ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেষ মুহূর্তে বান্দরবানে জমে উঠেছে প্রচার-প্রচারণা। প্রার্থীরা ছুটে বেড়াচ্ছেন দূর-দূরান্তে। মারমা, চাকমা, ম্রো, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, বম, খুমি, লুসাই, খেয়াং, পাংখোয়া, চাক ও বাঙালিসহ ১৪টি জাতিগোষ্ঠীর বসবাস এই জেলায়। তবে জোটবদ্ধ বহিরাগত প্রার্থী ঘোষণায় বান্দরবান ৩০০নং সংসদীয় আসনে নির্বাচনী হাওয়া অনেকটায় বদলে গেছে। ভোটারদের মধ্যে নির্বাচনী আমেজে ভাটা দেখা যাচ্ছে। এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বান্দরবান-৩০০ সংসদীয় আসনে লড়ছেন চারজন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী। এরা হলেনÑ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) থেকে ধানের শীষ প্রতীকে রাজপুত্র সাচিং প্রু জেরী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে শাপলা কলি প্রতীকে আবু সাঈদ মো. সুজা উদ্দিন, জাতীয় পার্টি (কাদের) থেকে লাঙ্গল প্রতীকে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আবু জাফর মো. ওয়ালী উল্লাহ এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে হাতপাখা প্রতীকে মাওলানা মো. আবুল কালাম আজাদ। প্রার্থীদের মধ্যে বিএনপি’র সাচিং প্রু জেরী ছাড়া অন্য তিনজনই প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। জাতীয় পার্টি এবং জামায়াত-এনসিপি জোট প্রার্থী দু’জনেই বান্দরবান জেলার ভোটার না, যা ভোটারদের মধ্যে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে।
স্থানীয় ভোটারদের মতে, প্রচার-প্রচারণায় তুলনামূলকভাবে এগিয়ে রয়েছেন বিএনপি প্রার্থী সাচিং প্রু জেরী ও এনসিপি প্রার্থী আবু সাঈদ মো. সুজাউদ্দিন। তবে জাতীয় পার্টি (কাদের) ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রচার-প্রচারণা সাধারণ ভোটারদের চোখে ততটা দৃশ্যমান নয়। তবে সম্প্রীতির জেলা হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের ভোটারদের প্রত্যাশা একটাই, যে দলই ক্ষমতায় আসুক, পাহাড়ের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেয়া এবং এই অঞ্চলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, সমঅধিকার নিশ্চিতকরণ, পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্ব দিবেন।
নতুন তরুণ ভোটার সাদিয়া মাশরিকা মাইশা, থুইচা মংসহ বেশ কয়েকজন বলেন, দেশের বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্যের লীলাভূমি হলো পাবর্ত্য বান্দরবান। এখানে পর্যটন শিল্প এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। যে ব্যক্তি এই অঞ্চলের মানুষের স্পন্দন বুঝতে সক্ষম তাকেই ভোট দেবো। বিএনপি প্রার্থী রাজপুত্র সাচিং প্রু জেরী বলেন, জেলার প্রতিটি উপজেলায় নির্বাচনী প্রচারে তিনি ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন। সাধারণ মানুষের আরও কাছাকাছি পৌঁছানোর লক্ষ্যেই তিনি নিয়মিত মাঠপর্যায়ে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। বিএনপি বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে পিছিয়ে পড়া পাহাড়ি অঞ্চলের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হবে। জাতীয় নাগরিক পার্টির শাপলা কলি প্রতীকের প্রার্থী আবু সাঈদ মো. সুজাউদ্দিন বলেন, ভোটাররা এখন বিকল্প নেতৃত্ব ও বাস্তবসম্মত পরিবর্তনের দিকে তাকিয়ে আছে। তরুণদের নিয়ে বান্দরবানে অনেক কিছু করার সুযোগ রয়েছে যা বিগত সরকারগুলো বাস্তবায়ন করতে পারেনি। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, খেলাধুলার আয়োজন এবং বিভিন্ন সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে তরুণদের সম্পৃক্ত করা গেলে পরিবার ও দেশের অগ্রগতি স্বাভাবিকভাবেই নিশ্চিত হবে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাওলানা মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, আমাদের লক্ষ্য দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও সমঅধিকার নিশ্চিত করা। দুর্গম এলাকায় প্রচার কিছুটা চ্যালেঞ্জ হলেও শেষ পর্যন্ত সব এলাকা কাভার করার চেষ্টা করছি।
জাতীয় পার্টির প্রার্থী আবু জাফর মোহাম্মদ ওয়ালীউল্লাহ বলেন, বান্দরবানের সবচেয়ে বড় সমস্যা যোগাযোগ ব্যবস্থা। এটিকে বিশ্বমানের পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। এদিকে পাহাড়ে আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর অবস্থান খুবই শক্ত। বিশেষত জনসংহতি সমিতি জেএসএস’র একটা ভোটব্যাংক রয়েছে বান্দরবান জেলায়। তবে এবারের নির্বাচনে পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠনগুলো অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো নেতা বা সংগঠন কাকে সমর্থন করবে সে বিষয়ে কিছুই জানায়নি। ফলে তাদের সমর্থক ভোটগুলো শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যাবে তা নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে নানা আলোচনা ও কৌতূহল রয়েছে। তবে জেএসএস যাকে সমর্থন করবে সেই প্রার্থীরই জয় হবার সম্ভাবনা বেশি রয়েছে। সেক্ষেত্রে একমাত্র পাহাড়ি প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রার্থী রাজপুত্র সাচিং প্রু জেরী অনেকটাই এগিয়ে।
উল্লেখ্য, বান্দরবান আসনে মোট ভোটার সংখ্যা হলো ৩ লাখ ১৫ হাজার ৪২২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৬১ হাজার ৭৭৫ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৫৩ হাজার ৬৪৭ জন। এবার নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছেন ৭ হাজার ৪৬৯ জন। জেলার সাতটি উপজেলা, দু’টি পৌরসভা ও ৩৪টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই আসনে মোট ভোটকেন্দ্র ১৮৬টি। এর মধ্যে ১৫৮টি ভোটকেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বান্দরবানে শেষ মুহূর্তের প্রচারে ব্যস্ত প্রার্থীরা
নুরুল কবির, বান্দরবান থেকে
৯ ফেব্রুয়ারি (সোমবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
