উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও কয়েকদিনের বৃষ্টিতে কুড়িগ্রাম, রংপুর, লালমনিরহাটসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় আকস্মিক বন্যা দেখা দিয়েছে। এতে ওইসব জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার দুধকুমার নদের বেড়িবাঁধ ভেঙে বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের অন্তত ২০ গ্রামের হাজারো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। জেলার পাঁচ উপজেলায় বীজতলা, পাট ও শাকসবজি সহ ২০৪ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। লালমনিরহাটে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলার কালীগঞ্জ, পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, আদিতমারী ও সদর উপজেলার তিস্তা নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ফলে শত শত পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। রংপুরেও তিস্তার পানি বাড়ছে।
স্টাফ রিপোর্টার, কুড়িগ্রাম জানান, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার দুধকুমার নদের মুড়িয়ারহাট এলাকার বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে ঢুকছে পানি। উজানের ঢল আর টানা বৃষ্টিতে উপজেলার বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের অন্তত ২০ গ্রামের হাজারো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া জেলার পাঁচ উপজেলায় বীজতলা, পাট ও শাকসবজিসহ ২০৪ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে।
সোমবার দুপুরে পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, উজানের ঢলে জেলার সব নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ধরলা নদীর পানি কুড়িগ্রাম পয়েন্টে বিপদসীমার ৪৮ সেন্টিমিটার, ব্রহ্মপুত্র নদের পানি নুনখাওয়া পয়েন্টে ৮৫ সেন্টিমিটার ও চিলমারী পয়েন্টে ৬৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। দুধকুমার নদের পানি পাটেশ্বরী পয়েন্টে বিপদসীমার ২৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তা নদীর পানি কাউনিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কু?ড়িগ্রাম কৃ?ষি সম্প্রসারণ অ?ধিদপ্তর সূত্র জা?নি?য়ে?ছে, পানি বৃদ্ধির ফলে কুড়িগ্রাম সদর, উলিপুর, নাগেশ্বরী, ভূরুঙ্গামারী ও রৌমারী উপজেলায় বীজতলা, পাট ও শাকসবজিসহ ২০৪ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টিতে দুধকুমার নদের পানি বেড়ে মুড়িয়ারহাট এলাকার বেড়িবাঁধে ধস দেখা দেয়। সময়মতো সংস্কার না করায় রোববার বিকালে বাঁধের একটি অংশ ভেঙে যায়। এরপর থেকেই নদীর পানি দ্রুত লোকালয়ে প্রবেশ করতে শুরু করে। ইতিমধ্যে বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের মিয়াপাড়া, মালিয়ানি, সেনপাড়া, তেলিয়ানীপাড়া, পাটেশ্বরী, বোয়ালের ডারা, ধনিটারী ও বড়মানী গ্রাম ছাড়াও নাগেশ্বরী পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাঞ্জুয়ারভিটা ও ফকিরটারী এলাকায় পানি ঢুকে পড়েছে। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, দুধকুমার নদের পানি বর্তমানে বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের একটি নিচু সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় সেখান দিয়ে পানি লোকালয়ে ঢুকছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জিও ব্যাগ ফেলে পানি প্রবেশ ঠেকানোর চেষ্টা করা হবে।
নাগেশ্বরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এইচ. এম. খোদাদাদ হোসেন বলেন, উপজেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, উজানের ঢলে প্লাবিত এলাকার মানুষের জন্য জরুরি সহায়তা হিসেবে দুই লাখ টাকা এবং ১১০০ প্যাকেট শুকনো খাবার প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
রাজারহাট (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, কুড়িগ্রামের রাজারহাটে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার কাছাকাছি পৌঁছেছে। এতে উপজেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে ঘরবাড়িতে পানি ঢুকতে শুরু করেছে এবং বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। উপজেলার নাজিমখানের পলাশপুর, ঘড়িয়ালডাঙ্গার বুড়িরহাট, বিদ্যানন্দের তৈয়ব খাঁ ও রামহরি এলাকাসহ অন্তত ১০ গ্রামের হাজারো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। একইসঙ্গে চরাঞ্চলের বীজতলা, পাট, শাকসবজি ও অন্যান্য ফসল তলিয়ে গেছে। সোমবার দুপুরে পাউবো সূত্রে জানা গেছে, উজানের ঢলে জেলার সব নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। তিস্তা নদীর বিপদসীমা ২৯.৩১ মিটার। তিস্তার কাউনিয়া পয়েন্টে সকাল ৬টায় পানি ছিল ২৯.০০ মিটার, যা বেড়ে দুপুর ১২টায় ছিল ২৯.২৯ মিটার এবং বিকাল ৩টায় ২৯.৩০ মিটারে পৌঁছেছে।
বর্তমানে পানি বিপদসীমার মাত্র ১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে, গত ২৪ ঘণ্টায় ৫২.০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে; যা নদীর পানি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পানি বৃদ্ধির ফলে চরের পাট, শাকসবজি ও অন্যান্য ফসল তলিয়ে গেছে বলে রাজারহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে তিস্তা নদীর পানি বেড়ে বুড়িরহাট, তৈয়ব খাঁ ও বিদ্যানন্দ এলাকার কিছু অংশ ইতিমধ্যে প্লাবিত হয়েছে। জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের কাজ বিলম্বিত হওয়ায় এবং বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় পানি দ্রুত লোকালয়ে প্রবেশ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান জানান, উজানের ঢল ও ভারী বৃষ্টির কারণে জেলার সব নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলোতে জিও ব্যাগ ডাম্পিং অব্যাহত রাখা হয়েছে। জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ জানান, সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি সহায়তা হিসাবে নগদ দুই লাখ টাকা ও ১১০০ প্যাকেট শুকনো খাবার প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
কালীগঞ্জ (লালমনিরহাট) প্রতিনিধি জানান, লালমনিরহাটে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে জেলার কালীগঞ্জসহ পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, আদিতমারী ও সদর উপজেলার তিস্তা নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ফলে শত শত পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পানির তোড় বাড়তে থাকায় সংস্কারহীন বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধগুলোর কয়েক জায়গায় ভাঙন দেখা দিয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, রোববার সন্ধ্যা ৬টায় দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে নদীর পানি ৫২ দশমিক ২২ মিটার রেকর্ড করা হয়েছে। যা ওই পয়েন্টের বিপদসীমার ৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সরজমিন দেখা গেছে, তিস্তা দ্বিতীয় সড়ক সেতু মহিপুরের বিভিন্ন এলাকা ও কালীগঞ্জের কাকিনা, তুষভাণ্ডার, ভোটমারী ইউনিয়নের চরাঞ্চলের কয়েক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বসতভিটা, রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। আকস্মিক বন্যায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন চরাঞ্চলের বাসিন্দারা। শিশু, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী ও গৃহপালিত পশুপাখি নিয়ে চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন পানিবন্দি এলাকা শম শত পরিবার। বন্যার পানির সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে সাপ ও পোকামাকড়ের উপদ্রবও বেড়েছে। এদিকে তিস্তাপাড়ের নিম্নাঞ্চলে আমন ধানের বীজতলা, ভুট্টা, বাদাম, পাট ও বিভিন্ন সবজির ক্ষেত তলিয়ে গেছে। পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এবং নদী তীরবর্তী উঁচু সড়কগুলোও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, শুষ্ক মৌসুমে টেকসই সংস্কার না করায় বর্ষা এলেই বাঁধগুলো ভাঙনের আশঙ্কা দেখা দেয়।
কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. সাইফুল ইসলাম জানান, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজখবর নিচ্ছি। বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছি। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। নদীপাড়ের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। দুর্গতদের মাঝে চাল বিতরণের কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। ভোটমারী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ফরহাদ হোসেন জানান, তার ইউনিয়নের ১৪শ’ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ইউএনও সরজমিন এসে ৫০টি পরিবারের মাঝে ৩০ কেজি করে চাল বিতরণ করেছেন।
স্টাফ রিপোর্টার, রংপুর থেকে জানান, উজানের ঢলে তিস্তা নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে। এতে তিস্তা অববাহিকার ৫ জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার শঙ্কা নিয়ে সতর্ক করা হয়েছে। রোববার বিকালে রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, সকাল থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত তিস্তা নদীর পানি ৬ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ১২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। একই সময়ে কাউনিয়া পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ৭৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। উজানের ঢলে বেড়েছে রংপুরের ঘাঘট, যমুনেশ্বরী নদীর পানিও। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশে ভারী বৃষ্টিপাত পরিলক্ষিত হওয়ায় তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বন্যা হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। সেই সঙ্গে রোববার ও সোমবার রংপুর বিভাগে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অফিস। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, রংপুরের তিস্তা নদীর পানি আগামী তিনদিন বৃদ্ধি পেতে পারে। এতে করে নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর ও গাইবান্ধায় নদীর তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা হতে পারে। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে এ তথ্য সংশ্লিষ্টদের জানিয়ে দেয়া হয়েছে।
