মেসিকে বসিয়ে রেখে বেঞ্চের শক্তি পরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন আর্জেন্টাইন কোচ লিওনেল স্কালোনি। নয়টি পরিবর্তন। প্রথম একাদশ অনেকটাই ‘রিজার্ভ বেঞ্চ’। তবু ছন্দের অভাব ছিল না। ১৯ মিনিটে জিওভান্নি লো সেলসোর বাঁ পায়ের ফ্রি-কিকে গোল। পেনাল্টি থেকে বিশ্বকাপে নিজের সপ্তম ম্যাচে প্রথম গোল পেলেন লাউতারো মার্টিনেজ। ৩২ মিনিটেই দুই গোলের লিড। তবুও দর্শকদের যেন মন ভরছিল না! মাঠে কিছু একটার শূন্যতা অনুভব করছিলেন তারা। টিভি ক্যামেরাও কিছু একটা খুঁজে বেরাচ্ছিলেন। অবশেষে শুরুতেই দেখা মিললো তার।
মুহূর্তের সকল স্পট লাইট গিয়ে পড়লো তার ওপর। মাঠে নেমেই মেসি প্রমাণ দিলেন কেন তার জন্য এত অপেক্ষা। ফ্রি-কিকে দারুণ এক গোল করে বিশ্বকাপের রেকর্ডবুকই ওলটপালট করে দিলেন এই আর্জেন্টাইন তারকা। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম ফুটবলার হিসেবে টানা ৭ ম্যাচে গোল করার এক অবিশ্বাস্য নজির স্থাপন করলেন তিনি। এর মাধ্যমে মেসি ভেঙে দিলেন ১৯৫৮ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের জাস্ট ফোঁতেনের এবং ১৯৭০ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের কিংবদন্তি ফরোয়ার্ড জর্জিনহোর টানা ৬ ম্যাচে গোল করার ঐতিহাসিক রেকর্ডটি। ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে ব্রাজিলের হয়ে সবক’টি ম্যাচে (৬ ম্যাচ) গোল করে সেলেসাওদের সেবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেছিলেন জর্জিনহো। অক্ষত থাকা সেই রেকর্ড এবার নিজের করে নিলেন মেসি।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের শেষ ৪ ম্যাচ (দ্বিতীয় রাউন্ড, কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল ও ফাইনাল) থেকে শুরু করে চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের ৩টি ম্যাচেই (আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া ও জর্ডান) টানা গোল করলেন তিনি। কাতারে শুধু পোল্যান্ডের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচটিতে তিনি জালের দেখা পাননি। ৬টি ভিন্ন বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে মেসি নিজের গোল সংখ্যাকে নিয়ে গেছেন ১৯-এ। গত ম্যাচেই জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসেকে (১৬ গোল) ছাড়িয়ে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছিলেন, এবার ব্যবধানটা আরও বাড়ালেন।
চলতি আসরে ৩ ম্যাচেই মেসির গোল সংখ্যা এখন ৬টি। এর মধ্যে আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল এবং জর্ডানের বিপক্ষে করেছেন ১ গোল। গোল্ডেন বুটের দৌড়ে তিনিই সবার শীর্ষে। এই নিয়ে বিশ্বকাপে নিজের ২৯তম ম্যাচ খেলে ফেললেন আর্জেন্টাইন জাদুকর। ম্যাচের আগে কোচ লিওনেল স্কালোনি জানিয়েছিলেন, হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট ও নকআউটের ধকল সামলাতে জর্ডানের বিপক্ষে মেসিকে সাইডবেঞ্চে রাখা হবে। কোচের পরিকল্পনা অনুযায়ী বিকল্প একাদশ নিয়ে মাঠে নামা আর্জেন্টিনা ম্যাচের শেষভাগে যখন মাঠে মেসিকে নামায়, তখনই গ্যালারিতে শুরু হয় গর্জন। আর মাঠে নেমেই চিরচেনা বাঁ-পায়ের জাদুকরী ফ্রি-কিকে জর্ডানের জাল কাঁপান তিনি। বিশ্বকাপে টানা ২৫ ম্যাচ পর একাদশের বাইরে থাকা মেসি এদিন আরও রেকর্ড গড়েছেন।
ডি-বক্সের বাইরে থেকে সর্বোচ্চ ৬ গোল করে ব্রাজিলিয়ান লেজেন্ড রিভেলিনোর ৫ গোলের রেকর্ড ভেঙেছেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ জয়ের (১৯) রেকর্ড এখন তার ঝুলিতে। বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি গোলে অবদান রাখার রেকর্ডে ব্রাজিল কিংবদন্তি পেলেকে (২১) অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছেন মেসি। ১৯ গোল এবং ৮ অ্যাসিস্টে তার গোল অবদান এখন ২৭টি। টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরার মিশনে থাকা আর্জেন্টিনার সামনে এখন শেষ বত্রিশের লড়াই। আগামী ৪ঠা জুলাই মায়ামিতে নবাগত কেপ ভার্দের মুখোমুখি হবে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। জর্ডান ম্যাচে এই রেকর্ড গড়া পারফরম্যান্সের পর নকআউটের মঞ্চে মেসি নিজের রেকর্ডকে আর কোন উচ্চতায় নিয়ে যান, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
