পারস্য উপসাগরে সাম্প্রতিক রক্তক্ষয়ী সংঘাত বন্ধ করতে এবং হরমুজ প্রণালি নিয়ে চলমান বিরোধ নিরসনে পুনরায় আলোচনায় বসতে সম্মত হয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। রোববারে এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে এই খবর জানানো হয়। গত কয়েক দিনের পাল্টাপাল্টি হামলায় চরম ঝুঁকিতে পড়া অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তিটি বাঁচানোর নতুন আশা জাগিয়েছে এই খবর। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই মার্কিন কর্মকর্তা জানান, দুই পক্ষই আপাতত হামলা থেকে বিরত থাকবে এবং বাণিজ্যিক জাহাজগুলো আগের মতোই অবাধে চলাচল করতে পারবে। এ খবর দিয়েছে রয়টার্স।
আলোচনা বন্ধের হুমকি: ওয়াশিংটন যদি তাদের আক্রমণ অব্যাহত রাখে, তবে চলমান যুদ্ধ অবসানের আলোচনা ‘সম্পূর্ণ বন্ধ’ করে দেয়ার হুমকি দিয়েছে ইরান। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ ব্যাতিত পুনরায় চালুর আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে গত কয়েক দিন ধরে এই পাল্টাপাল্টি হামলার সূত্রপাত হয়। এর মধ্যে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি রোববার পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, পারস্য উপসাগরের এই প্রবেশপথটি তেহরানের নিয়ন্ত্রণেই পরিচালিত হতে হবে। এ খবর দিয়েছে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)।
বাহরাইন ও কুয়েতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা: ইরানের আধাসামরিক বাহিনী রেভুল্যেশনারি গার্ড করপস (আইআরজিসি) বাহরাইন ও কুয়েতে চালানো এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের প্রধান ঘাঁটি থাকা বাহরাইন জানিয়েছে, ইরানি হামলায় তাদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে একটি আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবে এতে কেউ নিহত হননি। বাহরাইনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একে তেহরানের একটি ‘পরিকল্পিত এবং নিয়মতান্ত্রিক আগ্রাসন’ বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। অন্যদিকে, বড় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি পরিচালনাকারী দেশ কুয়েত জানিয়েছে, মার্কিন হামলার পরপরই তারা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে বেশ কিছু ইরানি ড্রোন ও দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে।
ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারি: মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, গত শনিবার কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের তেলবাহী একটি জাহাজে ইরানি হামলার জবাবে তারা ইরানের সামরিক নজরদারি অবকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ড্রোন সংরক্ষণাগার লক্ষ্য করে এই বিমান হামলা চালায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানকে অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত করেছেন। তিনি সতর্কবার্তা দিয়ে লিখেছেন, আমেরিকা সামরিকভাবে এর চূড়ান্ত জবাব দিতে বাধ্য হলে ইরানের আর কোনো অস্তিত্বই থাকবে না।
লেবানন ও সিরিয়া ফ্রন্টে উত্তেজনা: চলমান এই উত্তেজনা লেবানন ও সিরিয়া ফ্রন্টেও ছড়িয়ে পড়েছে। ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যে যুদ্ধবিরতির একটি রূপরেখা চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ এবং ইসরাইলের মধ্যে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে। রোববার দক্ষিণ লেবাননের একটি গ্রামে হিজবুল্লাহর হামলায় এক ইসরাইলি সেনা নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যার জবাবে ইসরাইল দক্ষিণ লেবাননের তাইবে ও নাবাতিয়েহ এলাকায় বিমান হামলা চালিয়েছে। এছাড়া সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় দারা প্রদেশের আবদিন গ্রামেও ইসরাইলি বাহিনী কামানের গোলা বর্ষণ করেছে। ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। উদ্বুদ্ধ পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আগামী মঙ্গলবার আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে পূর্বনির্ধারিত কারিগরি আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। তবে ওয়াশিংটনের ক্রমাগত আক্রমণ মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রতিষ্ঠার এই অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
কাতারভিত্তিক নতুন কূটনীতি: হোয়াট হাউজের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে অ্যাক্সিওস প্রথম এই যুদ্ধবিরতির খবর প্রকাশ করে এবং জানায় যে আগামী মঙ্গলবার কাতারে দুই দেশের মধ্যে কারিগরি ও কূটনৈতিক আলোচনা আবার শুরু হতে যাচ্ছে। গত ১৭ জুনের ১৪ দফার সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) ওপর ভিত্তি করেই এই আলোচনা এগোবে। গত বৃহস্পতিবার হরমুজ প্রণালিতে একটি মালবাহী জাহাজে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর থেকেই দুই দেশ একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে দফায় দফায় হামলা চালাচ্ছিল, যা এই নতুন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আপাতত শান্ত হলো।
কাতারের নাগরিক নিহত: এদিকে কাতার সরকার জানিয়েছে, শনিবার নিখোঁজ হওয়া একটি জাহাজে সামরিক অভিযানের সময় স্প্লিন্টারের আঘাতে তাদের একজন নাগরিক নিহত এবং আরেকজন আহত হয়েছেন। তবে এই ঘটনাটি ঠিক কোথায় ঘটেছে এবং কারা এর জন্য দায়ী, তা কাতারের অভ্যন্তরীণ মন্ত্রণালয় সুনির্দিষ্ট করে জানায়নি। সুইজারল্যান্ডে আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের মধ্যকার পূর্ববর্তী আলোচনা ভেস্তে গেলেও, কাতারের হতে যাওয়া এই বৈঠকটিকে চুক্তি টিকিয়ে রাখার শেষ সুযোগ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
