যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নিলেই সে মার্কিন নাগরিক

সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী রায়

যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নিলেই সে মার্কিন নাগরিক

ফন্ট সাইজ:

যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট একটি যুগান্তকারী রায় দিয়েছে। ওই রায়ে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেয়া শিশুরা সংবিধান অনুযায়ী জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকারী। অথচ শিশুদের এই অধিকার থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করেছেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অধিকারের রীতি প্রায় ১৫০ বছর ধরে চালু। কিন্তু হঠাৎ করে এ বছর সেই রীতি বাতিল করেন ট্রাম্প। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিয়েছে, তা তার জন্য চরম এক আঘাত। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। এতে বলা হয়, ৬-৩ ভোটের রায়ে প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ‘অবৈধভাবে বা সাময়িকভাবে অবস্থানরত’ বাবা-মায়ের ঘরে জন্ম নেয়া শিশুরাও সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর অধীনে জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার চেষ্টা করেছিলেন। তার প্রশাসনের যুক্তি ছিল, অবৈধ অভিবাসী এবং কিছু অস্থায়ীভাবে অবস্থানরত বিদেশির সন্তানরা সংবিধানে উল্লেখিত ‘যুক্তরাষ্ট্রের এখতিয়ারের অধীন’ নয়। তাই তারা জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্য নয়। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের এই রায় ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নাগরিক অধিকারবিষয়ক বিভিন্ন সংগঠন রায়টিকে স্বাগত জানিয়েছে। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প এই সিদ্ধান্তকে খুবই দুর্ভাগ্যজনক বলে মন্তব্য করেন এবং আইন প্রণয়নের মাধ্যমে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বাতিলের লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেন। তিনি বলেন, দীর্ঘ ও জটিল কোনো সাংবিধানিক সংশোধনীর প্রয়োজন নেই। কংগ্রেসের উচিত এদিন থেকেই আমাদের দেশের জন্য ব্যয়বহুল এবং অন্যায্য জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অবসান ঘটাতে কাজ শুরু করা।

১৮৬৮ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেয়া প্রত্যেক ব্যক্তিকে নাগরিকত্ব দেয়া হচ্ছে। এই অধিকার যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায়ের মাধ্যমে তা আরও সুদৃঢ় হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে গৃহযুদ্ধের পর সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত দাসদের অধিকার নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে প্রণীত ১৪তম সংশোধনীতে বলা হয়েছে, ‘যারা যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করেছে বা নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের এখতিয়ারের অধীন, তারা সবাই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক।’

সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতে প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস লিখেছেন, তখন যেমন ছিল, এখনও তেমনি। নাগরিকত্ব মানে অধিকার ভোগের অধিকার এবং আমাদের রাজনৈতিক সমাজে স্বাধীনভাবে অংশগ্রহণের অধিকার। তিনি আরও লিখেছেন, ১৪তম সংশোধনীর প্রণেতারা এই প্রতিশ্রুতি ‘এই দেশের প্রতিটি স্বাধীনভাবে জন্ম নেয়া মানুষের’ জন্য সম্প্রসারিত করেছিলেন। রবার্টস বলেন, আজ আমরা সেই প্রতিশ্রুতিই রক্ষা করছি।

ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি ছিল, ১৪তম সংশোধনীতে ব্যবহৃত ‘যুক্তরাষ্ট্রের এখতিয়ারের অধীন’ বাক্যাংশটি এমন ব্যক্তিদের সন্তানদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, যাদের বাবা-মা স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন না। সুপ্রিম কোর্টের নয়জন বিচারপতির মধ্যে তিনজন এই রায়ের বিরোধিতা করেন। তারা হলেন বিচারপতি ক্লারেন্স থমাস, নিল গরসাচ এবং স্যামুয়েল আলিটো। বিচারপতি ক্লারেন্স থমাস বলেন, ১৪তম সংশোধনীকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নতুনভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে’। তিনি যুক্তি দেন, এই সংশোধনী মূলত যেসব সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত দাসদের জন্য করা হয়েছিল, তারা ছিলেন আমেরিকান এবং অন্য কোনো দেশের প্রতি তাদের আনুগত্য ছিল না। ভিন্নমত দেওয়া আরেক বিচারপতি স্যামুয়েল আলিটো রায়টিকে গুরুতর ভুল বলে অভিহিত করেন। তার মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে কার্যত যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেয়া প্রায় সবাই নাগরিকত্ব পাবে। এমনকি যারা শুধু সন্তান জন্ম দেয়ার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে যান এবং পরে নিজ দেশে ফিরে যান, তাদের সন্তানরাও নাগরিকত্ব পাবে।

মামলাটি প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত মৌখিক শুনানিতে উপস্থিত থেকে সুপ্রিম কোর্টের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন, যা ছিল বিরল এবং ঐতিহাসিক একটি ঘটনা। হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার কঠোর অভিবাসন নীতির জোরালো সমর্থক। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এই রায়কে সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক এবং ন্যক্কারজনক সিদ্ধান্তগুলোর একটি বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আমেরিকার নাগরিকত্ব বিশ্বের সবার জন্মগত অধিকার নয়। সংবিধানের কোনো বিধানকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না, যাতে আমাদের জাতীয় পরিচয়ই বিলীন হয়ে যায়।

অন্যদিকে অভিবাসন অধিকারকর্মী এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচকরা এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন। মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্রেট দলের নেতা হাকিম জেফ্রিজ বলেন, সংবিধান অনুসরণ করে এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট অবশেষে নিশ্চিত করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেয়া সব মানুষই আমেরিকান নাগরিক। তিনি বলেন, এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন নেই, ভবিষ্যতেও থাকবে না। লইয়ার্স কমিটি ফর সিভিল রাইটস আন্ডার ল’-এর প্রধান আইনজীবী দারিয়েলি রদ্রিগেজ বলেন, এই রায় এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে আমরা যা সত্য বলে জানি, সেটিকেই আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তিনি বলেন, যে কেউ আমেরিকার মাটিতে জন্ম নেবে, তার বাবা-মায়ের আইনি অবস্থান যা-ই হোক না কেন, সে জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই একজন আমেরিকান নাগরিক হবে। একটি জাতি হিসেবে আমরা আমাদের সম্মিলিত সংকল্পের কঠিন পরীক্ষা অতিক্রম করেছি এবং শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছি।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন