যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরান সংক্রান্ত মার্কিন নীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন। বৈঠকগুলোতে ওয়াশিংটন তেহরানের সঙ্গে চলমান পারমাণবিক আলোচনা অব্যাহত রাখবে, নাকি আবারও বিস্তৃত সামরিক হামলা শুরু করবে- সেই বিষয়টি পর্যালোচনা করা হয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ আলোচনার সঙ্গে পরিচিত কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল (ডব্লিউএসজে)। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে আবারও ব্যাপক সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাব্য বিভিন্ন বিকল্প সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে।
তবে আপাতত তিনি কূটনৈতিক আলোচনাই চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ডব্লিউএসজে জানায়, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা বৈঠকে অংশ নেন। সেখানে আলোচনা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে আলোচনা পরিত্যাগ করে পূর্ণমাত্রার সামরিক হামলায় ফিরবে কি না। প্রশাসনের অভ্যন্তরে কঠোর সামরিক বিকল্পটিকে কিছু কর্মকর্তা অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘ফিনিশিং দ্য জব’ (কাজটি সম্পূর্ণ করা) বলে উল্লেখ করেন। যদিও প্রশাসনের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ানোর প্রশ্নে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে, তবুও ট্রাম্প এখনও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। বরং তিনি কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার পক্ষেই ঝুঁকেছেন। ট্রাম্পের মতে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চলমান নাজুক আলোচনার মধ্যে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু হলে সেই আলোচনা ভেঙে পড়তে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প তার উপদেষ্টাদের জানিয়েছেন যে, ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনা ১৮ আগস্টের নির্ধারিত সময়সীমার পরেও চলতে দিলে তার আপত্তি নেই। অর্থাৎ, কূটনীতিকে সফল হওয়ার জন্য তিনি অতিরিক্ত সময় দিতে প্রস্তুত। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আলোচনাকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে আবদ্ধ না রেখে নমনীয়তা বজায় রাখাই এর উদ্দেশ্য । তবে একই সঙ্গে ট্রাম্প সীমিত পরিসরের প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের সম্ভাবনাও খোলা রেখেছেন। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ইরান যদি পূর্বে যুদ্ধবিরতি কাঠামো গঠনে সহায়ক হওয়া একটি সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘন করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র এককালীন লক্ষ্যভিত্তিক হামলা চালাতে পারে। মার্কিন প্রশাসনের একটি অংশের মতে, এ ধরনের সীমিত হামলা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে না গিয়েও ইরানের ওপর চাপ বজায় রাখার কার্যকর উপায় হতে পারে। ডব্লিউএসজে আরও জানায়, কাতারের রাজধানী দোহায় মধ্যস্থতাকারীদের উদ্যোগে পরোক্ষ আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী, মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার নতুন দফার আলোচনার জন্য দোহায় অবস্থান করছেন। তবে ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তারা দোহায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সরাসরি বৈঠকে বসবে না। আলোচনার অন্যতম প্রধান অচলাবস্থার বিষয় হলো, কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর সেবামূলক ফি আরোপের ইরানের প্রস্তাব। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের জ্বালানি সরবরাহ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, আন্তর্জাতিক নীতিমালা অনুযায়ী হরমুজ প্রণালি সব দেশের জন্য অবাধ নৌচলাচলের পথ হিসেবে উন্মুক্ত থাকতে হবে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট বলেছেন, বৃহত্তর আলোচনায় ইরান সহযোগিতামূলক আচরণ করেনি। তবে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর এসকর্ট অভিযানের প্রশংসা করে বলেন, এসব কার্যক্রমের ফলে চলমান উত্তেজনার মধ্যেও বৈশ্বিক তেলের সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়েছে। ভুল বোঝাবুঝি বা অনাকাঙ্ক্ষিত সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি কমাতে যুক্তরাষ্ট্র ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)-এর মধ্যে একটি সংকটকালীন যোগাযোগ চ্যানেল চালু করেছে বলেও কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন।
তাদের মতে, এই যোগাযোগ ব্যবস্থা ইতোমধ্যেই সক্রিয় রয়েছে এবং কূটনৈতিক ও সামরিক চাপ একসঙ্গে চলতে থাকলেও উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের গবেষক সুজান ম্যালোনি বলেন, যুদ্ধ ছাড়াও ট্রাম্প প্রশাসনের হাতে এখনও বিভিন্ন ধরনের চাপ প্রয়োগের উপায় রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের জব্দকৃত সম্পদের ওপর আর্থিক নিয়ন্ত্রণ এবং সামুদ্রিক বাণিজ্য ও নৌপথে প্রবেশাধিকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক চাপ। তবে তার সতর্কবার্তা, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক নীতিকে কেন্দ্র করে উভয় পক্ষের মৌলিক মতপার্থক্য বহাল থাকলে এসব চাপের কার্যকারিতা সীমিত হতে পারে। সামগ্রিকভাবে এসব ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারণে বর্তমানে দুটি লক্ষ্য পাশাপাশি চলছে- একদিকে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক অগ্রগতি ধরে রাখা, অন্যদিকে সামরিক প্রতিরোধক্ষমতার বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখা। ট্রাম্প প্রশাসন একদিকে নতুন করে বৃহৎ আকারের সংঘাত এড়াতে চাইছে, অন্যদিকে তেহরানের ওপর চাপও অব্যাহত রাখতে চায়।
