মানুষ বাঁচে ভাষায়। আর ভাষা বেঁচে থাকে মুটে-মজুর-কৃষক, খেটে খাওয়া মানুষের মুখের বুলি হয়ে। যুগে যুগে দেখা যায় শিক্ষা যেমন মানুষকে আলোকিত করে, আবার একই সাথে শিক্ষা মানুষকে তার শেকড় বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। তাকে নিয়ে যায় তার নিজের না, কখনো তার হবেও না এমন আরেক ভিনদেশী শেকড়ের কাছে। কেউ হয়তো এটাকে কাকের ময়ূর হওয়ার চেষ্টা বলে কটাক্ষ করেন, আবার অনেকে দেখেন সভ্যতার আলোকিত বিবর্তন হিসেবে।
তবে এখানে রুঢ় বাস্তবতা হলো, শিক্ষার আলোয় আলোকিত একজন আর নিজের মায়ের ভাষায়–মানে কুমিল্লা, সাতক্ষিরা বা রংপুরের অজোপাড়া গায়ে মায়ের মুখের বুলি তার মুখে আর রুচে না! সে সাধুভাষী হতে চায়। আঞ্চলিকতার জড়তার জাল থেকে নিজেকে মুক্ত করে কথিত শহুরে-সভ্য হতে চায়। সে একটু একটু ইংরেজিতে কথা বলতে চায়। ইংরেজ হতে চাওয়া বা সেই সংস্কৃতি আত্ম করার এক আকুতি তার মধ্যে। এ যেন “গেঁয়ো থেকে শহুরে” হয়ে উঠার এক নিরন্তর চেষ্টাও। এভাবেই শিক্ষা একজন মানুষের মুখ থেকে তার মায়ের ভাষাকে কেড়ে নিয়ে খুন করে। অথচ গ্রামের সে মানুষ যার গায়ে শিক্ষার ছোয়া লাগেনি বা লাগলেও গ্রামের জীবনেরই রয়ে গেছেন, তার মুখেই কিন্তু বেঁচে থাকে আঞ্চলিক বা উপভাষা। সে অবলীলায় মায়ের ভাষায় আপন মনে ভাব প্রকাশ করে যায়। একটি ভাষা এভাবেই শ্রমজীবী মানুষের মুখে মুখে বেঁচে থাকে। ফলে আমরা বলতে পারি সব আলোর নিচেই থাকে এক অন্যরকম অন্ধকার। জীবনানন্দ হয়তো সারাজীবন ধরে এমন এক ‘অন্ধকারে’র আলো-আঁধারিতেই হাবুডুবু খেয়েছেন! এই অতলের তল আর খুঁজে পাননি।
এই একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো প্রযুক্তি, যার মূল কেন্দ্রে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। আজ থেকে মাত্র দশ বছর আগেও মানুষ যা কল্পনাও করতে পারেনি, এআই তা করে দিচ্ছে চোখের পলকে। ক্লড, জেমিনি, ডিপসিকের মতো লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল আমাদের জীবনকে এমনভাবে বদলে দিচ্ছে যে মানুষ এখনো সে ঘোর থেকে বের হতে পারেনি। প্রযুক্তিবিদরা বলছেন এটা কেবল শুরু। কাজী নজরুলের সেই স্বপ্ন যেন সত্যি হতে চলেছে:
থাকব না কো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগৎটাকে,
কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে
কেমন করে দুঃসাহসী চলছে উড়ে স্বর্গপানে
কিসের আভিযানে মানুষ চলছে হিমালয়ের চুড়ে
তুহিন মেরু পার হয়ে যায় সন্ধানীরা কিসের আশায়
হাউই চড়ে চায় যেতে কে চন্দ্রলোকের অচিন পুরে
শুনবো আমি, ইঙ্গিত কোন ‘মঙ্গল’ হতে আসছে উড়ে।।
কিন্তু এই একই প্রযুক্তি আরেকটি কাজ করছে। একদম নিঃশব্দে। ছোট ছোট ভাষা, সংস্কৃতি আর সভ্যতাকে একে একে মুছে দিচ্ছে। প্রযুক্তির প্রভাবে সর্বত্র ইংরেজির একাধিপত্য তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর সংস্কৃতি তাই আজ অস্তিত্ব সংকটের মুখে। ইউনেস্কো বলছে, প্রতি মাসে গড়ে অন্তত দুটি ভাষা পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বে টিকে আছে মাত্র সাত হাজারের মতো ভাষা, যার বড় একটি অংশই বিলুপ্তির ঝুঁকিতে। একটি ভাষা মরে গেলে শুধু কিছু শব্দ হারায় না; একটি পুরো সংস্কৃতি, জনজীবন, জীবনদর্শন চিরতরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
এই গভীর সাংস্কৃতিক ও অস্তিত্ব সংকটের বাস্তবতাকে সামনে রেখেই সম্প্রতি জাতিসংঘ ঘোষিত প্রথম আন্তর্জাতিক সভ্যতা সংলাপ দিবস (International Day for Dialogue Among Civiliæations) উপলক্ষ্যে ঢাকায় গণচীন দূতাবাস এবং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-চীন অ্যালমনাই (ABCA)-এর যৌথ উদ্যোগে ''Dialogue Between Kindred Spirits: China-Bangladesh Thought Exchange Event'' শীর্ষক বিশেষ বৈশ্বিক সেমিনার ও প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানের প্রথমপর্বের ভাষণে চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন: “দক্ষিণ এশিয়ার সভ্যতার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাংলাদেশ। এই মাটি কাজী নজরুল ইসলাম এবং অতীশ দীপঙ্করের মতো মহাপুরুষদের চারণভূমি; যা এক সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার বহন করছে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে, চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং কর্তৃক প্রস্তাবিত ‘বিশ্ব সভ্যতা উদ্যোগ’ অত্যন্ত সময়োপযোগী। আমরা শিক্ষা, সংস্কৃতি, তারুণ্য ও গণমাধ্যমসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে পারস্পরিক বিনিময়কে আরও গভীর করতে বাংলাদেশের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।”
দুই দেশের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনকে আরও গভীর করে তোলার বিষয়ে জোর দেন প্রধান অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানে যোগ দেয়া বাংলাদেশের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরীও। এই লক্ষ্যে গণচীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং প্রস্তাবিত গ্লোবাল সিভিলাইজেশন ইনিশিয়েটিভ (GCI)-কে বাংলাদেশ অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন মন্ত্রী।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বের বিশেষ আলোচনার সমাপনী বক্তব্যে চীনা দূতাবাসের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা লি শাওপেং বলেন, গ্লোবাল সিভিলাইজেশন ইনিশিয়েটিভ (GCI)-এর মাধ্যমে চীন বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি, সভ্যতা এবং মনস্তাত্ত্বিক মেলবন্ধন বৃদ্ধির পাশাপাশি তা সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে। এই উদ্যোগে এশিয়ার দেশগুলোকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিচ্ছে চীন। তিনি বাংলাদেশে এই ফোরামে যোগ দেবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে আরও বলেন, চীন নিজের সংস্কৃতি রক্ষার পাশাপাশি অন্যান্য দেশের সংস্কৃতি রক্ষায়ও অবদান রাখতে চায়। চীনরে আরেকটি উদ্যোগ ‘তাইহু ওয়ার্ল্ড কালচারাল ফোরাম’ গ্লোবাল সিভিলাইজেশন ইনিশিয়েটিভেরই (GCI) একটি অন্যতম অংশ, যার মূল লক্ষ্য বৈশ্বিক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটানো। চীন এই সাংস্কৃতিক বলয়ে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রত্যাশা করে।
পৃথিবী যখন ‘নো রোল অব অর্ডারে’ এক অরাজকতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ-ধ্বংস-কান্নায় বিপর্যস্ত সাধারণ মানুষ। তখন চীনের এ উদ্যোগকে আমরা সতর্ক স্বাগত জানাতে চাই। এর বাইরে আমাদের হাতে খুব বেশি বিকল্পও নেই আসলে। বিশ্বাস করতে চাই, অর্থনীতি বা উন্নয়নকে উপজীব্য করে গড়ে উঠা সিনু-বাংলা সংস্কৃতিকে তারা সাংস্কৃতিক সম্পর্কে রূপান্তরের মাধ্যমে স্থায়ী বন্ধনে রূপ দিতে চায়।
জাতিসংঘ গঠিত হয়েছিল দুনিয়ার সব দেশের ঐক্যমতে। সব দেশ এর সদস্য। জাতিসংঘের অধীনে ইউনেস্কোর মতো সংস্থা রয়েছে, যাদের কার্যক্রম সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসে কিছুটা স্থবির হয়ে গেছে। ফলে একটি প্রশ্ন থেকে যায়, পুরো দুনিয়ার সম্মিলিত প্রচেষ্টা যেখানে অকার্যকর হয়ে যাচ্ছে, সেখানে চীনের একক উদ্যোগ কতটুকু সফলতার মুখ দেখবে বা টেকসই হবে? তবে রুঢ় সত্য হলো, অর্থনৈতিক যে উদ্যোগ তাকে সংস্কৃতি দিয়ে আচ্ছাদিত করা না গেলে চূড়ান্ত সফলতা ও সম্পর্কের স্থায়িত্ব অধরাই থেকে যাবে। এশিয়াকে কেন্দ্র করে নতুন যে দুনিয়ার উত্থান হচ্ছে তাতে এশিয়ার দেশগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ ও প্রকৃত পারস্পরিক সহযোগিতা জরুরি। আর তার দায়িত্বশীল নেতৃত্বের কৃতিত্ব বা দায়ভার চীনকেই কাঁধে তুলে নিতে হবে।
লেখক: শিক্ষক ও কথাশিল্পী
