২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থের সংস্থান নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, বাস্তবায়ন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। একইসঙ্গে তিনি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, ব্যাংক ও পুঁজিবাজার সংস্কার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ব্যাংক রেজ্যুলেশন আইনের বিতর্কিত ধারা বাতিল ও একীভূত ৫ ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের আমানতের নিরাপত্তার দেয়ারও ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী।
সোমবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৮তম দিন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এই মন্তব্য করেন। বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি বর্তমানে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় এবং সরকার এটিকে কেবল অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক দায়িত্ব হিসেবেও বিবেচনা করছে।
অর্থমন্ত্রী জানান, মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির সমন্বয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, কৃষি ও শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি, ৬০টি নিত্যপণ্যে উৎসে কর কমানো, ব্যবসার খরচ কমাতে ডিরেগুলেশন ও ডিজিটাইজেশন, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা, বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।
মন্ত্রী বলেন, এসব উদ্যোগের ফলে ধাপে ধাপে মূল্যস্ফীতি কমে জনজীবনে স্বস্তি ফিরে আসবে। ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের বিষয়ে আশাবাদ: প্রস্তাবিত ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে সংশয়ের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রবৃদ্ধি কেবল পরিসংখ্যান নয়; এটি বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক আস্থার প্রতিফলন। সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্প, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি ও সেবাখাত সম্প্রসারণ, ক্রিয়েটিভ অর্থনীতিকে মূলধারায় আনা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে।
উন্নয়ন ব্যয় বাড়িয়ে পরিচালন ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা: সরকারি ব্যয়ে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার পরিচালন ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানোর নীতি নিয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ব্যয়ের মধ্যে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ২৭ দশমিক ২৭ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৩ দশমিক ৭০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে পরিচালন ব্যয়ের অংশ ৭২ দশমিক ৭৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৬ দশমিক ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেন, বিগত সরকারের সময়ে অপ্রয়োজনীয় ঋণ গ্রহণের ফলে দেশের ঋণ ধারণক্ষমতা নিম্ন ঝুঁকি থেকে মধ্যম ঝুঁকিতে নেমে এসেছে।
পাচার হওয়া সম্পদ ফেরাতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ: ব্যাংকিং খাতের সংস্কার প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ ফিরিয়ে আনতে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। চলতি বছরের মে পর্যন্ত ১১টি অগ্রাধিকার মামলায় দেশে ও বিদেশে প্রায় ৭২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ বা ফ্রিজ করা হয়েছে। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে ১৩টি দেশে ২৩টি মিউচুয়াল লিগ্যাল এসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট পাঠানো হয়েছে। মালয়েশিয়া ও হংকংয়ের সঙ্গে দু’টি মিউচুয়াল লিগ্যাল এসিস্ট্যান্স ট্রিটি চূড়ান্ত হয়েছে। একইসঙ্গে বড় ঋণগ্রহীতা ছয়টি গ্রুপের বিরুদ্ধে সিভিল প্রসিডিংস শুরু এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্পদ পুনরুদ্ধার কার্যক্রমও চলছে।
পাঁচ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের আমানতকারীদের আশ্বাস: একীভূত পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের আমানতকারীদের উদ্দেশ্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, সাধারণ মানুষের আমানতের নিরাপত্তাই সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। ব্যক্তিগত আমানতকারীরা তাদের চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাব থেকে তাৎক্ষণিকভাবে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা তুলতে পারবেন। বাকি অর্থ ধাপে ধাপে পরিশোধ করা হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ক্যান্সার, কিডনি ডায়ালাইসিসসহ ব্যয়বহুল রোগে আক্রান্ত আমানতকারী এবং হজ সঞ্চয়কারীদের জন্য বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। একইভাবে ডিপিএস হিসাব থেকেও দুই লাখ টাকা পর্যন্ত তাৎক্ষণিক উত্তোলনের সুযোগ থাকবে।
ব্যাংক রেজ্যুলেশন আইনের বিতর্কিত ধারা বাতিল: ব্যাংক রেজ্যুলেশন আইন, ২০২৬-এর বিতর্কিত ধারা ১৮(ক) বিভিন্ন অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, জনগণের সম্পদ যারা লুট করেছে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ছাড় দেয়া হবে না। একইসঙ্গে আমানতকারীদের স্বার্থও পুরোপুরি সুরক্ষিত রাখা হবে।
‘আইএমএফ থেকে শূন্য হাতে ফিরিনি’: বাজেট আলোচনায় উত্থাপিত আইএমএফ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে শূন্য হাতে ফেরেনি। আগের সরকারের সময়ে নেয়া ঋণ কর্মসূচির কিছু শর্ত দেশের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় সরকার নিজ উদ্যোগেই ওই কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে এসেছে। তবে জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা করে ভবিষ্যতে নতুন কর্মসূচিতে যাওয়ার সুযোগ খোলা রয়েছে।
জ্বালানি নিরাপত্তায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা: অর্থমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি শিল্প উৎপাদনসহ সামগ্রিক অর্থনীতির অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থা কাটিয়ে উঠতে সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এর আওতায় জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ, এলএনজি টার্মিনালের সংখ্যা বৃদ্ধি, বাপেক্সকে শক্তিশালী করা, আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানো, দ্বিতীয় ইস্টার্ন রিফাইনারি স্থাপন এবং ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
কর্মসংস্থানে জোর শিল্প, প্রযুক্তি ও সৃজনশীল অর্থনীতিতে: অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার এমন একটি উৎপাদনমুখী ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ে তুলতে চায়, যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রতিটি ধাপ নতুন কর্মসংস্থানে রূপ নেবে। শিল্প, সেবা, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষিভিত্তিক শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ এবং ক্রিয়েটিভ অর্থনীতিতে নেয়া কর্মসূচির মাধ্যমে ঘোষিত কর্মসংস্থানের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে। এ ছাড়া শ্রমবাজারের চাহিদাভিত্তিক কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ, তরুণ উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন এবং নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেয়া হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, চ্যালেঞ্জ যত বড়ই হোক, সঠিক নেতৃত্ব, কার্যকর প্রতিষ্ঠান, দক্ষ জনপ্রশাসন এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ থাকলে সব বাধা অতিক্রম করা সম্ভব। অতীতে বিভিন্ন সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের জনগণ যে সহনশীলতা ও সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে, তা সরকারের মধ্যে নতুন আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করেছে।
