও দুর্বল হয়ে পড়ে। গণমাধ্যম রাষ্ট্রের ‘ওয়াচডগ’ হলেও কোনো সরকারই প্রকৃত অর্থে গণমাধ্যমকে প্রয়োজনীয় পরিসর দেয়নি। সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলুন।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে জামায়াত আমীর জানান, দলের ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ ইতিমধ্যে গঠন করা হয়েছে এবং তারা কাজ শুরু করেছে। এটি শুধু বিরোধী দলে থাকার জন্য নয়, ভবিষ্যতেও একটি স্থায়ী কাঠামো হিসেবে নীতিগত পরামর্শ দিয়ে যাবে।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি আরও জানান, অর্থবছর পরিবর্তনের লক্ষ্যে তারা সংসদে একটি বেসরকারি বিল আনবেন। সংসদের ভেতরে ও বাইরে তাদের আন্দোলন হবে সম্পূর্ণ অহিংস। সংসদে ফাইল ছোড়াছুড়ি কিংবা রাজপথে বিশৃঙ্খলার রাজনীতিতে তারা বিশ্বাস করেন না। তবে ভারসাম্য বজায় রেখে সব বিষয়ে সংসদে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, জাতীয় স্বার্থে তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। আমরা স্বাধীন ও সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতিতে বিশ্বাস করি এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কোনো আপস করবো না।

মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ও সংসদ সদস্য এটিএম আজহারুল ইসলাম ও সংসদ সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি, সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সংসদ সদস্য মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর এবং সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুল, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সংসদ সদস্য সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর মো. সেলিম উদ্দিন, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ও জাতীয় সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এবং সংসদ সদস্য ড. নাজিবুর রহমান মোমেন, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি এডভোকেট আতিকুর রহমান ও সংসদ সদস্য হাফেজ রাশেদুল ইসলাম প্রমুখ।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন