লাতিন আমেরিকার প্রতি ট্রাম্পের আল্টিমেটাম: ট্রাম্প নাকি শি

লাতিন আমেরিকার প্রতি ট্রাম্পের আল্টিমেটাম: ট্রাম্প নাকি শি

ফন্ট সাইজ:

প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প পশ্চিম গোলার্ধে তাঁর আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতির পক্ষে নানা যুক্তি তুলে ধরেন। তবে একটি বিষয় তার শীর্ষ পররাষ্ট্রনীতি উপদেষ্টাদের সবচেয়ে বেশি ঐক্যবদ্ধ করে। তাহলো চীনকে মোকাবিলা করা। এই লক্ষ্য একত্রিত করেছে দীর্ঘদিন ধরে চীনবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং অতীতে বিদেশে আমেরিকার সম্পৃক্ততা নিয়ে সমালোচনা করা ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। এটি প্রভাবিত করেছে ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলাকেও। তিনি দীর্ঘদিন ধরে লাতিন আমেরিকা থেকে মাদক ও অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধে মনোযোগী। একইভাবে পেন্টাগনের নীতিবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি এলব্রিজ কোলবি চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান হুমকি হিসেবে দেখেন। এমন মন্তব্য করেছেন ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের চিফ অব স্টাফ আলেকজান্দার গ্রা। তাদের সবাইকে এই বিশ্বাসে একত্রিত করে যে, যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই পশ্চিম গোলার্ধকে চীনা প্রভাবমুক্ত করতে হবে।
বর্তমানে আমেরিকান গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজিসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও আলেকজান্দার গ্রা। তিনি বলেন, আপনি যদি নিজ দেশকে রক্ষা করতে চান, তবে প্রথমে আপনাকে এই গোলার্ধে প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এরপর সেখান থেকে আপনি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের মতো বড় প্রতিযোগিতামূলক ক্ষেত্রের দিকে শক্তি প্রক্ষেপণ করতে পারবেন।
এই দৃষ্টিভঙ্গি বুঝিয়ে দেয় যে, প্রশাসন পশ্চিম গোলার্ধে প্রভাব বিস্তারে কতদূর যেতে পারে এবং চীনের অর্থনৈতিক সম্প্রসারণকে তারা কতটা জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানান, ‘বিশেষ করে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি ও পিপলস লিবারেশন আর্মি-প্রভাবিত কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে পশ্চিম গোলার্ধে চীনের অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।’
হোয়াইট হাউস সরাসরি চীনের নাম উল্লেখ না করলেও ‘প্রতিপক্ষদের’ মোকাবিলা এবং মনরো নীতিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা বলেছে। মুখপাত্র আনা কেল বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে মনরো নীতিকে পুনরায় কার্যকর করার কথা বলেছেন, যাতে পশ্চিম গোলার্ধে আমেরিকার প্রাধান্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা, প্রতিপক্ষদের মোকাবিলা, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং মাদক পাচার বন্ধ করা যায়।
এপ্রিলের শুরুতে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বেইজিং সফরের প্রস্তুতি চললেও, ট্রাম্প প্রশাসন বছরের শুরু থেকেই এমন পদক্ষেপ নিয়েছে যা আমেরিকায় চীনের অবস্থান দুর্বল করে।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করা তার বড় উদাহরণ। কারণ চীন ছিল ভেনেজুয়েলার তেলের প্রধান ক্রেতা। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে কিউবা ও ভেনেজুয়েলা বিষয়ক ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ক্যারি ফিলিপেটি বলেন, এটি ছিল জাতীয় নিরাপত্তা এবং চীনের ‘শ্যাডো ফ্লিট’ মোকাবিলার কৌশল।
প্রশাসন কিউবার ওপর চাপ বাড়িয়েছে, পানামাকে হুমকি দিয়েছে- যে দেশটি প্রথম লাতিন আমেরিকান রাষ্ট্র হিসেবে বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগে যোগ দেয় এবং ব্রাজিলের সঙ্গেও উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, চীন ও রাশিয়ার প্রভাব ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা নিতে হবে। পেরুর চানকাই মেগা-পোর্ট-চীনের অর্থায়নে নির্মিত। এ নিয়ে নিয়ন্ত্রণ সংকটও চীনের প্রভাব বৃদ্ধির ঝুঁকির উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
লাতিন আমেরিকার কিছু ডানপন্থী নেতা এ নীতির প্রশংসা করলেও বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ উল্টো ফল দিতে পারে। সাবেক মার্কিন সাউদার্ন কমান্ডের বিশেষ সহকারী লেল্যান্ড লাজারাস বলেন, স্বল্পমেয়াদে দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের চাপে নতি স্বীকার করতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি সম্পর্ক নষ্ট করবে এবং চীনের জন্য সুযোগ তৈরি করবে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কারনি সম্প্রতি বেইজিং সফর করেছেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বাণিজ্য বৈচিত্র্য আনার প্রচেষ্টার অংশ। অন্যদিকে মার্কিন কর্মকর্তারা আগেই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সংঘর্ষের পথে রয়েছে। এলব্রিজ কোলবি ২০২৪ সালে বলেন, চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাত এড়াতেই আমাদের সেটিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সময়ে জেডি ভ্যান্স চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় হুমকি বলেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিটি হেগসেঠও চীনের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি নিয়ে সতর্ক করেছেন।
প্রশাসন চীনের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে ১৪৫ শতাংশ পর্যন্ত করেছে। পাল্টা হিসেবে চীন গুরুত্বপূর্ণ খনিজ রপ্তানি কমালে পরিস্থিতি শিথিল করার চেষ্টা হয়।
জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে সরাসরি চীনের নাম না থাকলেও ‘বিদেশি কোম্পানিকে অঞ্চল থেকে সরিয়ে দেয়া’ এবং ‘অ-গোলার্ধীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রভাব বাড়ানো কঠিন করে তোলা’-এর মতো ভাষায় বেইজিংকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
চীনের সঙ্গে লাতিন আমেরিকার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ৫৬৫ বিলিয়ন ডলার, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তা ৩৪৬ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া ৩৩টি দেশের মধ্যে ২২টি দেশ শি জিনপিংয়ের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে।
সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত স্টিফেন ম্যাকফারল্যান্ড বলেন, ‘প্রশ্ন হলো- চীনা অর্থায়নের বিকল্প কী? মার্কিন কোম্পানিগুলো বড় প্রকল্পে আগ্রহ দেখায়নি।’
চিলির সাবেক রাষ্ট্রদূত জোর্জ হেইনি বলেন, ‘আজ বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল অঞ্চল এশিয়া, বিশেষ করে চীন। আপনি যদি লাতিন আমেরিকার অর্থমন্ত্রী হন, তাহলে কেন সেই সুযোগ হাতছাড়া করবেন?’
ট্রাম্প প্রশাসন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থায়ন করপোরেশনের তহবিল বাড়িয়েছে এবং ইউএস ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এজেন্সিকে বাজেট কাটছাঁট থেকে রক্ষা করেছে। তবে সাবেক কর্মকর্তা ব্রায়ান নিকোলস বলেন, ‘বহু বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় লাগে। আমরা এখনো চীনের মতো দ্রুত নই।’
সব মিলিয়ে, ট্রাম্প প্রশাসনের বার্তা স্পষ্ট- লাতিন আমেরিকাকে বেছে নিতে হবে: ওয়াশিংটন, না বেইজিং।

(অনলাইন পলিটিকো থেকে অনুবাদ)

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন