বেইজিংয়ের আকাশচুম্বী ভবনে বিমান বিধ্বস্ত, মুখ খোলেনি চীন

বেইজিংয়ের আকাশচুম্বী ভবনে বিমান বিধ্বস্ত, মুখ খোলেনি চীন

ফন্ট সাইজ:

চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের সবচেয়ে উঁচু আকাশচুম্বী ভবনে একটি ছোট বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। দুর্ঘটনায় বিমানের একমাত্র আরোহী পাইলট নিহত হয়েছেন এবং আরও ১৩ জন আহত হয়েছেন। তারপর চার দিন পেরিয়ে গেছে। তবে কীভাবে এবং কেন এই দুর্ঘটনা ঘটল, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়নি চীনা কর্তৃপক্ষ। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র বেইজিং ডেইলি’তে প্রকাশিত মাত্র ৬০ শব্দের একটি প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার মৌলিক তথ্য জানানো হয়েছে। এ পর্যন্ত এটিই এ ঘটনায় চীনের একমাত্র আনুষ্ঠানিক বিবৃতি। দুর্ঘটনাটি ঘটেছে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সদর দপ্তর ঝোংনানহাই থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে। শুক্রবারের এই দুর্ঘটনায় ১০৯ তলা সিটিক টাওয়ারের এক পাশে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে, যা পরে অস্থায়ীভাবে ঢেকে দেয়া হয়েছে। দুর্ঘটনার নাটকীয় ভিডিওগুলো ইন্টারনেট থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। অন্তত তিনটি বিমান চলাচল সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তাদের হালকা বিমান পরিচালনা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলতে তারা অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তাদের ভাষ্য, বিষয়টি নিয়ে কথা না বলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

সরকারি তথ্যের অভাবে এখন নানা জল্পনা-কল্পনা ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, বিশ্বের সবচেয়ে কঠোর আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার অন্যতম একটি শহরে কীভাবে একটি ছোট বিমান ঢুকে পড়ল। চীনে সেন্সরশিপ নতুন কোনো বিষয় নয়। কমিউনিস্ট পার্টি, দেশের শীর্ষ নেতা বা সরকারের সমালোচনা খুব কমই প্রকাশ্যে দেখা যায়। রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বা সমালোচনামূলক যেকোনো আলোচনা দ্রুতই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইন্টারনেট থেকে সরিয়ে ফেলা হয়। তবে এবার সেন্সরশিপ শুধু দুর্ঘটনার খবরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। সিটিক টাওয়ারে সঙ্গে দুর্ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই- এমন সাধারণ ছবি, এমনকি ভবনটি নিয়ে তৈরি বিভিন্ন মিমও চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে মুছে ফেলা হয়েছে।

চীনা ঐতিহ্যবাহী মদের পাত্রের আদলে নির্মিত ভবনটি বেইজিংয়ের একটি জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থাপনা। অনেকেই এটিকে সৌভাগ্যের প্রতীক মনে করেন। পরীক্ষায় ভালো ফল, চাকরি কিংবা জীবনের বিভিন্ন সাফল্যের আশায় তরুণ-তরুণীরা প্রায়ই ভবনটির সামনে যান বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর ছবি শেয়ার করে শুভকামনা প্রার্থনা করেন। আই অন ডিজিটাল চায়না নিউজলেটারের সম্পাদক মানিয়া কুয়েটসে মনে করেন, এবার এত দ্রুত ও ব্যাপক সেন্সরশিপ চালুর কারণ হতে পারে বেইজিংয়ের শীর্ষ নেতৃত্ব এখনো নিশ্চিত নয় যে আসলে কী ঘটেছিল। তিনি বলেন, এটি অত্যন্ত অস্বাভাবিক একটি ঘটনা। এই দুর্ঘটনা সরকারের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং কমিউনিস্ট পার্টির গুরুত্বপূর্ণ প্রচার-বার্তার জন্যও এটি বিব্রতকর।

যেসব বিমান চলাচল প্রতিষ্ঠান বিবিসিকে নিশ্চিত করেছে যে, কর্তৃপক্ষ হালকা বিমানের উড্ডয়ন বন্ধ রেখেছে, তারাও এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে রাজি হয়নি। বেইজিংয়ের একটি ফ্লাইট প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা বলেন, আমাদের এ বিষয়ে কথা না বলতে বলা হয়েছে। অনুগ্রহ করে অন্য কাউকে জিজ্ঞাসা করুন। চেংদুর আরেকটি প্রতিষ্ঠানও নির্দেশটি কোন কর্তৃপক্ষ দিয়েছে তা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়ে দ্রুত ফোন কেটে দেয়। বেইজিংয়ের রাজনৈতিক কেন্দ্রজুড়ে প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় স্থায়ীভাবে উড্ডয়ন নিষিদ্ধ অঞ্চল (নো-ফ্লাই জোন) কার্যকর রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তিয়ানআনমেন স্কয়ার এবং ঝোংনানহাই- যেখানে চীনের শীর্ষ নেতারা বসবাস ও কাজ করেন। চীনবিষয়ক বিশ্লেষক বিল বিশপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, এটি নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভয়াবহ লঙ্ঘন। তিনি বলেন, আর কয়েক সেকেন্ড উড়ে গেলেই বিমানটি ঝোংনানহাইয়ে আঘাত হানতে পারত। সেটি হলে বেইজিংয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য এক ধরনের ভূমিকম্পের সমান ঘটনা হতো।

নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে সম্প্রতি ড্রোন ব্যবহারের নিয়মও আরও কঠোর করেছে বেইজিং। এখন রাজধানীতে ড্রোন আনা বা বাইরে নেয়ার আগে অবশ্যই নিবন্ধন করতে হয়। শিকাগো কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স-এর গবেষণা বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট রেমন্ড কুয়ো বলেন, অধিকাংশ ড্রোনের তুলনায় অনেক বড় একটি ছোট বিমান শহরের বড় অংশ অতিক্রম করে ঝোংনানহাইয়ের এত কাছে পৌঁছে যেতে পারা রাজনৈতিকভাবে বিব্রতকর এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় ধরনের ব্যর্থতা। তার মতে, এটি পাইলটের ভুল বা যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ঘটতে পারে। তবে এটি ইচ্ছাকৃত ঘটনাও হতে পারে। এমন আশঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যায় না।

ফ্লাইট ট্র্যাকিং সেবা ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনাকবলিত বিমানটি ছিল চীনা প্রতিষ্ঠান সানওয়ার্ড এয়ারক্রাফট নির্মিত দুই আসনের এক ইঞ্জিনবিশিষ্ট অরোরা এসএ৬০এল। ৬ দশমিক ৯ মিটার দীর্ঘ এবং ৮ দশমিক ৬ মিটার ডানার বিস্তৃতির এই বিমান মূলত ভ্রমণ, আকাশ থেকে আলোকচিত্র ধারণ এবং বিনোদনমূলক উড্ডয়নের জন্য তৈরি। চীনের বাইরে অনেকের কাছে শুক্রবারের এই ঘটনা ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। সেদিন আত্মঘাতী হামলাকারীরা যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে নিউইয়র্কের দুটি আকাশচুম্বী ভবনে আঘাত হেনেছিল, যাতে হাজারো মানুষ নিহত হন।

রেডিটে একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, ৯/১১-এ প্রথম টাওয়ারে বিমান আঘাত হানার সময় আমি ঠিক এমনই একটি সংবাদ সতর্কবার্তা পেয়েছিলাম। কার্নেগি চায়না-এর নন-রেসিডেন্ট গবেষক চং জা ইয়ান বলেন, এই ঘটনার সঙ্গে আরও বেশি মিল রয়েছে ১৯৮৭ সালের একটি ঘটনার। তখন শীতল যুদ্ধের শেষ দিকে জার্মান অপেশাদার পাইলট ম্যাথিয়াস রাস্ট একটি ছোট বিমান উড়িয়ে মস্কোর রেড স্কয়ারে অবতরণ করেন। তিনি বলেন, রাস্টের সেই উড্ডয়ন ও অবতরণ সোভিয়েত ইউনিয়নের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুতর দুর্বলতা প্রকাশ করে দেয়। ওই ঘটনার পর আকাশ প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেয়া হয়। তার মতে, বেইজিংয়ের এই বিমান দুর্ঘটনার পরও একই ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে।

চং জা ইয়ান বলেন, একটি ছোট বিমান যদি সিটিক টাওয়ারে আঘাত হানতে পারে, তাহলে কোনো ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্রও তা করতে সক্ষম হতে পারে। এটি বেইজিংয়ের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর জন্য নিঃসন্দেহে একটি বড় ধরনের বিব্রতকর ঘটনা।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন